সাক্ষাৎকার

‘মা-বাবাকে বেশি কথা শুনতে হতো’

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২২ । ১২:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাখাওয়াত হোসেন জয়

সমকালে এসে টাইমস মিডিয়া ভবনের সবুজ ছাদে ফ্রেমবন্দি সানজিদা (বাঁয়ে) ও কৃষ্ণা। ছবি: সাজ্জাদ নয়ন

মায়ের বকুনি কিংবা বাবার শাসন- কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারত না। ফুটবল নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকতেন কৃষ্ণা রানী সরকার। স্কুল ফাঁকি দিয়ে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতেন। ছোটবেলার দুরন্তপনা সেই মেয়েটিই এখন বাংলাদেশের ফুটবলের 'ড্রিম গার্ল'। কাঠমান্ডুতে নারী সাফের ফাইনালে তাঁর জোড়া গোলেই হিমালয়ের দেশে উড়েছে বিজয়ের কেতন। নেপালকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়েদের সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। ফাইনালের 'রানী' সেই কৃষ্ণা বৃহস্পতিবার সমকাল কার্যালয়ে এসে তাঁর ফুটবল জীবনের গল্প বলেছেন। শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়


সমকাল: ফাইনালে কোন মুহূর্তে মনে হয়েছিল আপনারা চ্যাম্পিয়ন হচ্ছেন?

কৃষ্ণা রানী: টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে ফাইনাল খেলার ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। স্যারেরাও সব সময় বলছিলেন, আমরা ফাইনাল খেলব। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছিলাম। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমরা একতাবদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমাদের মধ্যে ভালো করার একটা তাড়না ছিল। আমি যখন দুটি গোল করেছি, তখনও মনে হয়নি আমরা চ্যাম্পিয়ন হচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, খেলা ঘুরে যেতে পারে। কারণ, হাফ টাইমের আগে আমরা দুটি গোল করেছিলাম। তার পরে দ্বিতীয়ার্ধে তারা এক গোল দিয়েছিল। তখনও আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, আর গোল হজম করব না আমরা। আমি যখন নিজে দ্বিতীয় গোলটি করি, তখন থেকে মনে হচ্ছিল হয়তো চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছি। তবে যখন নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত চার মিনিটের দুই মিনিট শেষ হয়ে যায়, তখন আমি সাবিনা আপুকে (সাবিনা খাতুন) বলেছি- আপু, আমরা তো চ্যাম্পিয়ন। কারণ, তখন কিন্তু আমরা নেপালের সীমানায় বারবার অ্যাটাক করতেছিলাম।

সমকাল: চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা কেমন কাটছিল?

কৃষ্ণা রানী: আমি তেমন উদযাপন করতে পারিনি। ম্যাচ খেলার সময়ই পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম। তারপর ম্যাচ শেষে আরেকটু ব্যথা পাই। ফিজিও আপু আমাকে নিয়ে ড্রেসিংরুমে চলে যান। এই জয় আসলে অশ্রুঝরা জয় বললেই চলে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর অনেক কেঁদেছিলাম। হোটেলে ফেরার পরও বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনিকা ও আমি দু'জন দু'জনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তখন বলছিলাম, আমরা কি আদৌ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সেদিন রাতে কেউ ঘুমাতে পারি নাই। এতটাই আনন্দ পেয়েছি যে কেউ বিশ্বাসও করতে পারছিলাম না।

সমকাল: একবার আপনার মা বল কেটেছিল, সেই কথা কি মনে পড়ে?

কৃষ্ণা রানী: হ্যাঁ, এই কথাটি সব সময় মনে পড়ে। কখনোই ভুলব না, ভোলার জিনিসও নয়। ২০১২ সালে আমার ছোট ভাইকে বল কিনে দিয়েছিল বাবা। ওর বলটাই আমি সব সময় খেলতাম, তখন মা কেটেছিল। আমি কাটা বল মাথায় নিয়ে ঘুরেছি। এলাকার মানুষ বিভিন্ন কটু কথা বলত বলে মা-বাবা খেলতে নিষেধ করত। আর ঠিকমতো পড়াশোনা করতাম না। ফুটবলের প্রতি আমার এতটাই ভালোবাসা ছিল যে বল না থাকলে জাম্বুরা দিয়ে খেলতাম। আমি বেশিরভাগ সময় ছেলেদের সঙ্গে খেলতাম। অল্প সময়ে সাইকেল, মোটরসাইকেল চালাতাম। বলতে পারেন অনেক দুষ্ট ছিলাম।

সমকাল: ছাদ খোলা বাসে ট্রফি নিয়ে উচ্ছ্বাস। রাস্তার দু'পাশে হাজার হাজার মানুষ। ওই মুহূর্তটা কেমন কাটছিল?

কৃষ্ণা রানী: এত বড় সংবর্ধনা হবে, এটা কখনও ভাবিনি। ভাবছি যে, আমাদের সংবর্ধনা দেবে, ঘোরাবে এটুকুই। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে মহিলা ফুটবলকে ভালোবাসে, আমাদের এত ভালোবাসে তা কালকেই (বুধবার) দেখছি। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আগামী দিনের জন্য শুভকামনা জানাচ্ছে।

সমকাল: ট্রফি জয়ের পেছনে আসল রহস্য কী?

কৃষ্ণা রানী: কোচিং স্টাফদের অবদান তো আছেই। আর আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী চলাচল করেছি। ডিসিপ্লিনে ছিলাম। বলতে পারেন পরিকল্পনা, ডিসিপ্লিন এবং কঠোর পরিশ্রমের ফসল এই ট্রফিটা।

সমকাল: জীবনের সেরা উপহার কোনটি?

কৃষ্ণা রানী: যখন আমরা ২০১৫ সালে নেপালে অনূর্ধ্ব-১৪ খেলেছিলাম, তখন আমি অধিনায়ক ছিলাম। বাংলাদেশের মেয়েদের কোনো পর্যায় সেবারই প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইপর্বে দল চূড়ান্ত পর্বে উঠেছিল। সেখানে আমি সর্বোচ্চ গোল করেছিলাম এবং অধিনায়কও ছিলাম। এই দুটো ট্রফি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।

সমকাল: ফুটবল খেলতে এসে অনেক কটুবাক্য শুনতে হয়েছিল। এমন কোনো কথা আছে কিনা যা এখনও কষ্ট দেয়।

কৃষ্ণা রানী: কথা তো অনেকই আছে। একটা কথা বেশিরভাগ বলত যে ফুটবল খেললে বিয়ে হবে না, মেয়েমানুষ। সেগুলো ভুলে গেছি। কারণ, যারা আগে কটুকথা বলত, তারাই এখন এসে ভালোভাবে কথা বলতেছে। নেতিবাচক নয়, সব ইতিবাচক। এটাই এখন ভালো লাগে। আর আমরা সব সময় ঢাকায় থাকতাম। তাই কথাগুলো শুনত বেশি আমাদের বাবা-মা।

সমকাল: এখন কৃষ্ণা খেলোয়াড়। একসময় অবসর নেবে। তখন ফুটবলে কী হিসেবে থাকতে চান?

কৃষ্ণা রানী: যেহেতু 'সি' লাইসেন্স শেষ হয়েছে, সেহেতু অবসর নিলে কোচিং করানোর ইচ্ছা আছে। সামনে 'বি' এবং 'এ' লাইসেন্সও করব। আমি ফুটবলার, ফুটবলের সঙ্গেই থাকব।

সমকাল: এখন অনেকেই ভালো করছে। দেখা গেল ভবিষ্যতে অনেকে হারিয়ে গেছে...

কৃষ্ণা রানী: এখন সবাই পরিণত। সবকিছুই তারা বোঝে। আমাদের ফেডারেশন তো যথেষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা করছে। এখন যার পারফরম্যান্স ভালো থাকবে, সে-ই খেলবে এবং যার পারফরম্যান্স খারাপ থাকবে, সে তো টিমেও থাকবে না। হয়তো হারিয়ে যাবে।

সমকাল: মেয়েদের ফুটবল বলতে বাফুফেকেন্দ্রিক। এই সাফল্যের পর তৃণমূলে ফুটবলের প্রতি মেয়েদের আগ্রহ কি বাড়বে?

কৃষ্ণা রানী: অবশ্যই বাড়বে। অনেক জেলাতে এখন অনুশীলন হচ্ছে। আর অনেকে ফেডারেশন থেকে 'বি', 'সি' লাইসেন্স করে ফেলেছে। প্রায় প্রতিটি জেলাতেই একটা করা নারী একাডেমি করা হয়েছে। আমি মনে করি, এটা ভালো দিক। আমাদের ট্রফি জেতার পর অবশ্যই তৃণমূল পর্যায় থেকে প্লেয়ার আসবে। তারাও চাইবে, বড় আপুদের মতো আমরাও একদিন ট্রফি জিতব। কঠোর অনুশীলন করব। অনেক মেয়ের স্বপ্ন, এই ফেডারেশন ভবনে থাকব।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com