অবিরাম কাজ করে যেতে হবে

প্রকাশ: ১২ জুন ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুন ২২ । ১১:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

হোসে সারামাগো

হোসে সারামাগো। নোবেলজয়ী পর্তুগিজ সাহিত্যিক। 'দ্য গোস্পেল অ্যাকর্ডিং টু জিসাস ক্রাইস্ট', 'ব্লাইন্ডনেস', 'দ্য এলিফ্যান্টস জার্নি' প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের স্রষ্টা। তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার গল্প বের করে এনেছেন শাহনেওয়াজ টিটু


অবিরাম করে যেতে হয়, এমন কোনো কাজ যেমন উপন্যাস লেখা; তাতে যখন আমি হাত দিই, তখন প্রতিদিনই লিখি। হ্যাঁ, পারিবারিক জীবনের কাজকর্মের কারণে এবং ভ্রমণের সময়ে কাজটি বাধাগ্রস্ত হয় বটে, তবে বাদবাকি সময়ে নিয়মিতই লিখি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে লেখার জন্য নিজেকে বাধ্য অবশ্য করি না ঠিকই, তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখা অবশ্যই শেষ করি। তা মোটামুটি দুই পৃষ্ঠার মতো। অর্থাৎ, একদিন সকালে দুই পৃষ্ঠা লিখি তো পরের দিন আরও দুই পৃষ্ঠা- এভাবেই এগিয়ে যায় আমার নতুন উপন্যাস। কেউ কেউ হয়তো ভাববে, দিনপ্রতি দুই পৃষ্ঠা মানে খুব বেশি লেখা নয়; তবে এই সময়ে কিন্তু আমি অন্যান্য লেখালেখিও করি। যেমন চিঠির জবাব দেওয়া। অন্যদিকে প্রতিদিন দুই পৃষ্ঠা সংযুক্ত হলে বছর শেষে কিন্তু প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠা দাঁড়িয়ে যায়!

রাইটার ব্লক বিশ্বাস করি না!

উপন্যাসটি লেখা শেষ হলে আমি একেবারেই স্বাভাবিক থাকি। আমার কোনো বদঅভ্যাস নেই। নাটকীয় কিছু করে বসি না আমি। সবচেয়ে বড় কথা, লেখালেখির কাজটি আমার জন্য কোনো রোমান্টিসিজম নয়। সৃষ্টিশীলতার কালে যে যাতনার ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়, সেগুলো নিয়ে কখনোই মুখ খুলি না। রাইটার ব্লক বা লিখতে না পারা- এ ধরনের কথা অন্য লেখকদের ব্যাপারে আমরা অহরহ শুনলেও, এ ব্যাপারে আমার মনে কোনো ভয় কাজ করে না। এ ধরনের কোনো সমস্যা আমার না থাকলেও আমাকেও কিছু ঝামেলা পোহাতে হয়; তবে সেগুলো স্রেফ অন্য যে কোনো পেশার যে কোনো মানুষের সমস্যার মতোই। যেভাবে লিখতে চাই, কখনও কখনও ঠিক সেভাবে পেরে উঠি না; কিছুই পেরে উঠি না একদম। এমন মুহূর্তগুলো যখন আসে, তখন আমার ভালোই লাগে! লেখালেখি এভাবে না চালিয়ে গিয়ে বরং তাতে ইতি টেনে দিই।

ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলি না

কোনো একটা লেখা শেষ হলে সেটি আমি আরেকবার পড়ি। এ ক্ষেত্রে সাধারণত ছোটখাটো কিছু সংশোধনী করে থাকি; তবে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটাই না। আমার যে কোনো লেখার প্রায় ৯০ শতাংশই অপরিবর্তিত রেখে দিই। শুনেছি, কোনো কোনো লেখক নাকি কোনো কাহিনির ২০ পৃষ্ঠার মতো আটকে গেলে সেটির মোড় বদলে দিয়ে ৮০ পৃষ্ঠার মতো টেনে নিয়ে যান, তারপর শেষ করেন গিয়ে ২০০ পৃষ্ঠায়। আমি এমনটা করি না। আমার যে কোনো বই লেখা শুরু হয় একটি বই হিসেবেই। আর এভাবেই সেটি বেড়ে ওঠে। যেমন ধরুন, নতুন একটা উপন্যাসের ১৩২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখেছি আমি। এটিকে কিছুতেই টেনেহিঁচড়ে ১৮০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বাড়িয়ে তুলব না; বরং এভাবেই রেখে দেব। যেটুকু লিখেছি তার মধ্যে হয়তো খানিকটা সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু তার মানে এই নয়, এটিকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলব।

সোজা পথে যাব, নাকি অন্য কোনো পথে...

একটা লেখা শুরু করার আগে কী লিখতে চাই আর কোথায় গিয়ে থামতে চাই, সে ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকে আমার। তবে কঠোর কোনো পরিকল্পনা আমি ঠিক করে নিই না। শেষ পর্যন্ত আমি সেটিই বলি, যা বলতে চেয়েছি শুরুতে। তবে এই বলার ভঙ্গিমা হয়তো এক থাকে না। আমি যা বলতে চাই, সেটিকে প্রায়ই উপমার ভেতর দিয়ে বলি। ধরুন, লিসবন থেকে পোর্তো শহরে যাব আমি- এটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি; তবে ঠিক সোজা পথে যাব, নাকি অন্য পথে; সেটি লিখতে লিখতেই ঠিক করে নিই।

হুট করেই আসে

আর উপন্যাসের আইডিয়া? তা আমার মাথায় হুট করেই আসে। 'ব্লাইন্ডনেস'-এর কথাই ধরা যাক। একদিন অর্ডার দিয়ে মধ্যাহ্নভোজের অপেক্ষায় একটা রেস্টুরেন্টে বসে ছিলাম। হুট করেই মাথায় এলো, আচ্ছা, এখানকার সবাই যদি অন্ধ হতো, কেমন হতো? নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি অনুভব করলাম, আমরা তো 'প্রকৃত' অর্থেই অন্ধ। এই ছিল উপন্যাসটির ভ্রূণ। তারপর এটিকে জন্ম দিতে ভাবনার জগতে আনুষঙ্গিক বিষয়-আশয় আর ঘটনাবলি জুড়তে থাকলাম। ঘটনাগুলো ভয়ঙ্কর ছিল যদিও, তবু তাতে যুক্তি ছিল জোরালো। বস্তুতপক্ষে, 'ব্লাইন্ডনেস'-এ কল্পনা খুব বেশি নয়; বরং নানা ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কটির একটি সিস্টেমেটিক অ্যাপ্লিকেশন করা হয়েছে।

সবকিছুই ভালো

টাইপরাইটারে লিখতেই অভ্যস্ত ছিলাম আমি। একটা ক্লাসিক টাইপরাইটারে লেখা

আমার সর্বশেষ উপন্যাস 'দ্য হিস্টোরি অব দ্য সাই অব লিসবন'। সত্যি কথা হলো, কম্পিউটারের কি-বোর্ডে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে আমাকে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। আমি শুনেছি, কম্পিউটার নাকি আমার মতো পুরোনো দিনের লেখকদের লেখালেখির স্বতঃস্ম্ফূর্ততাকে নষ্ট করে দেয়। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। বরং

টাইপরাইটারের

মতো কম্পিউটারের কি-বোর্ডের প্রতিও আমি যতটা কম সম্ভব দ্বারস্থ হই। টাইপরাইটার দিয়ে যা করতাম, কম্পিউটার দিয়ে সেটিই করি আমি- এ কথা ঠিক; তবে এ দুটির মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো, কম্পিউটার তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন, অধিক স্বস্তিদায়ক এবং দ্রুতগতির। সবকিছুই ভালো। কম্পিউটার আমার লেখালেখিতে বাজে কোনো  প্রভাব ফেলেনি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com