অন্যদৃষ্টি

সব ঐতিহ্যই কি গর্বের?

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২২ । ১৫:৩০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঞ্যোহ্লা মং

ঐতিহ্য মানেই কিন্তু গর্বের! একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, পরিচিতি তুলে ধরতেও আমরা আমাদের ঐতিহ্যের বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করি। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহূত সমন্বিত ঐতিহ্যের ধারণাটি আরও বেশি গর্বের। কিছু কিছু ঐতিহ্য নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর না হয়ে সামগ্রিক ঐতিহ্যের রূপ পেতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট এলাকা কিংবা দেশে বসবাসকারী মানুষদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যে ঐতিহ্যকে ধারণ করে; ভালোবাসা দিয়ে লালন-পালন করে, সেগুলোকে বলা হচ্ছে 'সমন্বিত ঐতিহ্য'। যেমন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা পহেলা বৈশাখ উদযাপন ইত্যাদি।

সব সমন্বিত ঐতিহ্য মানুষের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবসময় সমান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা কিন্তু নয়। ফলে আমরা সমন্বিত ঐতিহ্যকেও দু'ভাবে দেখে থাকি। নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য ও ইতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য। ধারণাটিকে টুলস হিসেবে ব্যবহার করতে কেবল ইতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্যগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান বৈষম্য ও দ্বন্দ্বের উৎসগুলো কমিয়ে আনার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তেমনি একটি নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যে সমন্বিত ঐতিহ্য আমাদের চারপাশের রাস্তাঘাটকে অপরিচ্ছন্ন ময়লা-আবর্জনাময় করে তুলছে। আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বসবাসের উপযোগী পৃথিবীর একমাত্র গ্রহকে দিন দিন হুমকির মুখে ফেলছে। কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছে। পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের জন্য অনিরাপদ করে তুলছে। সেদিক থেকে আমরা বলতে পারি, আমাদের সমন্বিত ঐতিহ্য টুলসটির পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি ইস্যুতেও কাজ করা কিংবা ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের শহর বা সমাজে নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-নিরক্ষর, শিশু-বুড়ো, রিকশাওয়ালা-গাড়িচালক, ধনী-গরিব, চাকরিজীবী-শ্রমিক সবাই রাস্তাঘাটে ময়লা ফেলে। রাস্তাঘাটকে সবাই এক প্রকার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করে। বড় কর্মকর্তাদের দামি গাড়িতে চড়তে দেখা গেলেও গাড়ির জানালা খুলে টিস্যু, দামি সিগারেটের টুকরো ফেলতে দেখা যায়। শহরের উঁচু দালানের বাসিন্দারাও তাদের নিত্যদিনের বর্জ্য জানালা দিয়ে নিচের দিকে ছুড়ে ফেলে। রাস্তার পাশে থাকা দোকানপাটের প্রতিদিনের ময়লাও ঝাড়ূ দিয়ে ফেলা হয় রাস্তাতেই। বিদ্যুৎ চলে গেলে পলিথিনে ভর্তি ময়লা উঁচুতলা থেকে রাস্তার দিকে নিক্ষেপ করার সংস্কৃতি তো আছেই।

শহরে উঁচু দালানগুলোর ফাঁকা জায়গাগুলোতে (মেথর প্যাসেজ) টন টন বর্জ্য পড়ে জমা হতে দেখা যায়। এক সময় পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলেও বাড়িওয়ালারা নিজেদের উদ্যোগে নিয়মিত পরিস্কার করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। দিনের পর দিন জানালা দিয়ে ময়লা ফেলে নিজেদের চারপাশকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হয়। ঢাকা শহর পৃথিবীতে বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় প্রথমদিকে স্থান পেলেও নগরটির বাসিন্দা হিসেবে লজ্জিত হই না। ইআইইউ জরিপে ঢাকা ২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ১৩৭তম এবং ২০২২ সালে ১৭২টি শহরের মধ্যে ১৬৬তম বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান পায়।

স্কুলে পরিবেশ বিষয়ে পড়ানো হয় না, তা কিন্তু নয়। প্রথম শ্রেণি থেকে পরিবেশ পরিচিতি, পরিবেশ বিজ্ঞান শিরোনামে বই পড়ানো হলেও ছাত্ররা পরিবেশের গুরুত্ব অনুধাবনে পুরোপুরি ব্যর্থ বলতে পারি। তাই তারা পানির বোতল, জুসের ক্যান, কোক খেয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে। আমাদের সমাজে পরিবেশ মানে শুধু নিজের ঘরের ভেতরে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমরা পরিবেশকে ব্যাপক পরিসর নিয়ে ভাবতে পারিনি। শহর-সমাজে ডাস্টবিন ব্যবহার না করা, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা একটি আচরণগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে।

আদিবাসী সমাজে পরিবেশসংশ্নিষ্ট বিষয়ে অনেক ইতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য রয়েছে (যেমন ভিলেজ কমন ফরেস্ট চর্চা)। একইভাবে নগর সমাজে পরিবেশবিরোধী নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্যও বিরাজমান। কবি জীবনানন্দ দাশের সুচেতনা কবিতার সুরে বলতে হয়, 'পৃথিবী আজ গভীরতম অসুখে আক্রান্ত'। এই আচরণ সংশ্নিষ্ট নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে সবার মাঝে উপলব্ধি করানোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার অপার সুযোগ আছে বলে মনে করি।

ঞ্যোহদ্মা মং: উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক
nyohlamong2@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com