বাংলাদেশের মুখ

রোবটের কারিগর

যশোর

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২২ । ১২:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

তৌহিদুর রহমান

নিত্যনতুন উদ্ভাবন ও গবেষণাই তাঁর নেশা- ধ্যান-জ্ঞান রোবটিকস। তিনি তরুণ বিজ্ঞানী শেখ নাঈম হাসান মুন, যাঁর ঝুড়িতে ইতোমধ্যে যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ডসহ দেশসেরা তরুণ বিজ্ঞানীর খেতাব। যশোর উপশহরের বাসিন্দা রাজেক জাহাঙ্গীর ও হাসনা জাহাঙ্গীরের একমাত্র সন্তান। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিয়রশিপ (উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকায় অষ্টম শ্রেণি থেকেই নতুন কিছু করে দেখানোর পেছনে ছুটছেন নিরন্তর।

ইতোমধ্যে রাডার ফাঁকি দেওয়া ড্রোন, অ্যান্টি-টেররিজম নেটওয়ার্ক শিল্ড, করোনাভাইরাসের লক্ষণ শনাক্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আবিস্কার করা রোবট 'খোকা'সহ ৩১টি রোবট বানিয়েছেন যশোরের এ তরুণ। সর্বশেষ তিনি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলার ইতিহাস জানাতে রোবট 'মানিক মিয়া' আবিস্কার করে আবারও আলোচিত হয়েছেন। তাঁর এসব আবিস্কৃত প্রজেক্ট ও রোবট নাসাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমেলায় স্থান পেয়েছে; জুটেছে পুরস্কার। নিত্যনতুন উদ্ভাবন ও গবেষণার পাশাপাশি নাঈম মুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন 'মজার পাঠশালা' নামে একটি অনলাইন পাঠশালায়। নিজের উদ্ভাবনী জগৎ নিয়ে সমকালকে জানিয়েছেন আদ্যোপান্ত।

নাঈম হাসান মুন জানান, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় কানাডার একটি অনলাইন স্কুলে তিনি প্রোগ্রামিং কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর অষ্টম শ্রেণিতে উদ্ভাবন করেন রাডার ফাঁকি দেওয়া ড্রোন। তাঁর এ উদ্ভাবন জেলা, বিভাগ ও সারাদেশে 'ড্রোনবালক' পরিচয় এনে দেয়। এরপর দেশে জঙ্গি কার্যক্রম রুখতে অ্যান্টি-টেররিজম নেটওয়ার্ক শিল্ড প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেন এ তরুণ বিজ্ঞানী। তাঁর এ প্রযুক্তি শূন্য দশমিক এক আট সেকেন্ডে তথ্য আদান-প্রদানে যে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে সক্ষম। নাঈম মুন বলেন, 'এটি যে কোনো ধরনের অ্যান্টি-টেররিজম নেটওয়ার্ককে ড্রপ করাতে পারে।' তিনি আরও বলেন, 'নাসাতে একটি প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ পাই। কিন্তু বয়স, আর্থিক এবং পরিবারের কারণে আর যাওয়া হয়নি।' মেধাবী এই শিক্ষার্থী বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু করতে চান।

মানিক মিয়া রোবট

'আসসালামু আলাইকুম। সবাইরে শুভেচ্ছা। আমি মানিক, মানিক মিয়া; আসতাছি বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লইয়া মাইনষেরে জানাইতে। মা হাসুরে...আমি তোর মানিক চাচারে। তোর আব্বাজানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমি আমার বন্ধুর গপ্পো সবাইরে কইতে আসতেছিরে মা। তোর লগেও দ্যাহা করুমনে।' চেয়ারে বসে কথাগুলো বলছিলেন ঘন গোঁফওয়ালা, চশমা পরা বয়স্ক এক ব্যক্তি। কাঁচা-পাকা চুলওয়ালা ব্যক্তির পরনে সবুজ চেকের পাঞ্জাবি। তাঁর গলায় ঝোলানো মাফলার। শুরুতে দেখে মনে হতে পারে, ওই ব্যক্তি কোনো পাপেট শোর চরিত্র, আদতে তা নয়। এ মানিক মিয়া গল্পকথক এক রোবট, যার প্রধান নির্মাতা শেখ নাঈম হাসান মুন। তিনি জানান, "২০১৯ সালের আগস্টে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে 'বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড' দেওয়া হয়। সেই অ্যাওয়ার্ড জয়ীদের একজন ছিলাম আমি। 'গ্যারি' নামের একটি রোবটের জন্য অ্যাওয়ার্ডটি পাই।

এটি মূলত নেটওয়ার্কিং রোবট, যেটা সাইবার সিকিউরিটি দেয়। সেই সময়ে মুজিববর্ষকে সামনে রেখে কে, কোন ধরনের ইনোভেশন করবে, তার একটা আলোচনা চলছিল। তখন ভাবতে লাগলাম বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে নেটে জানতে গেলে তথ্য পাওয়া গেলেও অনেক সময় তা বিক্ষিপ্তভাবে থাকে। অর্থাৎ একসঙ্গে সম্পূর্ণ আকারে পাওয়া যায় না। আমরা সে কাজটা করতে চাই। ধরা যাক, বঙ্গবন্ধু অবসরে কী কী কাজ করতেন, কী খেতেন, এমন তথ্য হয়তো নেটে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেটা এতটা বিস্তারিত পাওয়া হয়তো যাবে না। আমরা মানিক মিয়াকে দিয়ে ডিটেইল বলাব। এ রোবট একইসঙ্গে বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাসের কথা বলবে। সেই থেকেই কাজটা শুরু করি। আমার টিমমেটদের কঠোর পরিশ্রমের কারণে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে বেটা ভার্সনটা রিলিজ করতে পেরেছি।" আক্ষেপের স্বরে তিনি বলেন, 'মানিক মিয়া রোবটটা তৈরি করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁকে দিতে পারিনি। এই রোবটটা প্রধানমন্ত্রীকে দিতে চাই।'

করোনাভাইরাসের লক্ষণ শনাক্তে রোবট 'খোকা'

করোনাভাইরাসের লক্ষণ শনাক্ত করবে রোবট 'খোকা'। ২০২০ সালে এটি তৈরিতে নেতৃত্ব দেন নাইম হাসান মুন। রোবটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের হাত স্যানিটাইজ করতে এবং মানুষকে স্যানিটাইজারের ব্যবহার শেখাতে পারে। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে। এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলতে পারে রোবটটি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- রোগীর কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন বিশ্নেষণের মাধ্যমে করোনা আছে কী নেই এবং সে অনুযায়ী ঠিক কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে সে ফলাফল প্রদান করবে এক মিনিটের মধ্যে। আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির মাধ্যমে 'খোকা' হাত ভাইরাসমুক্ত করবে। এ রোবট রোগীর সব তথ্য মোবাইল ফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর অনুযায়ী ক্লাউডে স্টোর ও প্রসেসিং করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে রোগীর রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা দেবে। তিন মাস ধরে তৈরি করা রোবটটিতে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

মজার পাঠশালা

২০০৯ সালে বলিউডের 'থ্রি ইডিয়টস' সিনেমায় প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসংগতি তুলে ধরে দেশ-বিদেশের দর্শকদের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। তরুণ বিজ্ঞানী নাঈম হাসান মুনের নেতৃত্বে এক দল তরুণ যেন ঠিক সেই সিনেমার কাহিনিকেই বাস্তবে রূপদানের প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁরা মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভিন্ন রূপ সংযোজন করতে গড়ে তুলেছেন 'মজার পাঠশালা'। পুরোনোকে ছিন্ন করে পৃথবীতে প্রতিনিয়ত ঘটছে নতুনত্বের খেলা, শুরু হচ্ছে বদলে যাবার পালা। অনলাইনে মজার মজার কনটেন্টের ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলো সাবলীল ভঙিমায় উপস্থাপনের মাধ্যমে গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি ভীতি দূরীকরণই এই পাঠশালা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্যাম্পাস অ্যামবাস্যাডর নির্বাচিত করা হয়, যাঁরা নিজ নিজ ক্যাম্পাসে মজার পাঠশালার প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। নাঈম বলেন, 'আমাদের সমাজে সামাজিকভাবে অনেকেই অনলাইনে বা অফলাইনে উত্ত্যক্ত হন। এটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে অনেকেই নিজ বাড়িতে বসে পুলিশিং সেবা পেয়েছেন। পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত অর্থায়নে ৮ হাজার শিক্ষার্থী সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়েছি।'



'দ্য মাল্টিটাস্কিং রোবট' ও 'স্মার্ট ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম রোবট' এবং হ্যাকার রোবট 'গ্যারি'

২০১৯ সালের দিকে সারাদেশে যখন একের পর এক জ?ি সন্ত্রাসী হামলায় স্তল্ফি?ত হয়ে পড়ে পুরো দেশ, তখনই দেশে জ?ি কার্যক্রম রুখতে 'দ্য মাল্টিটাস্কিং রোবট' এবং 'স্মার্ট ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম' বানিয়ে চমক সৃষ্টি করেন নাঈম। অ্যান্টি-টেররিজম নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এ তরুণ বিজ্ঞানী। তাঁর এ প্রযুক্তি শূন্য দশমিক এক আট সেকেন্ডে তথ্য আদান-প্রদানে যে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি যে কোনো ধরনের অ্যান্টি-টেররিজম নেটওয়ার্ককে ড্রপ করাতে পারে। উদ্ভাবন করেছেন হ্যাকার রোবট 'গ্যারি'। এ নতুন উদ্ভাবন অপরাধীকে সহজে চিহ্নিত করার পাশাপাশি মানুষকে সঠিক পথ চেনাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

এ ছাড়া ২০১৬ সালে নাঈম হাসান মুন আবি'্কার করেন 'সাইবার স্পাই মেশিন'। ওই বছরের ৯ জুন সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এই আবিস্কারটি নিয়ে প্রশংসা করেন এবং নাঈম হাসান মুনকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ ও পরামর্শ দেন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমেলা 'গুগল সায়েন্স ফেয়ার'-এ খুদে বিজ্ঞানী মুন এই সাইবার স্পাই মেশিনটি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রশংসা অর্জন করেন। ২০১৬ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিজ্ঞানমেলায় মুন নিজের আবি'্কৃত 'দ্য মাল্টিটাস্কিং রোবট' এবং 'বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আই সিমুলেটর' প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রায় তিনশ প্রজেক্টের মধ্যে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০১৭ সালেও যশোর টাউন হল ময়দানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই বিভাগের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় 'দ্য মাল্টিটাস্কিং রোবট' প্রদর্শনের মাধ্যমে 'শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবক' হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।

বেডরুমই মুনের গবেষণাগার

তরুণ বিজ্ঞানী শেখ নাঈম হাসান মুন বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু করতে চান। তবে বিজ্ঞানচর্চা বা গবেষণার জন্য মুনের নেই কোনো গবেষণাগার। বেডরুমেই কাটে স্কুল বাদে তাঁর বাকি সময়। এ রুমেই খাওয়া, ঘুমানো। চলে লেখাপড়া ও গবেষণার কাজ। গবেষণার মাধ্যমে তৈরি নতুন যন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয় ঘুমানোর স্থানটিকে। এ বেডের ওপর পুরো র‌্যাকসিন বিছিয়ে দিয়ে রোবট চালান মুন। তিনি জানিয়েছেন, 'বাচ্চাদের মধ্যে থেকে লেখাপড়ার ভয়টা দূর হলে লেখাপড়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানচর্চায় অনেকদূর যাওয়া যায়, আমি এটা প্রমাণ করতে চাই।' ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে রোবটিকস ইনস্টিউট নেই। আমি এটি তৈরি করতে চাই, যেখানে এদেশের নতুন প্রজন্ম সরাসরি সেখানে কাজ করতে পারবে। সবাইকে একটি ছাতার নিচে এনে বিশ্বের কাছে দেখিয়ে দিতে চাই আমরাও পারি উন্নতমানের আধুনিক রোবট বানাতে।'

লেখক
যশোর প্রতিনিধি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com