দুই যুগের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে

প্রকাশ: ২৫ জুন ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২২ । ১৪:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর ১৯৯৮ সালে পদ্মায় সেতুু নির্মাণের কথা ওঠে। সে বছরের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দেন পদ্মায় সেতু নির্মাণ সম্ভব কিনা, তা খতিয়ে দেখতে। ১৯৯৯ সালের মে মাসে শুরু হয় প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা। দেশীয় অর্থায়নে সেই সময়কার যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের হয়ে আরপিটি-নেডকো-বিসিএল জয়েন্ট ভেঞ্চার নামের পরামর্শক কমিটি এই কাজ করে। সমীক্ষার বিষয় ছিল, পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে, নাকি বিদ্যমান ফেরি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

হিমালয় থেকে উৎপত্তির পর আড়াই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসা পদ্মা নদী পানির সঙ্গে বিপুল পলি বয়ে আনে। ফলে নদীর তলদেশে নিয়মিত পরিবর্তন হয়। ভাঙনের কারণে ফেরিঘাট বারবার স্থানান্তর করতে হয়। পলির কারণে নির্দিষ্ট নৌরুট রক্ষা অসম্ভব। তাই ফেরি ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিবর্তে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত আসে প্রাক-সম্ভাব্যতায়। মাওয়া-জাজিরা এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এ দুই অ্যালাইনমেন্টে সেতু নির্মাণের প্রাক-সমীক্ষা করা হয়। নদীর প্রশস্ততা কম বিবেচনায় মাওয়া-জাজিরায় সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরপিটি-নেডকো-বিসিএল জয়েন্ট ভেঞ্চার। এতে প্রাক্কলন করা হয়, ৫ হাজার কোটি টাকার মতো লাগবে সেতু নির্মাণে।

২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রাক-সমীক্ষার প্রতিবেদন দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। ওই বছরের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত সমীক্ষা করতে জাপানকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) স্টাডি টিম ২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে।

২০০৩ সালের ১৪ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মাদারীপুরের শিবচরে হাজী শরীয়তউল্লাহ সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, মাওয়া-জাজিরায় পদ্মা সেতুর কাজ শিগগির শুরু হবে। জাইকার অনুদানে ২০০৩ সালের ১৬ মে শুরু হয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার কাজ। জাইকার নিয়োগ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন কোইয়ি কোম্পানি লিমিটেড এ কাজ করে। তাদের সহযোগী ছিল কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট কনসালট্যান্ট (সিপিসি)।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেতু নির্মাণের জন্য পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ, দোহার-চরভদ্রাসন, মাওয়া-জাজিরা এবং চাঁদপুর-শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ এই চার অ্যালাইনমেন্টে সেতু নির্মাণের সুবিধা অসুবিধা, জমি অধিগ্রহণ-পুনর্বাসন, ট্রাফিক ভলিউমের তুলনামূলক বিশ্নেষণ করে। চাঁদপুর-ভেদরগঞ্জ অ্যালাইনমেন্টে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করতে হতো। দোহার-চরভদ্রাসনে নির্মাণকাজ হলে ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করতে হতো।

পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ এবং মাওয়া-জাজিরা অ্যালাইনমেন্টকে সেতু নির্মাণের প্রাথমিক তালিকায় রেখে ২০০৩ সালের ১ অক্টোবর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের টিম লিডার মিনোরো শিবোওয়া প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালের মার্চে সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৩ সালে প্রতিদিন ৫৮ হাজার ২৮৫ যাত্রী পদ্মা পার হতেন। তাঁদের ৬২ শতাংশ পাটুরিয়া এবং বাকি ৩৮ শতাংশ মাওয়া ঘাট থেকে ফেরি পার হতেন। গড়ে ২ হাজার ৯০৯টি যানবাহন পার হতো ওই সময়ে। যার মধ্যে মাত্র ৪৩৩টি মাওয়া ঘাট হয়ে পার হতো। ২০২৫ সালে এই চিত্র বদলে ৪০ শতাংশ যানবাহন মাওয়া, বাকি ৬০ শতাংশ পাটুরিয়া ব্যবহার করবে। পাটুরিয়ায় ১৫৫ মিনিট এবং মাওয়ায় ২০০ মিনিটে বাস ও যাত্রীবাহী ফেরি পার হতো। মাওয়া-জাজিরায় সেতু হলে ২০১৫ সালে দৈনিক গড়ে ২১ হাজার ২৬০ এবং ২০২৫ সালে ৪১ হাজার ৫৫০টি যানবাহন পার হবে। পাটুরিয়ায় হবে ১৯ হাজার ৮৫০টি যানবাহন।

গত বছর গড়ে পাঁচ মিটার এবং ১৫ বছরে গড়ে দুই মিটার ভাঙনের কারণে মাওয়ায় নদী স্থিতিশীল- এ যুক্তিতে সেখানে সেতু নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে সমীক্ষায় বলা হয়, পাটুরিয়ায় সেতু নির্মিত হলে ১২৬ কোটি ডলার ব্যয় হবে। মাওয়ায় লাগবে ১০৭ দশমিক ৪ কোটি ডলার। পাটুরিয়ায় সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ২ শতাংশ। মাওয়ায় সেতু নির্মিত হলে প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২ কোটি ২২ লাখ মানুষ সেতুর সুফল ভোগ করবে।

মাওয়ায় নদীশাসন ব্যয় কম, জমি অধিগ্রহণে কমসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এই যুক্তিতে ২০০৪ সালের ১৭ জুলাই বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার মাওয়া-জাজিরায় সেতু নির্মাণে সিদ্ধান্ত নেয়।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পদ্মা সেতুর প্রাথমিক নকশাও ছিল। এতে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয় ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার। রেললাইন যুক্ত রাখার সুবিধাসহ ২৫ মিটার প্রশস্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল সমীক্ষায়। পিসি এক্সট্রা ডোজড গার্ডার এবং তিন মিটার ব্যাসের পাইলের ওপর নির্মিত পিসি বক্স গার্ডার সেতু নির্মাণের পরামর্শ ছিল। মাওয়া প্রান্তে ৬০ মিটার এবং জাজিরা প্রান্তে ১২০ মিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয় ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার।

মূল সেতু, ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং ১৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজের জন্য ২০০৪ সালের বাজার দরে ১২৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার ব্যয় ধরা হয়। সেতু নির্মাণে ৫৪ মাস লাগবে বলে সমীক্ষায় বলা হয়। ৮ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর পদ্মা সেতুর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তখনকার সরকার তা অনুমোদন করে যেতে পারেনি। ২০০৬ সালে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা, পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়।

বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করে সেই সময়কার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই বছরের ১১ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পদ্মা সেতু প্রকল্প অনুমোদন পায়। ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ২০১৫ সালের মধ্যে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেতু নির্মাণের অর্থায়নের বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়নি সে সময়ে। ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের শরণাপন্ন হয় বাংলাদেশ।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ২২ দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এইকমকে নকশা তৈরির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০০৯ সালের ১ জুলাই শুরু হয় জমি অধিগ্রহণ।

২০১০ সালের মধ্যে নকশা চূড়ান্ত হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ডিপিপির প্রথম সংশোধন করা হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সেতুর দৈর্ঘ্যও ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার থেকে বেড়ে প্রায় ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার হয়। এর মধ্যে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার মূল সেতু। বাকিটা ভায়াডাক্ট। এর মধ্যে ৫৩২ মিটার রেলের ভায়াডাক্ট।

প্রাথমিক নকশায় সেতুর মাঝ বরাবর তিনটি স্প্যানের নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের সুযোগ রাখার চিন্তা ছিল। পদ্মার পানি প্রবাহের বারবার দিক বদলের কারণে ৪১টি স্প্যানের ৩৭টির নিচ দিয়েই নৌ চলাচলের জন্য প্রায় ৬০ ফুট জায়গা রাখা হয়েছে চূড়ান্ত নকশায়।

২০১১ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পরের বছরের ৩০ জুন চুক্তি বাতিল করে। সরে যায় সহ-অর্থায়নকারী জাইকা, এডিবি ও আইডিবিও। মালয়েশিয়ার সঙ্গে পিপিপি ভিত্তিতে সেতু নির্মাণে আলোচনা হলেও দেশটিও পিছিয়ে যায়।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ৯ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সংসদেও একই ঘোষণা দেন। পরের বাজেটেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয় ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মূল সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। তারও আগে ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে শুরু হয় প্রকল্পের কাজ। এর মধ্যে তিন দফা ডিপিপি সংশোধনী ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

২০১৭ সালের জুনে সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলার প্রস্তুত হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দুই পিলারের ওপর স্প্যান স্থাপনের মাধ্যমে পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com