আজগুবি খরচ দেখিয়ে বাস ভাড়া বৃদ্ধি

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২২ । ০২:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব আহাম্মদ

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা শহরে চলা লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে বছরে খরচ সোয়া ১০ লাখ টাকা! প্রতি তিন মাস অন্তর ২৬ হাজার টাকার টায়ার লাগানো হয়! বছরে টায়ার-টিউবের খরচ ৩ লাখ ১২ হাজার টাকা! ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে লাগে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা! সংস্কারে ব্যয় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা! চালক-শ্রমিকদের মজুরি বছরে পৌনে ৭ লাখ টাকা (মাসে প্রায় ৬০ হাজার)! ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া বাড়াতে এমন আজগুবি খরচ দেখিয়েছে খোদ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটি। তাদের ব্যয় বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, ঢাকার এক একটি বাস কেনায় বিনিয়োগ, মবিল, যন্ত্রাংশ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতনসহ বছরে ব্যয় ২৩ লাখ ১৪ হাজার ৮৪৮ টাকা! ডিজেল বাবদ আরও ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়। দূরপাল্লার বাসের বার্ষিক খরচ ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৩ টাকা! ডিজেল লাগে ৩৭ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯২ টাকার।

এক লিটার ডিজেলে ঢাকায় আড়াই কিলোমিটার এবং মহাসড়কে সোয়া ৩ কিলোমিটার চলে বাস। এ হিসাবে ঢাকায় কিলোমিটারে ডিজেল খরচ ৪৫ টাকা ৬০ পয়সা। এ ছাড়া যেসব খরচ দেখানো হয়েছে তা অতিরঞ্জিত। ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ার আগে কিলোমিটারে জ্বালানি ব্যয় ছিল ৩২ টাকা।

একাধিক পরিবহন মালিক সমকালের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, চাঁদা ও পুলিশের ঘুষ বাবদ বছরে প্রতিটি বাসের পেছনে ৫-৬ লাখ টাকা যায়। তা ব্যয় বিশ্নেষণে দেখানো যায় না। ফলে বাকি খরচ বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখাতে হয়।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে ১৬ এবং দূরপাল্লার বাসে খরচের ১২ খাত দেখানো হয়েছে। মহানগরের বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। দূরপাল্লার বাসের দাম ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। বাসের আয়ুস্কাল ১০ বছর ধরে ব্যাংক ঋণের সুদ, রেজিস্ট্রেশন ফিসহ অন্যান্য কর যোগ করে বিনিয়োগ বাবদ মহানগরের বাসের বার্ষিক খরচ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৬ টাকা। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে তা ৮ লাখ ৯৪ হাজার ২০৬ টাকা ধরা হয়েছে।

অবশ্য নিয়মানুযায়ী বাসের আয়ুস্কাল ২০ বছর। গত ২৭ জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের সভায় বাসের আয়ুস্কাল ২৫ বছর করার আবেদন জানিয়ে বিফল হন মালিকরা। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণে আয়ুস্কাল ১০ বছর ধরাকে প্রতারণা আখ্যা দিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ঢাকার ৯৮ ভাগ বাস চলাচলের অযোগ্য। দূরপাল্লার ৪৮ শতাংশ বাস ২০ বছরের বেশি বয়সী। আজগুবি খরচ দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে ভাড়া বৃদ্ধির অভিযোগ নাকচ করেছেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। তিনি বলেছেন, মালিকদের দাবি মতো কিছু হয়নি। প্রতিটি খরচ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ভোক্তা প্রতিনিধিরা আলোচনা করে নির্ধারণ করেছেন।

ব্যয় পুনর্নির্ধারণ কমিটির প্রধান বিআরটিএর পরিচালক সীতাংশু শেখর বিশ্বাস বিদেশে থাকায় তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। তাঁর বিকল্প হিসেবে গত শনিবার ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করা আরেক পরিচালক লোকমান হোসেন মোল্লার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেছেন, শুধু ডিজেল নয়, সব ব্যয় বেড়েছে। ভাড়া যা বেড়েছে, তাতেও মালিকের পক্ষে মুনাফা করা কঠিন।

ভাড়া নির্ধারণে দেখানো হয়েছে, নগর পরিবহনের বাসে প্রতি ২৫ দিনে একবার ইঞ্জিন অয়েল (মবিল) বদল করা হয়। এতে ৫ হাজার ৮৮০ টাকা লাগে। মবিল, দুই ধরনের ফিল্টার পরিবর্তন ও গ্রিজিংয়ে মাসে খরচ ১১ হাজার ৬৮০ টাকা। প্রতি তিন মাসে একবার ক্লাচ প্লেট, চার জোড়া ব্রেক শু পরিবর্তনে খরচ ২৭ হাজার টাকা।

পণ্যপরিবহন মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের নেতা মো. স্বপন জানান, কাভার্ডভ্যানে তিন-চার মাস পরপর মবিল বদল করা হয়। বাসেও তেমনই করা হয়।

ব্যয় বিশ্নেষণে ঢাকার বাস প্রতি পাঁচ বছরে একবার রিনোভেশনে (সংস্কার) সাড়ে ৬ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে। ফলে বছরে খরচ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। দূরপাল্লার বাসের রিনোভেশন খরচ ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। রাতে বাস রাস্তায় পার্ক করা হলেও ঢাকার বাসে গ্যারেজ ভাড়া ৬৫ হাজার টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে গ্যারেজ ও টার্মিনাল খরচ দুই লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

দূরপাল্লার বাসে ৩৩ হাজার টাকা দামের ১৪টি টায়ার-টিউব পরিবর্তনে বছরে চার লাখ ৬২ হাজার টাকা খরচ ধরা হয়েছে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, দুর্ঘটনা তদন্তে দেখা যায় একই টায়ার বারবার রি-ট্রিডিং করে চালানো হয়। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ব্রেক ফেল। তিন মাস অন্তর ব্রেক শু বদল করলে দুর্ঘটনা হওয়ার কথা নয়। মাসে একবার ইঞ্জিন অয়েল, মবিল, ফিল্টার ও এয়ারক্লিনার বদল কিংবা গ্রিজিং করারও নজির নেই।

ঢাকার বাসে বছরে একবার পুরো ইঞ্জিন খুলে (ওভারহোলিং) তা মেরামতে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ ধরা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান বলেছেন, এগুলো অবিশ্বাস্য। এত মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে কোনো বাস এমন লক্কড়ঝক্কড় থাকত না।

সড়ক পরিবহন আইনে চালক-শ্রমিককে মাসিক বেতনে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। টাস্কফোর্সের শেষ সভাতেও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিয়োগপত্র দেওয়ার নজির নেই। ভাড়া নির্ধারণে ঢাকার বাসে বছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার এবং দূরপাল্লার বাসে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা মজুরি ও উৎসব ভাতা দেখানো হয়েছে। তবে সড়ক পবিহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, মালিকরা মাসিক বেতন ও নিয়োগপত্র দিচ্ছেন না।

বাসে ৫২ আসন ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দূরপাল্লার সব বাস ৪০ বা তার কম আসনের। ৫২ আসনের দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও ৪০ আসনের ক্ষেত্রে তা হবে ২ টাকা ৮০ পয়সা। আসন কমলে ভাড়া আরও বাড়বে। নগর পরিবহনের বাসের ৯৫ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসের ৭০ শতাংশ যাত্রী চলাচল করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ঢাকার বাসে আসন খালি তো দূরের কথা, গাদাগাদি করে যাত্রী ওঠে। দূরপাল্লার বাসের দাম ৮০ লাখ টাকা দেখানো হলেও আদতে বিলাসবহুল এসি বাসের মূল্য এটা। এ ধরনের বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com