শিক্ষাব্যবস্থা

পাঠ্যপুস্তকে কিউআর কোড এবং স্ক্রিন আসক্তি

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২২ । ১১:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাতিহুল কাদির সম্রাট



বিষয়টি বোঝার জন্য ঘটনা বলা প্রয়োজন। জেলার সবচেয়ে বড় কলেজ। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে প্রায় দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। করোনার প্রভাব কাটিয়ে তারা ক্লাসে এসেছে। অল্পসংখ্যক বাদে শিক্ষাথী প্রায় সবাই এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া। শুরু থেকেই এ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শিক্ষকদের গলদঘর্ম অবস্থা। পড়ালেখায় তাদের মনোসংযোগে ঘাটতি শিক্ষকদের কাছে ধরা পড়ে দ্রুতই। তাদের আচরণে সামাজিকীকরণ ও সমাজমনস্কতার অভাব লক্ষ্যযোগ্য। বিশেষ করে ছেলেদের চেহারায় অপুষ্টি, অনিদ্রা, অন্যমনস্কতা ও ক্লান্তির ছাপ। ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও তাদের অনেকের মন যেন পড়ে থাকে ক্লাসের বাইরে; অন্য কোনো ভুবনে। কৌতূহলশূন্য চেহারায় ভাবলেশহীনতা ও চিন্তার ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্ততা অনেকের বেলায় স্পষ্ট। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত নয়। প্রতিক্রিয়া জানালেও আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রকট।


এ ঘটনার আলোকে শিক্ষকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ আমলে নিয়ে কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় নির্ধারণে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকা হলো। সভায় ছাত্রছাত্রীদের আচরণ ও একাডেমিক অর্জন হতাশাজনক অবস্থার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় স্ক্রিনে আসক্তিকে। কম্পিউটার, ট্যাব ও স্মার্টফোন প্রভৃতির মাধ্যমে নেট-দুনিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের এ আসক্তি মাদকের নেশার চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনের পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়। কড়া নজরদারি সত্ত্বেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর কাছে পাওয়া যায় স্মার্টফোন। কিছু মোবাইল ফোন আবার উচ্চমূল্যের। অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছে থাকা মোবাইল ফোন তার অভিভাবকের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।


এলো প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে উত্তরপত্রে স্বাক্ষর করতে গিয়ে ইনভিজিলেটররা লক্ষ্য করলেন, অনেক শিক্ষার্থী নিজের নাম লিখতে গিয়ে কাটাকাটি করেছে। রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর কেউ ভুল লিখেছে। কেউ লিখতে গিয়ে করেছে কাটাকাটি। অনেক শিক্ষার্থী সাল লিখেছে ভুল। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ব্যবহূত ফরম্যাটে তারিখ লিখেছে খাতার পাতায়। পরীক্ষার খাতার ওপর পৃষ্ঠার তথ্যাংশটুকু শিক্ষার্থীদের মানসিক বিভ্রম ও বিক্ষিপ্ততার প্রমাণ। তাদের এই মনোবিভ্রমের মূল কারণ স্ক্রিনে আসক্তি।


অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল শিক্ষকরা যেমন ধারণা করেছিলেন, হলোও তেমনটাই। রীতিমতো বিপর্যয়কর। দুই-তৃতীয়াংশ অকৃতকার্য। উদ্বিগ্ন কলেজ প্রশাসন বিহিত সন্ধানে অভিভাবকদের ডাকলেন মতবিনিময়ের জন্য। শিক্ষার্থীদের হতাশাজনক ফলের কথা জানানো হলো তাঁদের। অভিভাবকদের অধিকাংশই জানালেন, তাঁদের কাছে নিজেদের সন্তানকে অচেনা মনে হয় অনেক সময়। বাচ্চাদের আচার-আচরণ এবং জীবনযাপন পদ্ধতি কীভাবে যে পাল্টে গেছে, তাঁরা বুঝতেও পারেননি। সন্তানদের মুখের ভাষা পর্যন্ত পাল্টে গেছে।


একটি কলেজের এই বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি সামগ্রিক অবস্থারই নমুনামাত্র। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী তথা বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের ওপর তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সারাবিশ্বেই উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। হচ্ছে প্রচুর গবেষণা। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল নির্দেশ করে, তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক স্ক্রিনে আসক্তির ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। অনেকে অরুচি ও ক্ষুধামন্দার শিকার। বেড়েছে স্থূলতা; কমছে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। দৃষ্টি ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের জটিলতায় ভুগছে অনেক ছেলেমেয়ে। তাদের সৃজনশীলতা ও স্বাভাবিক চিন্তনদক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। বিএমজে গ্লোবাল মেডিকেল হেলথ জার্নাল সম্প্রতি জানিয়েছে, বিশ্বের ১০০ কোটি ছেলেমেয়ে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ মোবাইলের হেডফোন ব্যবহার। 'আঁচল' নামে একটি দেশীয় বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, করোনাপরবর্তী সময়ে স্ক্রিনে আসক্তির কারণে বাংলাদেশে ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। আরেক বেসরকারি সংস্থা ইনসিডিন বাংলাদেশের করা এক জরিপের ফলে দেখা যায়, শতকরা ৭৫ দশমিক ১ জন শিশু, যাদের মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন আছে, তারা পর্নোগ্রাফি দেখে।


উল্লিখিত বাস্তবতায় বেশ কিছুদিন ধরে ছাত্রছাত্রীদের স্ক্রিনে আসক্তি থেকে মুক্ত করার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে মোটিভেশনাল কাজ করে যাচ্ছি। স্কুল পর্যায়ে নতুন যে কারিকুলাম পাইলটিং করা হচ্ছে, তার আওতাধীন ২০২৩ সালের জন্য মুদ্রিত ষষ্ঠ শ্রেণির কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক দেখার সুযোগ হয়েছে সম্প্রতি। বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখার সময় লক্ষ্য করি, বইয়ের কিছু পাতায় কিউআর বা কুইক রেসপন্স কোড মুদ্রিত। কোডগুলো স্ক্যান করে কোডের আড়ালে থাকা বিষয়বস্তু শোনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বইয়ে। যেমন- ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা' নাটকের সঙ্গে কিউআর কোড মুদ্রিত। সেটি মোবাইল ফোনে স্ক্যান করলে 'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে' গানটি বাজে।


শিশুদের বইয়ে কিউআর কোড যুক্ত করা সমীচীন মনে করি না। এতে উপকারের চেয়ে অপকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, শিক্ষককেন্দ্রিক সনাতনী টিচিং মেথড পরিহার করে তুলনামূলক কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক মেথডে আসার অংশ হিসেবে এই কিউআর কোড ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়োগিক অনুশীলনের সুযোগ লাভ করবে এবং এক্সপেরিয়েন্সিয়াল লার্নিং মেথড বা অ্যাপ্রোচের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাবে। এসব মেথড বা অ্যাপ্রোচ উন্নত বিশ্বে অনুসৃত হচ্ছে। তাঁদের এ বক্তব্যে যুক্তি আছে বটে। কিন্তু এটিও মনে রাখা দরকার, একটি দেশের কারিকুলাম তার আর্থসামাজিক বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনা করা উচিত। সারাবিশ্বে যেখানে শিশুদের স্মার্টফোন ও নেট-দুনিয়া তথা স্ক্রিনে আসক্তির কুফল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কীভাবে তাদের এই আসক্তি থেকে মুক্ত রাখা যায় সেটা নিয়ে ভাবা হচ্ছে যেখানে; সেখানে আমাদের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা শিশুদের স্মার্টফোনমুখী করে তুলছেন না তো! প্রযুক্তির সুফলের সঙ্গে সঙ্গে কুফলের দিকটাকেও বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। কিউআর কোড স্ক্যান করে শোনার বদলে ছাত্রছাত্রীরা গানটি যদি দলীয়ভাবে গেয়ে ড্রিল বা অনুশীলন করত তাহলে এক্সপেরিয়েন্সিয়াল ও পার্টিসিপেটরি দুটি অ্যাপ্রোচেরই প্রয়োগ নিশ্চিত হতো। এই কিউআর কোড সংযোজনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিশুরা এখন স্মার্টফোনকে পাঠ্যবইয়ের অংশ মনে করবে এবং অভিভাবকদের বাধ্য করবে তাদের হাতে স্মার্টফোন দিতে, যা খারাপ ফল বয়ে আনবে। সিদ্ধান্তটি ভেবে দেখা দরকার।


ফাতিহুল কাদির সম্রাট: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com