আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রকে ভোগাবে 'ন্যান্সি পলিসি'

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২২ । ০২:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

এস এম সাব্বির খান

রাশিয়ার পর তাইওয়ান ইস্যুতে এবার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র চীনকে তাতিয়ে দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক সংঘাতের পরিস্থিতি উস্কে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩ আগস্ট চীনের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ান সফর করেন। এ সময় তিনি চীনা কর্তৃত্বের বিপরীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধিকার অর্জনে তাইওয়ানকে সর্বাত্মক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন। আর এতেই প্রবল আক্রোশে ফুঁসে উঠেছে চীন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চীন-তাইওয়ান সামরিক সংঘাতের পারদ চড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তাইওয়ান ঘিরে যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শক্তিশালী সামরিক মহড়া চালিয়ে আগ্রাসী বার্তাও দিয়েছে তারা।

করোনা-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বাণিজ্যে অস্থিতিশীলতা প্রকট হওয়ায় ধুঁকছে গোটা বিশ্ব। এরই মাঝে যদি বর্তমান সময়ে বিশ্ব-বাণিজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীনও যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে পৃথিবীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কল্পনাতীত। একটি চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত বিশ্বে জেনে-শুনে কেন এমন সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতি উস্কে দিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ- তা নিয়ে নানা মনে নানা প্রশ্ন।

যদিও এ ঘটনার পরপরই মার্কিন সিনেট ও প্রতিরক্ষা বিভাগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রকাশিত সংবাদে দাবি করেছে, মার্কিন প্রশাসনের নিষেধ সত্ত্বেও তাইওয়ান সফর করেছেন পেলোসি, যা বেইজিংয়ের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় মার্কিন প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। তবে তাদের এই কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা বলা কঠিন।

বিষয়টি এমন একটি সময়ে চীনকে বিগড়ে দিল, যখন কিনা রুশ সামরিক অভিযান বন্ধের মাধ্যমে একটি চলমান সংকট উত্তরণের সর্বশেষ পন্থা হিসেবে চীনের দ্বারস্থ হয়েছিল ইউক্রেন। আশায় ছিল বিশ্ববাসীও। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের প্রেক্ষাপটে চীন-তাইওয়ান পরিস্থিতি এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিবেচনা করলে তা এই মুহূর্তে আর সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। বর্তমান বিশ্বের জন্য এটি মোটেও সুখকর নয়।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুদ্ধে জড়িয়ে রাশিয়ার সামরিক মজুত কিছুটা ক্ষয় করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে একটা জোর ধাক্কা দেওয়ার যে চাল চেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র, তাতে বলির পাঁঠা হয়েছে ইউক্রেন। সেই ধাক্কার সাময়িক প্রভাব দ্রুত কাটিয়ে নিয়ে রাশিয়া নিরেট পর্বতের মতো অটল দাঁড়িয়ে থাকলেও টলে উঠেছে গোটা বিশ্বব্যবস্থা।

এদিকে এখন তাইওয়ান যদি ন্যান্সি পেলোসিতে অনুপ্রাণিত হয়ে চীনকে টেক্কা দিতে যায়, তাহলে তাদের পরিণতিও ইউক্রেনের মতো হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তাদের বেলায়ও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মকভাবে মাঠে থাকবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর চীনকে সমীহের সঙ্গে আমলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যেভাবে পেলোসির সফরের সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, তাতে এই ধারণাই সত্য বলে প্রতীয়মান। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যেখানে রাশিয়া এবং চীনকে যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক অবস্থা দুর্বল করতে চাচ্ছে; সেখানে তারা নিজেরা যে কোনো যুদ্ধে জড়াবে না, সেটা বলাই যায়।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বলছে, রাশিয়া ও চীনকে টেক্কা দিয়ে বিশ্ব মোড়লের আসন ধরে রাখার চেষ্টায় মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে কোনোমতে পিঠ বাঁচিয়ে বেরিয়ে এলেও তাইওয়ান ইস্যুতে ভুল চাল খেলা তাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হতে যাচ্ছে। অতি উৎসাহী ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের জেরে যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে বেইজিং, তা থেকে এই বার্তা সুস্পষ্ট। কঠিন সময়ে একটি যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়া ও আরেকটি সংঘাতের পরিস্থিতি উস্কে দেওয়ার মূল ক্রীড়নক হিসেবে ইতোমধ্যে তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে শুরু করেছে বিশ্বমন্দার প্রভাবে জর্জরিত অন্য রাষ্ট্রগুলো। একের পর এক ভুল কূটনীতির চালে রাশিয়ার পর চীনের কাছেও মার খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে তাদের প্রতি বিভিন্ন জোটভুক্ত মিত্র রাষ্ট্রগুলোর আস্থা ও শ্রদ্ধায়ও ব্যাপক টান পড়তে শুরু করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে মোড়লগিরি তো দূরের কথা, অন্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলাটাই দুস্কর হয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।

এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব শাসনের গদিতে টিকে থাকার কোনো পথ শি জিনপিং-পুতিনরা যে খোলা রাখবেন না- তা বুঝে নিতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইউক্রেন ইস্যুতে রুশপন্থার প্রতি বেইজিং তার সমর্থন অব্যাহত রেখে এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের ব্যাপারে মস্কোর সরব প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে সেই সংকেত দিয়ে দিয়েছে। ন্যান্সির তাইওয়ান সফরের মাধ্যমে যে বার্তা দিতে চেয়েছিল মার্কিন প্রশাসন; তা উল্টো তাদের ওপর বাড়ি পড়তে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কি তবে তাইওয়ানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে ড্রাগন বের করে আনল?

এস এম সাব্বির খান: সাংবাদিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com