সমকালীন প্রসঙ্গ

বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির নতুন বিন্যাস

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২২ । ০৯:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুভ কিবরিয়া

ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন ঠিক কী অর্জন করতে চাচ্ছেন, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। কিন্তু পুতিন যে আমেরিকার জন্য একটা বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন- সেটা স্পষ্ট। যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হচ্ছে, ততই পরিস্কার হচ্ছে- বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির ফাঁকা মাঠে রক্তপাতের ঝুঁকি ছাড়াই বড় সুযোগ বাগিয়ে নিয়ে নিচ্ছে আমেরিকা। পুতিন চাইলেও কি এ যুদ্ধ থামাতে পারবেন? মনে হয় না।

আমেরিকা কীভাবে এই যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে? 'বিশ্ব মোড়ল' আমেরিকার বহুদিনের ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির মৌলবাদী-শ্বেতাঙ্গবাদী আমেরিকার ভাবমূর্তি খুব সফলভাবেই তৈরি করতে পেরেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাইডেন প্রশাসনের প্রথম কাজ ছিল ট্রাম্প জমানার সেই শ্বেতাঙ্গবাদী আমেরিকার ভাবমূর্তির পরিবর্তন। তাদের লক্ষ্য ছিল আবার বিশ্বব্যাপী আমেরিকার রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনা। বিশ্ব মোড়ল কিংবা বিশ্বের কথিত অভিভাবক সাজা আমেরিকার পুরোনো ভাবমূর্তিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সে ক্ষেত্রে প্রধানতম বাধা ছিল ইউরোপ।

ইতোমধ্যে ইউরোপ এক জোট হয়ে আমেরিকার বলয় থেকে বেরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শক্তিশালী করেছে। স্বাধীন সত্তা হিসেবে অর্থনৈতিক শক্তিরূপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোট বাঁধতে শুরু করেছে। আমেরিকার বাইরে রাশিয়া, চীনের সঙ্গে নানা রকম অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্কও তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপের এই ঘনীভবন ইউরোপজুড়ে এক ধরনের অভিবাসনবিরোধী বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ কট্টরপন্থী রাজনীতির সূচনাও করেছে। ধীরে ধীরে সামরিক জোট ন্যাটোর বন্ধনও কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে।

পুরো ইউরোপ সামরিক ব্যয়ের চাইতে সামাজিক ব্যয়ের দিকে অধিকতর মনোযোগী হয়েছে। রাশিয়ার গ্যাস ও জ্বালানির বিপুল সরবরাহ ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার একটা বড় জোগানদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে জ্বালানি খাতে ক্লিন ফুয়েল কিংবা গ্রিন ফুয়েল অথবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে ইউরোপের শক্তিমান সদস্যরা সীমিত আকারে নানা রকম নিরীক্ষা করারও সুযোগ পেয়েছে। ইউরোপের এই সমরাস্ত্রবিমুখ মনোভাব ন্যাটোকে বিকশিত করার চাইতে তার শক্তি সীমিত করার দিকেই ঝুঁকেছে। একটা শান্তিকামী, যুদ্ধবিরোধী, রক্তপাতহীন উন্নয়নের দিকেই এগোতে শুরু করেছে ইউরোপ।

মনে রাখতে হবে, এক ইউরোপ অর্থনীতির বিবেচনায় ঠিক এক নয়; তার মধ্যেও আছে শক্তিমান ও দুর্বলের বিভাজন। কাজেই সামগ্রিক ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছাতার নিচে সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়নের দিকেই হাঁটতে চেয়েছে ইউরোপ। এসব উদ্যোগ ও দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের আমেরিকানির্ভরতা অনেকটা কমিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যানারে আমেরিকার প্রভাবমুক্ত হয়ে ইউরোপ গোটা পৃথিবীতে কথা বলার স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার স্বাধীন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে শুরু করেছে। এই স্বাধীন সত্তার ইউরোপ ঠিক আমেরিকান স্টাবলিশমেন্টের পছন্দ নয়।

জ্বালানির কারণে ইউরোপের রাশিয়ানির্ভরতাও আমেরিকার স্বার্থের ঠিক অনুকূল নয়। সেটা সামরিক জোট ন্যাটোর বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই আমেরিকান স্টাবলিশমেন্টের চাওয়া ছিল, বিশেষত বাইডেন প্রশাসনের নেতৃত্বে, ইউরোপকে রাশিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মিত্রতা থেকে দূরে সরিয়ে আনা। দ্রুততর সময়ে রাশিয়ার বাহুডোর থেকে আমেরিকার পুরোনো মিত্রতার জালে ইউরোপকে বেঁধে ফেলা। ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধিয়ে রাশিয়া আমেরিকার সেই পাতা ফাঁদেই পা দিয়েছে।

কেননা, এই যুদ্ধকে আমেরিকা অর্থ, অস্ত্র, গোয়েন্দা, নীতি-সমর্থনসহ সব রকম সহায়তা দিয়ে প্রলম্বিত করছে। এই যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে, রাশিয়া তত চাপের মুখে পড়বে। রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর আরও নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আসবে। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবে আমেরিকা।

রাশিয়ার জনজীবনেও অর্থনীতি নিদারুণ চাপ বাড়াবে। রাশিয়ার ওপর চাপ যত বাড়বে, ততই সে ইউরোপকে শায়েস্তা করার জন্য তার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে রাজনীতি করবে। আর জ্বালানি নিয়ে রাশিয়া ইউরোপের ওপর যত চাপ বাড়াবে, ইউরোপ ততই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। আর তখনই সে আমেরিকার সশস্ত্র যুদ্ধবাজ নীতির সহযোগী হয়ে উঠবে।

ইউরোপে ইতোমধ্যে রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। শীত মৌসুমে আরও কমিয়ে গোটা ইউরোপকে বিপন্ন করে তুলতে চাইবে। এই বিপদাপন্ন সময় মোকাবিলার জন্য গোটা ইউরোপ নতুন নতুন জ্বালানির উৎস আবিস্কারে মরিয়া হয়ে উঠবে। কেননা, শুধু রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা আজ তাদের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব যেভাবে বিপদাপন্ন করেছে; এই একমুখী জ্বালানিনির্ভরতার পথ থেকে তাদের বেরোতেই হবে।

বহুমুখী জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করতে না পারলে ইউরোপের আত্মাহুতি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। ফলে গোটা পৃথিবীর জ্বালানি সোর্স ও সরবরাহের একটা নতুন বিন্যাসেরও উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। জ্বালানি রূপান্তরের এক ক্রান্তিকালে ইউক্রেন যুদ্ধ তাই জ্বালানি রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারে।

এই যুদ্ধের প্রধানতম প্রভাব দুটি। প্রথমত, ন্যাটো আগের চেয়ে শক্তিশালী হবে। সমরাস্ত্র শিল্পের বিকাশ ঘটবে। ইউরোপজুড়ে সমরাস্ত্র ব্যয় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরোতে মরিয়া ইউরোপ জ্বালানির নতুন উৎস খুঁজবে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমাত্রিকায়ন ঘটবে। কার্বনযুক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে কার্বনমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জ্বালানি রূপান্তরের যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা সাময়িক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কিন্তু অচিরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ ঘটবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি যাতে বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, সেই চেষ্টা চলবে ভীষণভাবে। পরিকল্পনা, গবেষণা, উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে ইউরোপ দ্রুতই নয়া জ্বালানি রাজনীতির সৃষ্টি করবে। তেল-গ্যাস-কয়লার মালিকানা নিয়ে বড়াই করার দিন ফুরোবে। নতুন নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানির আগমন ও সফল বাণিজ্যিক ব্যবহার জ্বালানি রাজনীতির পুরোনো প্লেয়ারদের অকেজো করে দিতে পারে।

বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্বালানি রাজনীতির এই নতুন দিনে বাংলাদেশ কোথায়? এক দিনের আমলাতান্ত্রিক ঘোষণায় জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম বাড়ানোয় প্রমাণ হয়েছে- জ্বালানি ব্যবহার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ এখনও দুর্বল। জ্বালানি বিষয়ে জনদুর্ভোগ লাঘবে অপারগ। আরও প্রমাণ হয়েছে- জ্বালানি খাতে বাগাড়ম্ব বেশি; জনজীবনে স্বস্তি আনার সক্ষমতা কম।

বাংলাদেশে প্রায় এক দশক ধরে জ্বালানি খাত পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ দায়মুক্তি আইনের আওতায়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহের নীতি ও অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারেনি। তাই বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির নতুন বিন্যাস ও বিকাশ ঘটলেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা আমরা তৈরি করতে পারব কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই।

আর সেটা যদি না পারি, তাহলে আজ জ্বালানি নিয়ে জনগণ যে জ্বালায় জ্বলছে, তার উপশম হওয়ার আশু সম্ভাবনা চোখে পড়ছে না। দেশীয় সক্ষমতা তৈরি না হলে নিকট ভবিষ্যতে আর দশটা পণ্যের মতো প্রাথমিক জ্বালানির বদলে বিদ্যুৎ আমদানিই হবে আর্থিকভাবে লাভজনক। সম্ভবত সেটাই আমাদের নিয়তি। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা তখন অন্যের ওপরেই নির্ভর করবে।


শুভ কিবরিয়া: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com