দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানেই মানবিক বিপর্যয়। দুর্যোগকালে নারী-শিশু-প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিই বেশি সংকটে পড়েন। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা আরও উন্নত করাসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও মানুষের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে 'উন্নয়নকে টেকসই' করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২২ উপলক্ষে শনিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সম্মেলন কক্ষে এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজন এ আহ্বান জানান। যৌথভাবে দৈনিক সমকাল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় 'দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তা, সবার জন্য কার্যব্যবস্থা' শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে



ডা. মো. এনামুর রহমান, এমপি


চলতি বছর আমি দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছি। একটি ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত 'গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন' শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং অন্যটি হলো অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত 'এশিয়া-প্যাসিফিক মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন' শীর্ষক সম্মেলন। দুটি সম্মেলনের আয়োজক ছিল 'ইউনাইটেড নেশনস ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন'। সেখানে আমি যে মূল বক্তব্য পেয়েছি তা হলো- সারাবিশ্ব এখন চাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিক মোকাবিলা করে আগাম কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্র গঠন করে টেকসই উন্নয়নগুলো বাস্তবায়ন করতে। আমরা উন্নয়ন করব, দুর্যোগে সেটা নষ্ট হয়ে যাবে, আমরা পিছিয়ে যাব, এগোব-পেছাব- এভাবে আমাদের টেকসই উন্নয়ন হবে না, আমরা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারব না। এ জন্য দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে নিজেদের দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্র গড়ার পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের এই পরিকল্পনা রয়েছে। এটিকেই বিশ্ব এখন 'দুর্যোগ সহনীয়তায় আগাম কার্যব্যবস্থা'- এ শিরোনামে গ্রহণ করেছে। এর ওপর এবার সম্মেলনগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে এবং গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি সেখানে বলেছিলাম, 'আগাম কার্যব্যবস্থা গ্রহণের কারণেই বাংলাদেশ আজ দুর্যোগ প্রশমনে রোল মডেল হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি পেয়েছে। আমরা সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই বার্তা দিয়ে দিই, মানুষকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাই। সেখানে দুর্গতদের জন্য অর্থ, শুকনো খাবার, রান্না করা খাবার, পানীয়, স্যানিটেশন, নিরাপত্তাসহ সবকিছুর ব্যবস্থা আমরা করি। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য আলাদা র‌্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে, আলাদা কক্ষ রাখা হয়েছে, এমনকি তাঁদের জন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই কাজগুলো আমরা করি বলে মৃত্যুঝুঁকিটা অনেকটা কমিয়ে আনতে পেরেছি।' আমার এই বক্তব্যে উপস্থিত সবাই একমত পোষণ করেছেন। ইউনাইটেড নেশনস ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনের প্রধান আমাদের সফলতার কথা স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে সিলেটের বন্যায় আমাদের কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন তিনি। দুর্যোগ প্রশমনে আগাম কার্যব্যবস্থাই আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আগাম কার্যব্যবস্থা নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন 'ডেলটা প্ল্যান'। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো মোকাবিলায় এই প্ল্যানে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ দেশকে দুর্যোগ সহনীয় করে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হলে এই ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আমাদের ফান্ড গঠন করতে হবে। এখানে ছয়টি 'হটস্পট' রয়েছে। প্রতিটি হটস্পট বাস্তবায়নের জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই ফান্ড ব্যবস্থা করার জন্য সরকার ইতোমধ্যে অর্থ দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও সাহায্য ও অনুদান চেয়েছে। এর আগে জলবায়ু রক্ষায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠনের কথা বলা হয়েছিল। গত কপ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেটিকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার করার জন্য লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। আমি মনে করি, যদি এই ফান্ড সংগ্রহ করা যায় এবং সেখান থেকে আমরা ৩০ থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পাই, তাহলে আমরা ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে পারব। অনেক অর্থের প্রয়োজন বলেই ডেলটা প্ল্যান দীর্ঘমেয়াদি। ইতোমধ্যে 'ডেলটা গভর্ন্যান্স কাউন্সিল' গঠন করা হয়েছে। সেই কাউন্সিলের প্রথম সভাও হয়েছে। সেই সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ফান্ড সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্র গঠন করে উন্নয়নগুলো টেকসই করে এ দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে পারব।



এ বি তাজুল ইসলাম, এমপি

আমাদের এমন একটা কার্যকর ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে করে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি কম হয়। এই ব্যবস্থা প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করতে হবে। যাঁরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণা ও বিশ্নেষণ করেন, তাঁরা সতর্কবার্তা দেবেন, তাঁদের কাজ শেষ। বাকি কাজ দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে করতে হবে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মন্ত্রণালয়কে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা সব সময় একই থাকবে না। সব ধরনের দুর্যোগের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি- একটি হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। কিন্তু মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে আমরা বেশি কাজ করতে পারছি না। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো নিয়ে কাজ করতে পারলেও এর বাইরে যেসব দুর্যোগ আমাদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা হলো সামাজিক দুর্যোগ। প্রতিদিন সংবাদপত্রগুলো খুললেই খুন, ধর্ষণ, যুদ্ধসহ নানা ধরনের সামাজিক দুর্যোগের ঘটনা দেখতে পাই। এসব দুর্যোগ আমাদের সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করে যেটুকু অগ্রগতি করি, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই সামাজিক দুর্যোগের কারণে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজবিজ্ঞানী এবং অ্যাক্টিভিস্টদের এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমনে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত সাড়াদানে এই মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে। সিলেটের বন্যায় শুরুর কয়েক ঘণ্টায় একটু সমস্যা হয়েছিল। কেননা যাঁরা আগাম সতর্কবার্তা দেবেন, তাঁরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে সেটি পুষিয়ে ওঠা গেছে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়টি এখন আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো স্তরের মানুষকে বাদ দেওয়া যাবে না। সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এই দেশ আমাদের সবার। এখানে সরকারের লোক থেকে শুরু করে যাঁরা সরকারের বাইরে আছেন, সবাইকে কাজ করতে হবে।



মো. কামরুল হাসান এনডিসি


এ দেশে দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তার পথিকৃৎ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর এ দেশে সংঘটিত সাইক্লোনে ১০ লক্ষাধিক মানুষ মারা গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার আগাম সতর্কতা দূরের কথা, কোনো খোঁজও নেয়নি। বঙ্গবন্ধু তখন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে আক্রান্ত মানুষের সেবা করতে চলে গিয়েছিলেন। এ সময় তিনি এসব দুর্যোগপীড়িত মানুষের সাহায্যে একটা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা এ দেশের জন্যই শুধু নয়, বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সারাবিশ্বের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বা আগাম সতর্কবার্তা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মুজিব কেল্লা, রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ২০১৫ সালে জাপানের সেন্দাই শহরে গৃহীত 'সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক'-এর ৫ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, 'এই ফ্রেমওয়ার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলো দুর্যোগ প্রশমনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ করবে।' এদিক থেকে বাংলাদেশ যথেষ্ট এগিয়ে গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের আইন রয়েছে, যার মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ের সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া আমরা মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার কাজ করেছি। অন্যদিকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫ প্রণীত হয়েছে। এসবের মাধ্যমে সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্কের শর্ত পূরণ করতে পেরেছি। বলা চলে, আমরা এগিয়ে রয়েছি। আগাম সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে আবহাওয়া অধিদপ্তরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যাদের জন্য সতর্কবার্তা, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি করা হচ্ছে। আমাদের দেশ ভৌগোলিকভাবে এমন একটি স্থানে অবস্থান করছে যে, এই ভূখণ্ডে প্রতিনিয়ত দুর্যোগ থাকবেই। এ দেশের ষড়ঋতুর প্রতিটি ঋতুতেই কোনো না কোনো দুর্যোগ থাকবে। বর্ষাকালে বন্যা হয়, সেপ্টেম্বর বা মার্চের দিকে উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হয়, উত্তরাঞ্চলে খরা হয়, শীতকালে শৈত্যপ্রবাহ- এসব দুর্যোগ এ দেশকে মোকাবিলা করতে হয়। এ কারণে আমাদের দুর্যোগ সহনীয় দেশে পরিণত হতে হবে। আমরা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। দুর্যোগ প্রশমনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম নিতে হচ্ছে। আমাদের কাছে অতীতে যেসব দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এটি শেষ কথা নয়। কারণ, আমাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। দুর্যোগ প্রশমন দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য 'দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তা, সবার জন্য কার্যব্যবস্থা'। সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে রয়েছে প্যারিস চুক্তি এবং আমাদের দেশে 'ঢাকা ডিক্লারেশন' রয়েছে, যেখানে দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত রয়েছে। এটিও আমাদের দেশে করা হচ্ছে। প্রথম দিকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তৈরি করার সময় প্রতিবন্ধী মানুষের কথা মাথায় রাখা না হলেও বর্তমানে অবকাঠামো তৈরির সময় তাঁদের কথা মাথায় রেখেই করা হয়। আমাদের যেসব 'রেসকিউ বোট' রয়েছে, সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে নিজে নিজেই উঠতে পারেন, সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্যোগ প্রশমনের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে সরকারের পক্ষ থেকে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কেননা বজ্রপাতে প্রতিবছর অনেক মানুষ মারা যান। আমাদের হিসাবে প্রতিবছর বজ্রপাতে তিনশর বেশি মানুষ এ কারণে মারা যান। এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের মূল্য অপরিসীম। এই মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্য আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ সংশ্নিষ্ট সংস্থা সমন্বিতভাবে অন্তত ৪০ মিনিট আগে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরনের দুর্যোগে মানুষের মৃত্যুহার কমিয়ে আনার কাজ চলছে।



মো. আতিকুল হক


প্রতিবছর আমরা দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালন করে থাকি। এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্যে দুটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো হলো- 'আগাম সতর্কবার্তা' এবং 'কার্যব্যবস্থা'। সতর্ক পাওয়ার জন্য আমাদের যেমন কাজ করতে হবে, তেমনি কার্যব্যবস্থা নির্ধারণে কাজ করতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর যেমন বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে তথ্য পায়, তেমনি অনেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে ১০ থেকে ১২টি বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগের আগাম সতর্কতা নিয়ে কাজ করছে। আমাদের অধিদপ্তরেরই এ নিয়ে তিনটি প্রকল্প রয়েছে। সেগুলো হলো- 'প্রভাতী', 'এনআরপি' এবং জাইকা প্রজেক্টের 'এলডিআরআরপি'। সর্বশেষ অনুমোদিত প্রকল্প হচ্ছে এলডিআরআরপি। আমরা আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে কাজ করলেও আমাদের এই তিনটি প্রকল্পের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। যেমন- একই জায়গায় একই বিষয়ে এনআরপি ও প্রভাতী কাজ করছে। এ কারণে এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রস্তাব এসেছে। এরপর যখন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে স্থান নির্ধারণ করা হবে, তখন আমরা এমনভাবে সেই স্থানগুলো ভাগ করে দেব, যাতে এ ধরনের সমস্যা আর না হয়। এর মাধ্যমে সীমিত সম্পদের মধ্যেও বিস্তৃতভাবে কাজ করা সম্ভব হবে। আগাম সতর্কবার্তা আমরা অনেকেই এখন পাচ্ছি। ডিজিটালাইজেশনের কারণে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা আমরা সবার কাছে পৌঁছাতেও পারছি। কিন্তু সর্বশেষ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যায়, বিশেষ করে সুনামগঞ্জে কয়েক ঘণ্টা কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেখানকার মোবাইল নেটওয়ার্কে সমস্যা হয়েছিল। মোবাইল টাওয়ারগুলো যেন এ ধরনের দুর্যোগে অকেজো হয়ে না পড়ে, এ জন্য আমরা তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কাজ করেছি। এ ছাড়া এ দেশে বজ্রপাত এখন অনেক বড় একটা দুর্যোগ। গত ছয় মাসে এ দেশে বজ্রপাতে ২৮২ জন মারা গেছেন এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে মাত্র একজন মারা যান। বাকি মৃত্যুগুলো হয়েছে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে হয়তো আগাম সতর্কবার্তা পেতে পারব; কিন্তু সেটি প্রচার করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আমরা যে প্রকল্পই নিই না কেন, সেটির সঠিক প্রচার-প্রচারণা করতে হবে, যাতে কৃষক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী বজ্রপাতে প্রাণ না হারান। যে ২৮২ জন মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে ২৭৮ জনই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, যাঁরা জমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা গেছেন। এসব কৃষককে নিরাপত্তা না দিতে পারলে আমাদের কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাবে। এ বিষয়ে আমাদের অধিদপ্তর কাজ করবে এবং দুর্যোগ প্রশমনে গৃহীত সব প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করব।



অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিন দশক ধরে পরিবর্তনগুলো দেখছি। ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যার পরে নিজে গবেষণা শুরু করেছি। দেখেছি, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ও। আগে ঘূর্ণিঝড়ে যে বিষয়টি তিন অঙ্ক বা পাঁচ অঙ্কের হতো, এখন তা কমে দুই বা এক সংখ্যায় নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ 'দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তা'। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক, পরিবেশগত ও মনুষ্য সৃষ্ট আপদগুলোর ক্ষেত্রে মানুষের, বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের ঝুঁকি, মানবিক ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বড় মাপের দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম ও কার্যকর জরুরি সাড়া প্রদান পদ্ধতি প্রস্তুত রাখা। তবে শুধু নারী-পুরুষই নয়, এ সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু ও যাঁরা প্রবীণ ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার যাঁরা থাকেন, তাঁরা বেশি সংকটে পড়েন। এ জন্য তাঁদের মতামত গ্রহণ করাও জরুরি। তাঁদের ঝুঁকি সম্পর্কে জেনে কীভাবে তা মোকাবিলা করা যাবে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্যোগের আগাম বার্তা জানার জন্য টোল ফ্রি নম্বর '১০৯০' যোগাযোগের একটি অন্যতম মাধ্যম। তবে সবার তো মোবাইল ফোন নেই। তাই আমরা কীভাবে আগাম সতর্কবার্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারি, তা ভাবতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা সৃষ্টিতে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আমরাও ২০১২ সাল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালন করে থাকি। সব জায়গাতেই বলে থাকি, কীভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের মতো করে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় রোল মডেলও বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার 'চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ' লাভ করেছেন। এ অবস্থান ধরে রাখতে হবে। দুর্যোগের প্রাক্কালে প্রসূতি মায়েদের নিয়ে আসা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় কাজগুলো করা হচ্ছে। তবে ঝুঁকি এড়াতে দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটি বছরে দু'বার সভা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণসহ পদক্ষেপ গ্রহণ করা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।



আরিফ আব্দুল্লাহ খান


১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর সারাবিশ্বে 'আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস' পালিত হয়ে আসছে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে সাধারণ মানুষ ও সংশ্নিষ্টদের সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই এ উদ্যোগ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও 'আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২২' পালিত হচ্ছে। 'আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২২'-এর এবারের প্রতিপাদ্য 'ÔEarly warning and early action for all', যার ভাবানুবাদ করা হয়েছে 'দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তা, সবার জন্য কার্যব্যবস্থা'। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। তবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা হলে তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করা যায়। এ দেশ নদীবিধৌত। সারাবছর কোনো না কোনো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতি ঠেকাতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৭২ ঘণ্টার বিভিন্ন বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। ১৮ নদীর তথ্য দেওয়া হয়। এসব নদীতে পানি বাড়ছে কিংবা কমার ডাটাও দেওয়া হয়। তার পরও দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও তথ্য দিতে হবে। আগাম সতর্কতা বার্তা পেলে ওই অঞ্চলের মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমে আসবে। ইউএনডিপি জামালপুর ও কুড়িগ্রামে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছে। আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বার্তা পাওয়ার পর কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে- এ বিষয়ে কাজ করছি আমরা। অর্থাৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি 'কমিউনিকেশন ডেভেলপ' করার চেষ্টা করছি।



নিতাই চন্দ্র দে সরকার


প্রতিবছর কোনো না কোনো দুর্যোগে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ব্যাপকতা প্রমাণ করে, দুর্যোগের পূর্ব সতর্কীকরণ ও ঝুঁকিহ্রাসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান কৌশল হওয়া উচিত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় জনগণের জন্য দুর্যোগ-পূর্ব পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে আগাম সতর্কবার্তা উপকূলীয় সম্ভাব্য উপদ্রুত এলাকার জনগণের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান 'ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)' প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে উপকূলে আমাদের ৭৬ হাজার ১৪০ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। বন্যাপ্রবণ এলাকায় অনুরূপ স্বেচ্ছাসেবক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে।

আপদ পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদান :বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী চিন্তায় ১৯৭২ সালে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র চালু হয়। বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সারাদেশে বর্তমানে সাড়ে তিনশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে বন্যার আগাম তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আকস্মিক বন্যা মোকাবিলা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে রিমোট সেনসিং, জিআইএস, রাডার, স্যাটেলাইট তথ্যচিত্র বিশ্নেষণের মাধ্যমে বন্যা আসার ৩ থেকে ৫ দিন আগেই বন্যার পূর্বাভাস ও বন্যার স্থায়িত্ব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিডব্লিউর এফএফডব্লিউসি থেকে ফ্লাড অ্যাপ এবং ফ্লাড অ্যালার্টের মাধ্যমে বন্যা পূর্বাভাসের সর্বশেষ তথ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন উন্নত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ও সতর্কতাবার্তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের 'ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র' থেকে বর্তমানে গাণিতিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল 'ডব্লিউআরএফ' ব্যবহার করে ৭ থেকে ১০ দিনের পূর্বাভাস অনেক নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে এবং দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের ৮টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসানো হয়েছে। তা ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রপাতপ্রবণ ১৫টি জেলার ১৩৫ উপজেলায় ৩৩৫টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া টর্নেডোর পূর্বাভাস বিষয়ে বর্তমান সরকার কার্যক্রম শুরু করেছে।

দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার :আগাম সতর্কবার্তা প্রচারে দুর্যোগ প্রাক্কালে রেডিও, টেলিভিশন ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক দ্রুত ও অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে টোল ফ্রি ১০৯০ নম্বরে ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (আইভিআর) চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩২টি কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়ে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আগাম সতর্কবার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তিন দিনে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস প্রচলন করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে বন্যার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রচারের জন্য কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা সকল পর্যায়ে প্রচার করার মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি কমাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে স্থানীয়করণ :দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সার্বিক সাফল্য অর্জনে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী কাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে বিভাগ থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সক্ষমতা বাড়ানো বিবেচনায় রেখে এ সংশ্নিষ্ট কমিটিগুলোর জন্য প্রযোজ্য বুকলেট প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ :দুর্যোগে বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ :দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৯৪ হাজার ৩৩৮টি বাসগৃহ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে আরও ৪৪ হাজার ৯০৯টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণের কাজ চলমান।

ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ :ঘূর্ণিঝড়/জলোচ্ছ্বাসে ঝুঁকিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে ৩২৭টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ :বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙন এলাকায় ২৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৪২৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান। চতুর্থ পর্যায়ে আরও ১০০০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুজিবকিল্লা নির্মাণ :উপকূলীয় ও বন্যা উপদ্রুত এলাকার ১৪৮টি উপজেলায় ৩৭৮টি বহুমুখী মুজিবকিল্লা নির্মাণ এবং বিদ্যমান ১৭২টি মুজিবকিল্লার সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান।

সেতু/কালভার্ট নির্মাণ :গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দীর্ঘ সেতু/কালভার্ট নির্মাণে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৪৪টি সেতু/কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

গ্রামীণ রাস্তা টেকসইকরণে এইচবিবিকরণ :গ্রামীণ রাস্তা টেকসই করার লক্ষ্যে ৪,২৬৮-০০ কিলোমিটার রাস্তা এইচবিবি করা হয়েছে এবং ১০২০.৪২ কিলোমিটার প্রক্রিয়াধীন।

জেলা ত্রাণগুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ :জেলা ত্রাণগুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের অংশ হিসেবে ৬৪ জেলায় ৬৬টি জেলা ত্রাণগুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য প্রায় ২০০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান। পাশাপাশি ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের দুর্যোগ-পরবর্তী অনুসন্ধান, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যে ওয়ান স্টপ সেন্টার হিসেবে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনইওসি) প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগকবলিত মানুষকে উদ্ধার করার জন্য ৬০টি বিশেষ মাল্টিপারপোজ রেসকিউ বোট তৈরি ও হস্তান্তর কার্যক্রম চলমান।



সেভাস্টিন রোজারিও

১৯৯০ দশক থেকে সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য স্থির করেছে। প্রথমত, রিঅ্যাক্টিভ উদ্যোগ বা ত্রাণনির্ভর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসে প্রো-অ্যাক্টিভ বা দুর্যোগে ঝুঁকি হ্রাসমূলক কর্মসূচি গ্রহণ এবং দ্বিতীয়ত, দরিদ্র ও বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর ঝুঁকির মাত্রা কমানোর লক্ষ্যে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য খানা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এত কিছুর পরও ২০ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে যে, প্রাণহানি কমলেও সম্পদ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও উল্লেখযোগ্য হারে কমছে না। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের একটি হিসাবে বাংলাদেশের বন্যা/ আকস্মিক বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, উপকূল/ নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড প্রভৃতি দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর গড়ে ঘরবাড়ি, রাস্তা, বেড়িবাঁধ, শস্য, ভূমি, প্রাণিসম্পদ, মাছ, হাঁস-মুরগি প্রভৃতি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৭০ কোটি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- বিগত কয়েক শতকের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান ও ইতিহাস বিশ্নেষণ করে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুসারে বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প এখন সময়ের ব্যাপার। এর অন্যতম কারণ হলো ভারতীয়, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত সিলেট, যার উত্তরে 'ডাউকি ফল্ট' রয়েছে। এই প্লেটগুলো সক্রিয় থাকায় এবং পরস্পরের দিকে ধাবমান হওয়ায় এখানে প্রচুর শক্তি জমা হচ্ছে, যে কোনো সময় ভূমিকম্পে রূপ নিতে পারে। কারিতাস বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে স্বাধীনতার ঠিক পূর্ববর্তী বছর ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা, সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে এখনও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।



আবু সাঈদ খান

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তবে এত দুর্যোগ মোকাবিলা করেও আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী উদ্যোগের কারণেই দেশ এগিয়েছে। এর মধ্যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অন্যতম। প্রযুক্তির কল্যাণে আগেভাগেই উপকূলবাসী বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ জেনে যাচ্ছেন ঘূর্ণিঝড়ের খবর। উপকূল নিয়ে ভাবনার অনেক জায়গা রয়েছে। সরকারের আন্তরিকতায় দুর্যোগে এখন প্রাণহানি কমে আসার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক কমেছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাপক রিঅ্যাক্টিভ ও প্রো-অ্যাক্টিভ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে দুর্যোগে, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ে ১৯৭০, এমনকি ৯০-এর দশকের প্রাণহানির সংখ্যা ছয় ডিজিট থেকে এক ডিজিটে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আমরাও উন্নয়নের সহযোগী পত্রিকা। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। ইতোপূর্বে কাজ করেছি, এখনও কাজ করতে চাই।






প্রধান অতিথি



ডা. মো. এনামুর রহমান, এমপি

প্রতিমন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়



বিশেষ অতিথি


এ বি তাজুল ইসলাম, এমপি

সভাপতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি



আলোচক



মো. কামরুল হাসান এনডিসি

সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়



মো. আতিকুল হক

মহাপরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর



অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন

উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)

ও সাবেক পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



আরিফ আব্দুল্লাহ খান

প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ



সেভাস্টিন রোজারিও

নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ



নিতাই চন্দ্র দে সরকার

পরিচালক (এমআইএম), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর



সভাপতি ও মডারেটর



আবু সাঈদ খান

উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক সমকাল



উপস্থিত ছিলেন


সুব্রত পাল চৌধুরী

যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক

ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর



অনুলিখন



সাজিদা ইসলাম পারুল

স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল



মাজহারুল ইসলাম রবিন

স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল



ইভেন্ট সমন্বয়



হাসান জাকির, সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com