বড় চাপ সামলাতে নানামুখী উদ্যোগ

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২২ । ০২:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

জ্বালানি তেলের রেকর্ড দাম বাড়িয়েছে সরকার। এতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছে মানুষ। জনজীবনে এই খরচের চাপ কতটা প্রভাব ফেলছে সেটার মূল্যায়ন করছে অর্থ বিভাগ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্নিষ্টরা। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রীও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়ে, এতে বাড়বে মূল্যস্ম্ফীতি। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে জনজীবনে কী প্রভাব পড়ছে তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মূল্যায়ন শেষে সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকার জনগণের সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে, আগামীতেও করবে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।

বিশ্ববাজারের পড়তি সময়ে এসে বাংলাদেশ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ৫ আগস্ট রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, ডিজেল ও কেরোসিনের প্রতি লিটারের দাম ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেন ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন মধ্যরাত থেকে নতুন দর কার্যকর করা হয়। এরপর থেকেই বাস, ট্রাক, অ্যাপের প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, লঞ্চ ও হিউম্যান হলারের ভাড়া বেড়ে যায়। বেড়েছে চাল, আটা, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। রড, স্টিল, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দরও বাড়ন্ত।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে অর্থনীতি ও জনজীবনে যে প্রভাব পড়ে সেটার রেশ শেষ হতে ৯ মাস লেগে যায়। ফলে আগামী ৯ মাস দেশে মূল্যস্ম্ফীতির চাপ থাকবে। তবে এই সময় কেমন যাবে তা এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। কারণ এখনকার যে পরিস্থিতি চলছে তা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও জড়িত। এজন্য আগামী দিনগুলো কেমন যাবে তা মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বাড়ানো, রাশিয়া-ইউক্রেনের চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে চীন-তাইওয়ানের মধ্যকার উত্তেজনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ডলারের উচ্চ দর। এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে ডলারের উচ্চ দর নিয়ন্ত্রণে।

অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই আগস্ট শেষে মূল্যস্ম্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। পরে কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে অর্থবছর শেষে ১২ মাসের গড় হিসাবে সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি থাকবে মূল্যস্ম্ফীতি। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সরকার এই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশি জোর দিচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি হলে প্রবৃদ্ধি কম হবে এমন ধরে নিয়েই এগোচ্ছে সরকার। তবে আগামীতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দেশেও কমানো হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় আছে, সেপ্টেম্বরের দিকে এক দফা দাম কমানোর। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং চীন-তাইওয়ান ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা। এ দুই ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামীতে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সুদহার বাড়িয়ে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে ডলার সংকট প্রকট হচ্ছে। এশিয়াতে এর প্রভাব বেশি।

এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক দাম কমলে দেশেও কমানো হতে পারে। এমনকি পাশের দেশ ভারত যেভাবে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে, সেভাবে বাংলাদেশেও নির্ধারণ করা হতে পারে। ডলারের দামের অস্থিরতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশেই ডলারের দর বেড়েছে। যারা যুদ্ধ করছে তারাও ডলারের উচ্চ দরে ভুগছে, আর যারা যুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে তারাও ভুগছে। এর মধ্য দিয়ে ডলারের দামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক যে ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওই ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ডলার নিজেদের কাছে রেখে অনৈতিক ব্যবসা করছিল। প্রয়োজনে এ রকম আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অর্থ বিভাগের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সার ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কিছুটা সাশ্রয় হবে। সরকার ওই সাশ্রয়ী অর্থ দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে খরচ করতে পারে। খোলাবাজার (ওএমএস), ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে বিক্রিসহ অন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি নতুন কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক গম আমদানির জন্য কম সুদে একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করছে। করোনার সময় বড় শিল্প খাতে যে প্রণোদনা তহবিল দেওয়া হয়েছিল, ওই সময় যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ পায়নি তাদের জন্য তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান সমকালকে জানান, পণ্যমূল্য ও বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার চিন্তাভাবনা চলছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দর বাড়ার প্রভাব মোকাবিলার উদ্যোগে দেরি করা ঠিক হবে না। কারণ এর প্রভাব শুরুতেই সবচেয়ে বেশি হয়। এতে দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়, পুষ্টিহীনতা বাড়ে, কর্মসংস্থানও কমে। ফলে দেরি না করে সরকারকে দ্রুত দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি কিছু নীতি-সহায়তা দিতে হবে, যাতে নির্ধারিত আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুবিধা পান।

গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রথমে দরকার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনা। বিনিময় হার স্থিতিশীল না হলে জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হবে। আর মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ব্যবহার করতে হবে। সুদহার সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বাড়তে দেওয়া উচিত। এর পাশাপাশি কৃষি কাজে রেশনিংয়ের মাধ্যমে কম দামে ডিজেল সরবরাহ, বাস ভাড়ায় সরকার ভর্তুকি দিতে পারে। এতে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, স্কুলগামীরা সুবিধা পাবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, করোনার কারণে কিছু মানুষ আগে থেকেই চাপে রয়েছে। তাদের আয় করোনার আগের অবস্থায় যাওয়ার আগেই জ্বালানির এই দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে চাপের মধ্যে থাকা মানুষের জীবিকার সংকট আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভাতা ও সুবিধা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি শহরের দরিদ্রদের লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।























© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com