সরেজমিন: গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অব্যবস্থাপনা

প্রকাশ: ১২ জুন ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুন ২২ । ০২:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের গৌরীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শনিবার দুপুর ১টা ১৭ মিনিটে দুই বোন তাঁদের দুই শিশুকে চিকিৎসক দেখাতে গিয়ে দেখেন কেউ নেই (উপরে), সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে টিকিট নিতে রোগীদের দীর্ঘ লাইন (নিচে বামে) দুপুর ১টায় জুনিয়র কনসালট্যান্টের কক্ষে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি (নিচে ডানে)- সমকাল

দশ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঝুমা আক্তার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পা ফেললেন যখন, তখন সকাল সোয়া ৮টা। কোলে পাঁচ বছরের জমিয়াতুল। তিন দিন হয়ে গেল মেয়ের কানে অসহ্য ব্যথা। বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসার দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মা-মেয়ের চোখে-মুখে। এসেই দেখেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীতে ঠাসা; তবে নেই কর্মচারী, নেই চিকিৎসক। সকাল ১০টার দিকে নির্দিষ্ট সময়ের অন্তত দুই ঘণ্টা পর খুলল রোগীর টোকেন কাউন্টারের দরজা। তিন টাকার টোকেন ঝুমার কাছ থেকে নেওয়া হলো পাঁচ টাকা। এরপর আবার অপেক্ষার খেলা! চিকিৎসক তো আর আসেনই না। দুই ঘণ্টা পর সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল ঝুমার। পরে বাইরে প্রাইভেট চিকিৎসক ও ওষুধ মিলিয়ে হাজার টাকা খরচা করে বাড়ির পথে হাঁটলেন মা-মেয়ে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এমন দুর্দশার ছবি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসকদের রোগীর সেবা দেওয়ার কথা। গতকাল শনিবার ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় অব্যবস্থাপনার নানা কীর্তি। সকাল ৮টায় হাসপাতালে থাকার নিয়ম হলেও চিকিৎসক আসেন অনেক দেরিতে। কর্মচারীদের কাজকর্মও হেয়ালি। তাঁরা আসেন হেলেদুলে সকাল ১০টার পর। চিকিৎসক-কর্মচারী দেরিতে হাসপাতালে ঢুকলেও কর্মস্থল দ্রুত ছাড়ার ব্যাপারে তাঁদের আছে 'সুখ্যাতি'! চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ বিতরণেও রয়েছে নানা অনিয়ম।

গৌরীপুরের এক পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নের অন্তত সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০১৬ সালে ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও কাজ চলছে একই জনবল দিয়ে।

গতকাল দু'জন কনসালট্যান্ট চিকিৎসক, আটজন মেডিকেল অফিসার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী দেখেন। একজন টেকনোলজিস্ট ও একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারও মাঝেমধ্যে রোগীকে ওষুধ লিখে দিচ্ছিলেন। ফিল্ম না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে সেবা বন্ধ। তাই ওই কক্ষের তালাও খোলা হয়নি। শুধু প্যাথলজির কিছু পরীক্ষা হয়। দুপুর ১টা বাজতেই চিকিৎসকরা বাড়িমুখো হতে শুরু করেন। তবে চলে যাওয়ার আগে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ভুল করছিলেন না কোনো চিকিৎসক।

গৌরীপুরের হিম্মতনগর গ্রামের আসাদুল্লাহ ১ নম্বর কক্ষে চিকিৎসককে দেখান। মাথাব্যথা ও পেটের সমস্যার জন্য মেট্রোনিডাজল, প্যারাসিটামল আর আয়রন ট্যাবলেট টোকেনের ওপর লিখে দেন চিকিৎসক। তবে ওষুধ কীভাবে খাবেন, দেওয়া হয়নি সেটার নির্দেশনা। টোকেন জমা দিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে কীভাবে তা খাবেন, তা জানার জন্য নানা কসরত করেও উত্তর পাননি আসাদুল্লাহ। অচিন্ত্যপুরের রামচন্দ্রনগর গ্রামের পপি আক্তারও পড়েছেন একই ফ্যাসাদে। ওষুধ খাওয়ার পর আবার চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হলেও ক'দিন খাবেন, কীভাবে খাবেন- সেটার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বহির্বিভাগের যে স্থানে টোকেন দেওয়া হয়, তার পাশে সকাল ৯টা ৩ মিনিটে অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকজন নারী। তাঁদের একজন ডৌহাখলা ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের চান মিয়ার স্ত্রী রহিমা। চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকা রহিমা বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সকাল ১০টার দিকে হাতে পান টোকেন। মাওহা ইউনিয়নের নহাটা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সাজেদা বেগমও সাতসকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান চিকিৎসক দেখিয়ে দ্রুত ফিরবেন, এ ভাবনায়। তবে তাঁর আশায় গুড়েবালি। চিকিৎসক দেখাতে পেরেছেন চার ঘণ্টা পর।

দুপুর ১টার পর টোকেন নিয়েও চিকিৎসক দেখাতে না পারায় ক্ষোভ দেখান ১৮ মাস বয়সী শিশু তামিমের মা তানিয়া আক্তার। রামচন্দ্রপুর গ্রামের আয়েশা বেগম নিজের শিশুসন্তান লিলির নামে টোকেন নেন। তবে চিকিৎসক চলে যাওয়ায় তাঁকে জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়। দুপুর ১টা ১৭ মিনিটের দিকে ডৌহাখলা ইউনিয়নের কাজিরপানাটি গ্রামের পিপুল আক্তার ও শিপন বেগম তাঁদের তিন মাস বয়সী দুই শিশুকে চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে যান। গিয়ে দেখেন, চিকিৎসক নেই; টোকেনও বিক্রি শেষ।

সকাল ৯টার মিনিট দুয়েক আগে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. ইকবাল আহমেদ নাসের নিজের কক্ষে ঢোকেন। এর পর ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে আসেন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. কাকলী দাস। তিনি টিএইচওর কক্ষে গিয়ে বসেন। সে সময় সেখানে ছিলেন ডা. রাজেন্দ্র দেবনাথ। এর পর একে একে অন্যরাও আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে একজন আয়া বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের কক্ষগুলো খুলে দেন। ৩ নম্বর কক্ষে ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট দেলোয়ার হোসেন ঢোকেন। পাশের ৪ নম্বর কক্ষে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মাহফুজুল হক বসেন। তবে সেবা কার্যক্রম চালুর পর কয়েক দফা তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাইরের চা দোকানে আড্ডায় মশগুল ছিলেন।

গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া ইসলাম ডলি বলেন, সময়মতো ও যথাযথ সেবা পাচ্ছে না গৌরীপুরবাসী। দ্রুত হাসপাতালটিতে জনবল ও সংশ্নিষ্টদের নজরদারি বাড়ানো দরকার।

গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. ইকবাল আহমেদ নাসের বলেন, ৫০ শয্যার কার্যক্রম চলছে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে। ১৪ জন চিকিৎসক দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও মালীর সংকট রয়েছে।

তিনি জানান, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। টোকেন হাতে থাকলে রোগী থাকা পর্যন্ত সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন বহির্বিভাগে সেবা দেওয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগীকে। এক্স-রে ফিল্ম সংকট এ মাসেই কেটে যাবে। রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের অব্যবস্থাপনা এবং দেরিতে টিকিট দেওয়াসহ অন্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com