প্রচ্ছদ

একদা তোমাতে, হে বিষমধু

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আকিমুন রহমান

এক. তেতো কিছু নাই-তাই কথা!

' চলো মন, ১৯৭৩ সালে যাই!'

" কী কারণে! ২০২২ সনেরে থুইয়া, এমুন চকর-চকর ঝামঝাম দিন-দুনিয়া ফালাইয়া, আন্ধার ঝাপসা ১৯৭৩ সালে যাওন লাগবো কোন দুক্ষে? হাতে কাজকাম একেবারেই নাই নাকি?" মন সে আমারই বটে, কিন্তু সে আমাকে কবে আর পরোয়া করে! শুধু ঝামটা দেয়। শুধুই ঝামটা দেয়। বরাবর। এবং প্রতিবারের মতো এবারও।

'আমার বিষম ঠেকার এক কর্ম আছে,মন! চলো যাই!' আমি তাকে ঠেলতে শুরু করি!

"না না! আমি যাইতে চাই না! কিছুতেই আমি তো অইনে যামু না! খবরদার না!" 

'বাবারে মন! আমার বড্ড ঠেকা! চলো চলো!'

"আমি তো আর এই জিন্দিগীতে অইনে যামু না! কিছুতেই অই আতকার উপরে বিষ-জারাজারা হইয়া ওঠার দেশে যামু না! সেই ১৯৭৩-এর টাইমে তো যামু না-ই! আল্লায় রহম করুক!"

'মধুও তো ছিলো গো মন, অইদেশে সেই সময়ে!' আমি স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টাটা নিই! 'সেইখানে একটা ক্লাশ নাইনও তো ছিলো! দোস্তবন্ধু ছিলো না অনেকগুলো?'

"বাবারে বাপ! আরো যামু অইনে? মাতা খারাপ! চউখটা ফিরাইতে না-ফিরাইতে যেইনে কিনা জনমকার চিন-পরিচয়ের মাইনষে হইয়া যায় চক্ষু-উল্টাইন্না ফুটানীঅলা; সেইনে যেয় খুশি যাউক, এই আমি-এই মনে-তো যাইবো না! আর, ২০২২ সালে কী কেলাশ নাইন নাই? হেইটার লগে থাকো!"

যাক! যে বুঝবে না বলে পণ করে থাকে, তাকে বুঝিয়ে ফেলি, অমন সাধ্য আমার নেই! বুঝিয়ে ফেলার কোনো ইচ্ছা-তন্ত্রমন্ত্রও আমার জানা নেই। (আহারে! জানা থাকতো যদি! বা; আপনাদের কারো সেটা জানা থাকলে, আমাকে একটু শিখিয়ে দিতেন যদি! প্লিজ!) তো, মন না-যেতে চাইলে কী! আমি কী একাকী ভ্রমণে যেতে ডর-পাই! পাই না তো! (জন্ম-একাকীজন কবে আবার একাকিত্বকে ডরায়! কোনোদিন না!) আমি তবে একাই চললাম সেই ১৯৭৩ সালের দিনে। যেতে যেতে যতো কথা, এই মাথার ভেতরে, কালো কালো ভোমরার মতন গুনগুনাতে থাকবে, সেইসব গুনগুনানির কোনোটাকে তো আমি মাথায় রাখবো না। একেবারেই না। সোজা-সিধা তাদের বাতাসে ওড়ায়ে দেবো! যা ভেসে যাওয়ার, তা যাক যাক!



দুই. এই যে প্রথমে খানিকটা অহেতুক গুনগুন!

অই তো অই অল্পখানিক দূরেই আছে ১৯৭৩ সাল! তারও আগে আছে অন্য আরেকরকম দিনকাল!

সেই কোন আগেকার কাল থেকে, নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রায় পাঁচ-ছয় মাইল দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, নাগবাড়ি নামক সর্পসাধন আখড়ার পূর্বপ্রান্তে, আছে দেওভোগ নামে একটি গ্রাম। এটি প্রসিদ্ধ বাবুরাইল গ্রামের উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত।

 ১৯৭৩ সাল আসার বহু বহু আগে থেকে, ওই তাবৎ এলাকার সংসারী-গৃহস্থ লোকসকলে, বিদ্যাশিক্ষাকে বিশেষ দরকারি কোনো ব্যাপার বলে গণ্য করার কোনো গরজ পায়নি। দরকারের কালে, তারা নিজেরা যেমন, টিপসই দিয়ে কর্ম সম্পন্ন করে নিতো; তেমনি তাদের ঘরে জন্মানো পুত্র-কন্যাদের জন্যও ওই একই পন্থায় চলাচলতি করার বন্দোবস্ত বহাল রাখতে তারা কোনো প্রকার কুণ্ঠা করে নাই। 

তবে দিন তো কেবল সহজ রকমে পার করা যায় না! মাঝেমধ্যে বিপদও এসে খাড়া হয়ে যায়। যেমন, কোনো কোনো সময়ে, অতি ঠেকার কোনো পত্র এসে কারো না কারো বাড়িতে হানা দিয়েই দিয়েছে! তখন কী উপায়! তখন পত্র-পাওয়া ভিটির সর্বজনে একসাথে ছোটে বাবুরাইল গ্রামের দিকে। সেইখানে টাউনের স্কুলের এক মাস্টারের বসত আছে। তারে নানামতে খোসামদ করে, তবে,উঁচা গলায় পত্র-পড়ানোর কর্ম করানো যায়। কিন্তু সব সময় যে তেমনটা করানোই সম্ভব হয়, তা তো নয়! সবটাই নির্ভর করতে থাকে মাস্টারের মর্জির ওপর।

যেদিন মাস্টারের মেজাজ নরম থাকে; সেদিন সে উঁচা গলায় লাইন ধরে ধরে, পত্রখানা পড়ে দেয়। যেদিন তার মেজাজ কুটকুটা, সেদিন তো সে কিছুতেই গলা খোলে না। করে কী, নিজে নিজে মনে মনে পত্রটারে পড়ে সে। তারবাদে পত্রের মূল কথা কয়টা শোনায়ে দেয়। ব্যস! যাও এখন, লোকসকল! তোমাগো এইটা পছন্দ না হইলে আমার কী! দিছি তো মূল কথা কয়খান কইয়া! তাতে তোমার শান্তি না হইলে মাস্টরের কী!

এমন অবস্থা বহু বহুদিন ধরে অইখানে চলতে থাকে বটে, কিন্তু নয়া জমানার নয়া বাপমায়েরা অচিরেই বোঝে যে, এমনটা কোনোক্রমেই আর চলতে দেওয়া যায় না! শরমের ব্যাপার তো! ফলে, তাদের যে পোলাপানরা দুনিয়ায় আসে, তারা দল বেঁধে বেঁধে ইশকুলে যাওয়ার দিন পেতে বাধ্য হয়! অন্তত আর কিছু না হোক, প্রাইমারি পাশ তো সবকয়টারে দেওন লাগবো। 

অমনসব দিনও একসময় শেষ হয়। ১৯৭৩ সালের বাবা-মায়েরা এখন পোলাপানের লেখাপড়া বিষয়ে, বিশেষ করে পুত্রসন্তানের বিদ্যাশিক্ষা বিষয়ে অতি টনটনা অতি উৎকণ্ঠ! কন্যাগুলাও যদি বিদ্যা শিক্ষা করে যেতে থাকে, তো করুক। কিন্তু কোনো জোর নাই! ভালো সম্বন্ধ না-আসা পর্যন্ত পড়ূক না? 

তেমন দিনে দেখা যায়, দেওভোগ গ্রামের পাঁচ পাঁচটা পোলাপান কতো যে মন দিয়ে বিদ্যাশিক্ষা করছে! অমন করে জানপ্রাণ ঢেলে দিয়ে পড়াপড়ি করতে আর তো দেখা যায় নাই! আগের বা পিছের কোনোজনকেই তো দেখা যায় নাই! এই পাঁচজন সকলের চেয়ে ভিন্ন। তাদের দোস্তীও তো অন্য কারো মতো না! 

এই পাঁচজনের ওঠানড়া একসাথে। সকালে স্কুলে যাওয়া একসাথে, ছুটির পরে ফেরা তো একসাথেই। এ ওকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। আবার যার বাড়ি সবার থেকে দূরে, কোনোজনই তাকে একা বাড়ির পথে যেতে দেয় না! একেকজনে ঘরে গিয়ে বইখাতা রেখে রেখে, দূরের জনকে এগিয়ে দিতে ছোটে। পড়া করতেও কোনো কোনোজন হঠাৎই যদি এসে যায় কারো বাড়িতে, অন্য তিনজনকে ছাড়া, তাদের পড়াটা পোতানো আর পানসে হয়ে থাকে। ফলে, সব কয়জনকে একসাথে হতে হয়। গলায় হাত রাখারাখি করে করে রাস্তা পার হতে হয়। মীনা, রোকন, হেনা, বকুল আর হারুন। এই পাঁচজন।

ক্রমে হাইস্কুলে যায় তারা, কিন্তু স্কুল তো তখন একটাই থাকে না। হারুন, রোকন বয়েজ স্কুলে যায়,বাকি তিনজনের গার্লস স্কুল। কিন্তু সকালে বেরোয় তারা পাঁচজন একই সাথে, ফেরার সময় গার্লস স্কুলের গেটের সামনে একটু দাঁড়ালেই হেনা বকুল মীনাকে পেয়ে যায় হারুন, রোকন। সকাল যায়, বিকালও যায়। যায় যায়। এইমতে যেতে যেতে ১৯৭৩ সাল আসে।



তিন. নবম শ্রেণির দিন !

১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসটা ওই পাঁচজনের জন্য বড়ো বিষম চাঞ্চল্য ও উৎকণ্ঠা ভরপুরা এক মাস হয়ে আসে। মাত্রই তারা ক্লাশ এইট পেরিয়েছে। এখন স্কুল সাব্যস্ত করে দেবে কোন স্টুডেন্ট কোন পথে যাবে। কে পাবে সায়েন্স, কে যাবে আর্টসের রাস্তায়! এইসব নিয়ে ওই পাঁচজনে বাড়ির ফেরার সময়ে রোজ রোজ বাতচিৎ চালাতে থাকে, অনেক চালাতে থাকে। তবে বকুল, মীনা, হারুন, রোকন যতোখানি জোর গলায় কথা বলতে থাকে, হেনা ততোখানি পারে না। অন্যরা জানে না, কিন্তু সে নিজে তো জানে! সায়েন্স, আর্টসের কথা উঠলেই তার কলজে কেমন যে ঢিপঢিপ করতে থাকে! 

অঙ্কে সে মোটেও সুবিধা করতে পারে না। কিছুতেই পারে না। স্কুল তাকে কোন কারণে সায়েন্স দেবে? দেবে না। মীনা, বকুলকে দেবে। ওরা দুইজন যেনো অঙ্ক পারার জন্যই দুনিয়াতে এসেছে! আর রোকন, হারুনের কথা তো বলার কিছু নেই। খুব খুব অঙ্ক পারে তারা। জ্যামিতি বীজগণিত পারে অনেক বেশি ভালোরকমে! ওরা সায়েন্সে যাবে, সেটাই সত্য। হেনা? হেনার কী হবে! চিরকালের দোস্তরা যদি এমনে এমনে অন্য পড়ায় চলে যায়! হেনা তাইলে একা কেমনে থাকবে! পড়া নিয়ে একা কেমনে থাকবে, ওদের ছাড়া! ওদের চারজনের সাথে তাইলে হেনার থাকা হবে না! ইয়া আল্লাহ।

আবার পরক্ষণেই তার মনে আসে, না না! স্যার আপারা কিছুতেই অমন করবে না। হেনা তো ইংলিশে কী দারুণ নম্বর পায়! বাংলায় তো বটেই। বা, ভূগোল ও ইতিহাস- সেইখানেও যে অনেক অনেক ভালো করে সে। এইসব কী আর আপা স্যারেরা হিসাব করবে না? নিশ্চয়ই তারা ওকে সায়েন্স দিয়ে দেবে! হেনা তখন তাইলে খুব অন্তর দিয়ে অঙ্কটা পড়ে নেবে। সত্যি পড়ে নেবে। সায়েন্স যেনো ওরে দেয়। নাইলে কেমনে সেয় একলা আর্টসে পড়বে! কেমনে! দোস্তগো ছাড়া কেমনে থাকবে সেয়!

ফেব্রুয়ারির এক তারিখে জানা যায়, স্কুল কোনোমতেই হেনাকে সায়েন্স দিতে পারে নাই। অঙ্ক যে মোটের ওপর পারেই না এই স্টুডেন্ট! মীনা ও বকুল সায়েন্স পায় বলে ওদের যেতে হয় সেকশন 'এ'তে। সেকশন 'বি' মানবিক শাখার জন্য। হেনা সেকশন 'বি'তে বসে বসে ঝোঁরে ঝোঁরে। ফেরার পথে আর তার দোস্তদের সাথে দেখাটা হয় না। হারুন, রোকনের ল্যাব ক্লাশ শেষ হতে হতে অনেক বেলা হয়ে যায় রোজ। বকুল, মীনারও তাই। সেই কারণে ওদের টাইমটা মেলে। চার দোস্ত রোজ একসাথে যেতে পারে। সকালে আসার সময়ে হেনা কয়দিন খুব চেয়েছিলো একসাথে কদম বাড়াতে। কিন্তু কিন্তু, কী জানি কী হয়ে গেছে! ওকে সাথে পেয়ে বাকি চারজনের যেনো ভালো লাগে নাই! কেউ কিচ্ছু বলে দেয় নাই, কিন্তু হেনার যেনো স্পষ্ট বোঝে, ওদের সাথে ওরা ওকে আর চায় না।

হারুন শুধু একবার ওর দিকে চোখ রেখে বলেছিলো, 'তুই সাইন্স পাইলিই না? আমাগো লগে তাইলে তুই নাইই? কি করলি?' সত্যিই তো! হেনা কী করলো! আর্টসে যাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু করতে পারলো না! তারপর সমস্তটা পথ ওরা চুপ, হেনা তো চুপই। ওরা চুপ, যেনো হেনার সামনে ওরা আর নিজেদের অন্যসব কথাকে ভাগ করে নিতে চায় না। হেনা না থাকলেই যেনো সেটা স্বস্তিকর হতো ওদের জন্য। এখন যেনো ভারী অস্বস্তিকর, ভারী অহেতুক এক বোঝা এই হেনা।

হেঁটে চলতে চলতে হেনা কুণ্ঠায় মিইয়ে যেতে থাকে। মিইয়ে যেতে যেতে যেতে, শেষে বুঝতে পারে, ওরা ওদের পথ ভিন্ন করে নিয়েছে। সেই পথে হেনার কোনো অধিকার নেই। সেই পথে হেনা যেতে পারে না। হেনা আর ওদের সাথে যাবার বাঞ্ছা বোধ করে না। আর্টস যে অল্পমেধাবী স্টুডেন্টদের জন্য সেই সত্য ওরা কতোভাবেই তো স্পষ্ট করে তুলছে। তাহলে হেনা কী করে ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়!

এই তবে ক্লাশ নাইন? এমন সর্বনাশা! এমন!

 নিজের জন্য কতো যে লজ্জা পেতে থাকে হেনা! লজ্জা পেতে পেতে কুঁকড়ে যেতে যেতে সে, দিনে দিনে একা হয়ে যেতে থাকে। পুস্কুনির পানির ওপরে স্তব্ধমুখে উপুড় হয়ে থাকা আন্ধার রাইতের মতন একা!

মীনা হয়তো হেনাকে অতোটা অমেধাবী মনে করে না, কিন্তু সেই কথা মুখে বলার অবকাশ হয় না তার। হঠাৎ এপ্রিল মাস নাগাদ দেখা যায়, মীনার গলায় একনরী নেকলেস। কানে তার বাহারী ঝুমকা, দুই হাতে মোটা ভোমা চূড়। 

কী? কী বৃত্তান্ত! 

মীনার বাড়িতে কিনা তার সৎ মা। পরের মেয়ের ভালাবুরার দায় আর কতো টানবো এই সৎ মায়ে! সিয়ান মাইয়ারে কতো পাহারা দিবো সেয়! কী থেইক্কা কী অঘটন না জানি বান্ধাইয়া থুইবো নে এই ঘরের দুশমনে! কাজেই মানে মানে এই মাইয়া পার করোনই হইলো অখন, রক্ষা পাওনের একমাত্র রাস্তা। দুই দিনের লড়াচড়িতে মীনার বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায় রেজাউল করিমের সাথে।

মীনা! কতো বৈশাখ মাসের দুপুরের দিনে প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে মীনা গল্প শোনাতো না ওদের? শোনাতো না, সব পড়া জবরদস্ত রকমে শেষ করবেই করবে সে। তার মায়ে মইরা গেছে পোলাপাইন হওনের সময়ে, তারে কেউই হাসপাতালে নেয় নাই। তার জন্য কেউই কোনো ডাক্তার ডাকে নাই। পোলাপাইন হইতে আবার ডাকতর ডাকোন লাগে নি! ডাকে নাই। মীনায় সেইজন্য ডাকতর হইবোই হইবো। কেউই তারে ডাকতর হওনের তেনে আটকাইতে পারবো না! মীনা!

মীনা! 

'কেলাস নাইন তরি তো পড়ছোই! আর পড়ালেহায় কোন কাম! অহন আলা মোন দিয়া ঘরবসত করো।' মুরুব্বিদের এই মত। রেজাউলেরও অন্যমত নাই।

হেনা একা একলা ঝোঁরে ঝোঁরে। মীনার শোকে ঝোঁরে। হারুন, রোকন, বকুলের জন্য ঝোঁরে। ওর জন্য ওরা কি ঝোঁরে? হেনা জানে না। সে শুধু স্কুলে যায়। একা একা হেঁটে অথবা রিক্সায়, যায়।

এই তবে ক্লাশ নাইন? এমন? এমন!



 চার. এতো যে ব্যথা, তারমধ্যেও সুখ আসে নাকি! কেমনে!

একা একা পথ চলে কিনা হেনা, তাই দুনিয়ার কতোকিছুর দিকে যে তার এখন নজর দেওয়ার ফুরসত হয়! আগে, ছোট্টবেলার দিনে, পাঁচ দোস্তে শুধু কথা হতো। পাঁচে পাঁচে কতো কথা! শুধু হাসি হুল্লোড়। এখন শুধু নৈঃশব্দ। শুধু বোবা মুখ। তারপরেও, চলতে চলতে হেনার কিন্তু কিছু-না কিছু কথা বলা হয়ে ওঠে। যেট্টুক হয়, সেট্টুক শুধুই তার নিজের সঙ্গে নিজের কথা। মনে মনে। যতো কিছু দেখে, দেখে দেখে অথই হয়ে যেতে থাকে সে। অই যে কলার গাছে থোড় এসেছে! খয়েরা ভারীভরন্ত তেলচিকচিকা থোড়! কতো যে মিঠা লাগে দেখতে! চোখ যে ফিরানো যায় না সেইখান থেকে! 

ক্লাশ নাইনে আসার আগে এমন সোন্দর তো কোনোদিন লাগে নাই, কলার থোড়েরে! এমুন লাগে ক্যান অখন! এখন ক্যান শাওন মাসের ঝিঙাফুলেরে এমন ডুক্কুর-ডাক্কুর হইলদা দেখায়! এতো হলুদ তো অগো, আগে কোনোদিন লাগে নাই! অখন ক্যান এমুন তুক্ষার হলুদ দেখায় মাচার ঝিঙাফুল! এখন ক্যান নীহাররঞ্জন পইড়া কইলজা এমুন টনটন করে! কেনো এমন মন-উদাসী লাগে! 

সেই যে একজন আছে! তারে, পথে, একনজর না দেখতে পেলে, এমন বেতালা কষ্টজরজরা লাগতে থাকে কেনো নিজেকে! শুধু তো এক ঝটকার দেখা! হেনা দেখে। দেখে, আর যেনো শরমে কুঁকড়ে যেতে থাকে। তাও দেখে। সমস্তটা অন্তর দিয়ে দেখে। এক ঝলক দেখে। দেখে, আর যেনো মরিচা জবার মতন রাঙা হয়ে যেতে থাকে তার ভেতরটা। আর বাহিরটা। 

অন্যজনও দেখে। যতোবার সে হেনাকে দেখে, যেনো দেখে হতবিহ্বল হয়ে। যেনো দেখে দেখে আশ মেটে না তার। যেনো সে দেখছে হলুদ ফড়িং, দেখছে পুস্কুনির পানিতে হেলেঞ্চার ঝাড়। পলক ফেলতে কেনো ভুলে যায় সেই ছেলেটার চোখ! কেনো শুধু চেয়ে থাকে। আর শব্দহীন ডাকে! ডাকে! শব্দহীন ডাক- হেনার দিকে আসতে থাকে, হেনাকে উড়ায়ে নিয়ে যেতে থাকে। কোন দূরে কোন যে দূরে!

সেই ডাক কে কে শোনে? শুধু হেনা শোনে! দুনিয়ার আর কেউ না! আর কেউই না!

" কি রে হেনা?" আচমকাই একদিন রোকন, হারুন আর বকুলের দেখা পায় হেনা, স্কুলের গেটে। যেনো ওর জন্যই একজোট হয়েছিল ওরা! "তর লগে বোলে নাসির ভাইয়ের কড়ড়া লাইন চলতাছে? এটি কী করতাছস? পড়লেহায়ও ডাব্বা দিলি, আর্টস পড়তাছস! আবার লাইনের মিদেও গেছস গা? এটি কী? আমরা তো এমুন না! তুই এইটা কেমুন?"

'নাসির ভাই! নাসির ভাই কেটায়?' ডর আর শরমের কী একটা ঝাপটা-ঝাটকা যে পায় হেনা, আচমকা! কার কথা বলে ওরা! কে?

" ও! অখন তুমি বোজতেই পারতাছো না! সিকিং সিকিং ড্রিংকিং ওয়াটার বেশিদিন চলে না কইলাম! ইছ!" ওরা সমস্বরে হেনাকে ধাক্কাতে থাকে। ধাক্কা কী একরকম! ফুপাতো মামাতো ভাইবোনের ধাবড়া ধাক্কা। মায়ের বিজলি ঝিলকানি ধাক্কা। বাবার দেওয়া ধাক্কা! ঠাঁটাপড়ার সমান সেই ধাক্কা! পিতামহী ধাক্কা দেয় না, নিদান দেয়। "মীনারে অর বাপমায়ে বিয়া দিয়া দেয় নাইক্কা? দিছে তো! সোন্দর দেহি সেই ছেড়িরে সোনার জয়-জেওর পিন্ধা আমে-দুধে খাইতাছে। আমাগো এইটারেও দিয়া দেও পার কইরা। নাক কাটোনের আগেই বিদায় দেও!" 

তারপরেও হেনা যেনো কোন দৈব অনুগ্রহে পার হয়ে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়ে যায়। "কেউ তো কোনোদিন হেই ছেড়ার লগে হেনারে কথাটা ইস্তক কইতে দেহে নাই। তাইলে এইনে মাইয়ার দোষ কী?" কে কে জানি হেনার জন্য এমন নিস্তারেরও খোঁজ পেয়ে যায়! 

এই তবে ক্লাশ নাইন? এমন থাবড়া-থেতলানো? এমন? এমন উষ্টাখাওয়ায় ভরা? এমন বিষনুন- ধকধকা? আহ! এই্‌ই?

শুধু এই্‌ই? এমনই? 

নাহ! কে বলে ক্লাশ নাইন শুধু এমন জ্বালাদংশনময়?

অই যে সেই ছেলেটা ঠিকঠিক পথের নিরালায় রোজ সকালে হেনার জন্য দাঁড়ায়ে থাকে। চৈত্র মাসে যেনো সে করমচার ফুলভরা গাছের মতন ঝলমলা! বাইরা মাসের বাদলা দিনে সেয় য্যান কদমবিরিক্ষি! হলুদ ফুলে ফুলে অই গাছখান উথালা-মাতালা! শুধু একনজর তারে দেখতে পায় বলে, অই তো হেনার কেমন সুখ-ছলকানো লাগে নিজেরে! কতো যে কেমন!

এও তো এই ক্লাশ নাইনই! এই মিঠামধু এই চুপমুখে কোটি কোটি কথা বলা!

থাকো তুমি ক্লাশ নাইন, হে তুমি চির প্রথম প্রণয়,বিষ ও কণ্টকছোবল! আমাতে বিরাজ করো, আমাতে বাঁচো।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com