ছাত্রকে বিয়ে করে আলোচনায় আসা শিক্ষিকার মৃত্যু নিয়ে রহস্য

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২২ । ২০:০৫ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২২ । ২০:২১

নাটোর প্রতিনিধি

ফেসবুকে পরিচয়ের পর ৬ মাস প্রেম, তারপর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নাটোরের কলেজছাত্র মামুন ও শিক্ষিকা খায়রুন

নাটোরে কলেজছাত্রকে বিয়ে করে ভাইরাল হওয়া গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। রোববার ভোরে নাটোর শহরের বালারিপাড়া এলাকার হাজী নান্নু মোল্লা ম্যানশনের চারতলার ফ্ল্যাট থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

শিক্ষক খাইরুন নাহারের ভাড়া বাসার কেয়ারটেকার নিজামুদ্দিন জানান, সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের স্বামী মামুন শনিবার রাত ১১টার দিকে বাসায় ঢোকেন। পড়ে পাশের বাড়িতে অবস্থান করার সময় রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে বাসার গেটে ধাক্কাধাক্কির শব্দ শুনতে পেয়ে এগিয়ে যাই। এ সময় মামুন সাহেব আমাকে বলে সে ওষুধ আনতে যাবে। তিনি গেট খুলে দেওয়ার জন্য বলেন। আমি ভাবী কেউ হয়ত অসুস্থ তাই সে বাহিরে ওষুধ আনতে যাবে। গেট খুলে দেওয়ার পর মামুন বাহিরে যান।

৬ মাস প্রেমের পর সহকারী অধ্যাপককে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বিয়ে করেন কলেজছাত্র। বিয়ের খবর প্রকাশ করেন আরও ৬ মাস পর।

‘পড়ে ভোর ৬টার দিকে তিনি ভেতরে ঢুকে ৪ তলায় তাদের ঘরে যান। এর ৫ মিনিট পর আমাকে ওপরে যাওয়ার জন্য ডাকতে থাকেন মামুন। তিনি বলেন, “একটু উপরে যেতে বললে আমি গিয়ে জানতে চাই কী হয়েছে? তিনি আমাকে উপরে যেতে বলেন।” উপরে গিয়ে তার স্ত্রীকে নিচে পড়ে থাকতে দেখি এবং খাটের ওপর চেয়ার ও সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নার একটা অংশ ঝুলতে দেখি। ঘটনা সন্দেহজনক হওয়ায় আমির বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির মালিককে জানাই।’ যোগ করেন তিনি।

পুলিশ হেফাজতে মামুন জানান, ‘তিনি নামাজ পড়ার জন্য রাতে বাহিরে গিয়েছিলেন। সকালে তার স্ত্রীকে তার কর্মস্থলে পৌঁছানোর কথা ছিল। নামাজ পড়তে যাওয়ার পর স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার জন্য রিং করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ফিরে এসে দেখি তার স্ত্রী ঘরের মধ্যে সিলিং ফ্যানের সাথে ফাঁস দিয়ে ঝুলে রয়েছে। তিনি দ্রুত হাসুয়া খুঁজে না পেয়ে ওড়নায় গ্যাস লাইটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় নিচে নামিয়ে রাখি। এ সময় তার হাতে আগুনে ফোসকা পড়েছে।’

তার স্ত্রীর আত্মহত্যার কারণ জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘তারা ৮ মাস আগে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে তার (স্ত্রীর) মন ভালো দেখি নাই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের কাছে থেকে প্রায় সে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ব্যবহার পাওয়ার কারণে মন ভার করে থেকেছে। তারা সবাই প্রায় ফোন করে তাকে বলে, “তুই কেন হাঁটুবয়সি বা ছেলেবয়সি ছেলেকে বিয়ে করেছিস।” তাকে সবসময় তার নিকটজনরা মানসিকভাবে নির্যাতন করছিল।’

এদিকে বাড়ির কেয়ারটেকারের দেওয়া ভাষ্যের সঙ্গে অমিল থাকায় এবং মামুনের অসংলগ্ন কাথাবার্তায় এ ঘটনার জন্য তার দিকেই আঙুল তুলেছেন কেউ কেউ। তারা মামুনকে মাদকাসক্ত বলেও দাবি করেন।

শিক্ষিকার চাচাতো ভাই সাবের হোসেন বলেন, ‘সকালে একটা ফোন আসে, আমার বোন নাকি আত্মহত্যা করেছেন। খবর শুনেই গুরুদাসপুর থেকে ছুটে আসি। এসে দেখি, বোনের মরদেহ মেঝেতে পড়ে আছে। মরদেহের গলায় কিছু দাগ রয়েছে। এতে মনে হচ্ছে ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত খুন। আমরা এ ঘটনার বিচার দাবি করছি।’

শ্যালিকা খাইরুন নাহারের মৃত্যুর খবর পেয়ে আহমেদপুর থেকে নাটোরে ছুটে আসেন দুলাভাই জয়নাল। হাসপাতালের মর্গের কাছে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘তার শ্যালিকার মনে শান্তি ছিল না। এই বিয়েটা করার পর থেকে সবাই তাকে ছিছি করত। মুখে হাসিমাখা থাকলেও মনে শান্তি ছিল না। আর যাকে বিয়ে করেছে সেই মামুন ছেলেটাও ভালো না।’

বিয়ের পর শিক্ষিকা-শিক্ষার্থী।

শিক্ষিকা খাইরুনের ভাতিজা নাহিদ হোসেন জানান, ‘মামুন মাদকাসক্ত। বিয়ের পর থেকে ফুফুর কাছে থেকে মামুন এ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল নিয়েছেন। সম্প্রতি আরও দামি মোটরসাইকেল চেয়েছেন মামুন। এ নিয়ে তার ফুফু খায়রুন নাহার মানসিকভাবে চাপে ছিলেন। তার ফুফু পারিবারিক বিভিন্ন চাপে অশান্তিতে ছিলেন।’

খুবজীপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবু সাঈদ বলেন, খাইরুন নাহার তার কলেজের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আসতেন। কলেজ থেকে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন করা হয়নি। অধ্যক্ষ হিসেবে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোনো কথা হয়নি।

কলেজের সমাজকর্ম বিষয়ক শিক্ষক ওয়াহেদুজ্জামান জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, খাইরুন নাহার নিয়মিত কলেজে আসতেন এবং ক্লাস নিতেন। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। হঠাৎ এমন করার কারণাটা ঠিক বুঝতে পারছি না আমরা।

জেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার আক্তার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষিকা তার সহকর্মীদের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেননি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হলে এ নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

ছাত্রকে বিয়ে করে ভাইরাল হওয়া খুবজিপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার (৪০) আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার সকালে মানুষ তাদের সেই বাড়িতে গিয়ে ভিড় করে। লোকজন তার বাসায় গিয়ে খায়রুনের লাশ মেঝেতে অবস্থায় দেখতে পায়। রোববার ভোরে নাটোর শহরের বলারীপাড়ার ভাড়া বাসার চারতলায় তিনি আত্মহত্যা করেন। মামুন-খাইরুন দম্পতি নাটোর শহরের বলারীপাড়ার হাজী নান্নু মোল্লা ম্যানশনের চারতলায় ভাড়া থাকতেন।

বাড়ির মালিক তানভির আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, কেয়ারটেকার নিজামুদ্দিন আমাকে বলার পর তাদের ঘরে গিয়ে মৃতদেহের পাশে মামুনকে দেখতে পাই। এরপর আমি ঘর থেকে বের হয়ে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে পুলিশে খবর দিই। কয়েক মাস আগে তারা আমার বাড়ির ৪র্থ তলার একটি ইউনিট ভাড়া নেয়। তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয়েছে বলে শুনিনি। তবে তাদের কাহিনী ভাইরাল হওয়ার পর কিছু দিন তারা এখানে ছিলেন না।

পুলিশ লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য নাটোর সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ খাইরুনের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য তিন সদস্যের মেডিকেল টিম গঠন করে।

গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন খায়রুন নাহার।

নাটোর সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. পরিতোষ রায় জানান, ওই তিন সদস্যের মেডিকেল টিম ময়নাতদন্তের পর ভিসেরা রিপোর্টের জন্য আলামত ঢাকায় প্রেরণ করবেন।

নাটোর সদর থানার ওসি নাছিম আহমেদ জানান, এ ঘটনায় সদর থানায় একটি ইউডি মামলা রুজু করা হয়েছে। সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে খাইরুন নাহারের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা জানান, এই মৃত্যুর ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই ও জেলা পুলিশ তদন্তে মাঠে নেমেছে। এই দম্পতির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমালোচনা হওয়ার কারণেই খাইরুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com