সমকাল-ব্লাস্ট গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষার তাগিদ

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২২ । ১৪:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

সমকাল কার্যালয়ে শনিবার আয়োজিত 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ :বাংলাদেশে বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা-সমকাল

জাতিসংঘ সনদের আলোকে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন করা হলেও তা বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, ২০১৫ সালে আইনের আলোকে করা বিধি অনুযায়ী বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা বরাদ্দের কথা থাকলেও হচ্ছে না, এমনকি মনিটরিংয়ের নেই কোনো ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজের কথা অন্যকে ঠিকঠাক বোঝাতে পারেন না বলে তাঁদের সঙ্গে অন্যায় হলেও সঠিক বিচার পান না। এসব কারণে তাঁদের আইনগত সুরক্ষা জরুরির বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ :বাংলাদেশে বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব অভিমত দেন বক্তারা।

উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও সমকালের যৌথ আয়োজনে এ গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান। এতে বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের (প্রতিষ্ঠান) পরিচালক উপসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (অভিযোগ ও তদন্ত) উপপরিচালক ফারজানা নাজনীন তুলতুল, ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি অ্যাডভাইজার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলাম, ডব্লিউডিডিএফের চেয়ারম্যান শিরীন আক্তার, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদের সভাপতি নাছিমা আক্তার, জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থার সভাপতি সুশান্ত কুমার দাশ, প্রোগ্রাম ম্যানেজার বশির আল হোসাইন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পরিচালিত নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয়কেন্দ্র রোকেয়া সদনের সেক্রেটারি নাসরিন মনসুর, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ ল ইয়ার সেলিনা আক্তার প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যালায়েন্স প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (ইউএনসিআরপিডি) 'কনক্লুডিং অবজারভেশন' দিয়েছে। এতে সুনির্দিষ্টভাবে ৭০টি সুপারিশ করা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এটি করা গেলে উন্নয়নে শামিল হতে পারবেন তাঁরা। একই সঙ্গে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডাটাবেজে ১২ ক্যাটাগরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২৯ লাখ ২০ হাজার ২০৬। প্রতিবন্ধিতা নিয়ে আইনি কাঠামো হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন প্রয়োজন।' ফারজানা নাজনীন তুলতুল বলেন, 'জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ সমর্থনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আমরা ভেবেছিলাম, এই সমর্থনের ফলে এখন থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমস্যার কথা সবাই বুঝবে। কারণ, এই সনদের আলোকেই প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ও বিধি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত পরিকল্পনার পরও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। ধীরে ধীরে উন্নয়ন হচ্ছে।'

তাজুল ইসলাম বলেন, 'ব্লাস্ট-ডব্লিউডিডিএফসহ অন্যান্য সংগঠন প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন কাজ করছে। প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক সনদ বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে।' শিরীন আক্তার বলেন, 'আইন বাস্তবায়ন যে একেবারেই হয়নি, তা নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন সিআরপিডির আলোকে হয়েছে। এ আইনে একটু ফাঁক রয়েছে। প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়টি এখানে উপেক্ষিত।'

নাছিমা আক্তার বলেন, 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইনের আলোকে যে বিধি হয়েছে, তাতে বাজেটে বরাদ্দের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। আমরা চাই, প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরাও এতে অংশগ্রহণ করুক।' সুশান্ত কুমার দাশ বলেন, 'দেশের অনেক প্রতিবন্ধী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। আয় না করতে পারায় তাঁরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ জন্য তাঁদের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন করতে হলে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে।'

নাসরিন মনসুর বলেন, 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা আইন কার্যকরে আমরা সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ করেছি। এর মধ্যে একটি হলো- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সঠিকভাবে আদমশুমারি করা। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা আদমশুমারি করতে যান, তাঁরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয় উপেক্ষা করেন। আবার অনেক পরিবার তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানকে লুকানোর চেষ্টা করে। এ জন্য সবখানে ইশারা ভাষা চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।' সেলিনা আক্তার বলেন, 'সংবিধান নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমঅধিকার দিয়েছে। প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইনেও তাঁদের কল্যাণে জাতীয় পর্যায়ে কমিটি করার কথা আছে। তবে কমিটিগুলো সক্রিয় কিনা বা আদৌ কোনো কমিটি হয়েছে কিনা, তা তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই।'

আবু সাঈদ খান বলেন, 'আমরা এমন দেশে বসবাস করি, যে দেশে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। অনেক আন্তর্জাতিক সনদ আছে, যেগুলোতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করলেও মানা হয় না। বাস্তবায়ন করা হয় না। ইউএনসিআরপিডি এমনই একটি সনদ। বাংলাদেশ এটি অনুস্বাক্ষর করলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অথচ মানুষ হিসেবে তাঁদের অধিকার বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সংবিধানেও দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাই ইউএনসিআরপিডি বাস্তবায়ন খুব জরুরি।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com