অয়নদের বাড়িতে এখন আর ওঠে না সুর

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২২ । ১০:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়া বাদ্যযন্ত্র রোদে শুকাচ্ছেন সুনামগঞ্জের শিল্পী অয়ন চৌধুরী- সমকাল

প্রায় ৩০ বছর আগে বউ হয়ে সুনামগঞ্জ শহরের শান্তিবাগ এলাকার এসেছিলেন লিপি শ্যাম চৌধুরী। ঘরোনি হয়েছিলেন সিলেট অঞ্চলের প্রখ্যাত তবলাবাদক অঞ্জন চৌধুরীর। সেই থেকে একটি দিনও ছিল না যে, তাঁদের বাড়িতে ওঠেনি সুর, বাজেনি তবলা। তাঁদের একমাত্র ছেলে অয়ন চৌধুরীও বড় হয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিবেশে। অনেক শুভানুধ্যায়ী এসেও তাঁদের বাড়িতে রেওয়াজ করেন। কিন্তু ১৬ জুন থেকে সৃষ্ট প্রবল বন্যা থামিয়ে দিয়েছে সব কিছুই, নষ্ট করে দিয়ে গেছে সুর ওঠার সব সরঞ্জাম। শুধু তাঁদেরই নয়, জেলার অন্তত ২০০ শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র-পাণ্ডুলিপি নষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যায়। যে কারণে সুর-লয়-তালহীন এক জনপদ এখন সুনামগঞ্জ।


অয়ন জানান, বাবা-মা কিংবা তিনি, কেউ বাড়িতে না থাকলেও শিল্পীদের কেউ না কেউ এসে তালিম দিয়েছেন তাঁদের বাড়িতে, একটি দিনও বাদ যেত না। কিন্তু বন্যার প্রথম দিন যখন বাড়িতে বাদ্যযন্ত্রগুলো রেখে যান, তখন ভাবতেও পারেননি সব কিছু এভাবে শেষ হয়ে যাবে।


তিনি জানান, তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে গান রেকর্ডের স্টুডিও করেছিলেন, তবলা, হারমোনিয়াম, কি-বোর্ডসহ কিছুই এখন নেই। মা-বাবা কেউ-ই বাড়ির অন্যান্য আসবাবপত্র নিয়ে ভাবেন না, বারবারই কাঁদেন তাঁর শখের সবকিছু নষ্ট হওয়ায়। মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ, গলায় গান ওঠে না- কীভাবে এগুলো ফিরে পাব, কেনার সামর্থ্যও তো নেই। সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম নেওয়া অয়ন নিজেও স্বনামধন্য যন্ত্রশিল্পী, গায়ক হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর।


বন্যা কমে গেলেও যে ক্ষত রেখে গেছে, তাতে কষ্টে কাতর অয়নের মা লিপি শ্যাম চৌধুরী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ঘরে যখন কোমর সমান পানি, বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি, পথে বুক সমান পানি, নৌকা কিংবা বাহন, কোনো কিছুই নেই। এ অবস্থায় ছেলে ও তার বাবার বাদ্যযন্ত্রগুলো অনেক উঁচুতে রেখে দোতলায় গিয়ে ঠাঁই নিয়েছিলেন। কিন্তু পানি এতটাই বেড়েছিল যে, ঘরের বারান্দার চাল পর্যন্ত উঠেছিল। যে কারণে আর ঘরে ঢোকা যায়নি। নষ্ট হয়ে গেছে সব। কেবল তাদের বাড়িই নয়, ভয়াবহ বন্যার পর সুনামগঞ্জের অনেকের বাড়িতেই হারমোনিয়ামে সা রে গা মা পা বাজে না। শহরের নবীনগরের যন্ত্রশিল্পী অমিত বর্মণ বলেন, বাদ্যযন্ত্র সবই ডুবে গিয়েছিল। চামড়ার যন্ত্র, পানি লাগলেই শেষ। কিছু মেরামত করতে দিয়েছি, টাকার জন্য আনতে পারছি না। পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়া কিছু যন্ত্র দেখিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন অমিত।


শহরের ষোলঘর এলাকার কণ্ঠশিল্পী জেলী রানী দাসের কষ্ট, তাঁর হারমোনিয়ামের যে অবস্থা হয়েছে, সেটি আর মেরামতের উপযোগী নেই। ঘরে পাঁচ ফুটেরও বেশি ওপরে রেখে আত্মীয়ের তিন তলায় বাবা-মাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁরা। এক সপ্তাহ পর ফিরে এসে দেখেন ডুবে পচে গেছে হারমোনিয়াম। একই অবস্থা শহরের ষোলঘরের যন্ত্রশিল্পী প্রতীক এবং হাছননগরের বিজনেরও। যন্ত্র দিয়েই জীবিকা ছিল প্রতীক-বিজনের। কিন্তু দু'জনই এখন বেকার।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, শিল্পীদের মধ্যে হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্তই বেশি। বাদ্যযন্ত্র, গানের স্কুল বা গানের ঘর নষ্ট হয়েছে অনেক। শিল্পকলার হিসাবে অন্তত ২০০ শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়েছে। অনেকের দীর্ঘদিনের লেখা গানের পাণ্ডুলিপিও নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি সরকার ও সংস্কৃতি মননশীল বিত্তশালীদের সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখার অনুরোধ জানান।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com