বাংলা সংস্কৃতি বিশ্বায়ন এবং একজন বিশ্বজিত সাহা

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৯   

আদনান সৈয়দ

বিশ্বজিত সাহা

বিশ্বজিত সাহা

দীর্ঘ ২৮ বছর যাবত নিউইয়র্কের মত একটি অবাঙালি অধ্যুষিত শহরে বাংলা বইমেলা করে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ সেই কঠিন কাজটিই তিনি করে যাচ্ছেন নিরলসভাবেই। না, কোথাও কোন ছন্দপতন নেই, কখনই কোন বছর বইমেলা থমকে দাঁড়ায়নি অথবা থেমে যায়নি। নিউইয়র্কে এই মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত নিউইয়র্ক বইমেলা প্রতিবছর নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে ঠিক ঠিক পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ অথবা কলকাতার কোন প্রতিথযশা সাহিত্যিক/সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব এই মেলাটি উদ্বোধন করেন। এই নিয়মের কোন ব্যত্যয় কখনোই ঘটেনি। সত্যি, সে এক অসাধারণ ঘটনা! মনে রাখতে হবে এই বইমেলা যেনো তেনো রকমের কোন মেলা নয়। বর্তমান সময়ে কোলকাতা এবং বাংলাদেশের পরই এটি সর্ববৃহৎ বাংলা বইমেলা।  বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য চর্চা যখন বড় একটা চেলেঞ্জ সেখানে নিউইয়র্কের মত এই বাংলা বিবর্জিত শহরে নিয়ম করে ফি বছর একটি বাংলা বইমেলা চালিয়ে নেওয়া সহজ কোন কথা নয়! বলার প্রয়োজন নেই যে এর পেছনে যে ব্যক্তিটি নিশ্চুপ কাজ করে যাচ্ছেন তার নাম বিশ্বজিত সাহা।

বিশ্বজিত সাহা সম্প্রতি আরেকটি ঐতিহাসিক কাজের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক রাজ্যে সিনেটে ২৫ সেপ্টেম্বরকে ’বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে। সন্দেহাতীত ভাবে খবরটি আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিতো বটেই গোটা বাঙালি জাতির জন্যেই এক গৌরবজনক খবর। উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালে ২৫শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই দিনটিকে স্মরণ রেখেই যুক্তরাষ্ট্র নিউইয়র্ক সিনেট এই বিশেষ সম্মানজনক স্মারকটি পাশ করে। এটি বাঙালির বিশাল অর্জন। আর এই অর্জনের পেছনেও আছেন আমাদের বিশ্বজিত সাহা। ২৫শে সেপ্টেম্বর দিনটিকে স্মরণ করে রাখার জন্য বিশ্বজিত সাহা নিউইয়র্কে তিন দিনব্যাপি একটি বাণিজ্য মেলার আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিশ্বজিত সাহা নিউইয়র্কে এসেছিলেন নব্বই দশকের শুরুর দিকে। বই পাগল মানুষ তিনি। তাই বইকেই জীবিকা করে তিনি নিউইয়র্কে গড়ে তোলেন বইয়ের দোকান নিউইয়র্ক মুক্তধারা। বই বিক্রি আর স্থানীয় একটি পত্রিকার সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলতে থাকে তার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিশ্বায়নের নীরব বিপ্লব। একদিন মুখোমুখি হই এই প্রচারবিমুখ মানুষ বিশ্বজিত সাহার সঙ্গে। তার কাছে জানতে চাই বইমেলার ইতিহাসের কথা। জানতে চাই বাংলাদেশ ইমিগ্র্যান্ট ডে পালনের প্রস্তাব পাশ হওয়ার পেছনের কথা। জানতে চাই তার ভবিষ্যত স্বপ্নের কথাও। তার সঙ্গে আমার কথপোকথনটি আপনাদের জন্যে নিচে তুলে ধরছি।

আদনান সৈয়দ: ২৮ বছর আগে আপনি নিউইয়র্কে বাংলা বইমেলার প্রবর্তন করেছিলেন। সে অনেক দিন আগের কথা। শুরুতে আপনার স্বপ্নটা কেমন ছিল?

বিশ্বজিত সাহা: ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আমি নিউইয়র্কে আসি ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য। এসেই কাজ শুরু করি নিউইয়র্কের বাংলা সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’তে। পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে নিউইয়র্কের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির খবরা-খবর জানা হয়ে যায়। পরিচয় হয় অনেক সংগঠন এবং প্রবাসীদের অনেক অনুষ্ঠানের সঙ্গে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে আবিস্কার করি নিউইয়র্কের বাঙালিরা শহীদ দিবস পালন করেন না, বাংলা বইমেলার মত একটি প্রাণের মেলাও এখানে হচ্ছে না।  তথ্যটি জানার সঙ্গে সঙ্গেই-এই কাজটি দ্রুত শুরু করা দরকার বলে আমি অনুভব করি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিই ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করবো। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় নিউইয়র্কের বাঙালির চেতনা মঞ্চের উজ্জীবিত কিছু তরুণ হারুন আলী, ছাখাওয়্ৎা আলী, আব্দুর রহিম বাদশা, সজল পাল, সৈয়দ শামীম হোসেন ও দিলদার হোসেন দিলু একদিন আমার উডসাইডের বাসায় একত্রিত হই। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ১৯৯২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনার তৈরী করে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হবে। পাশাপাশি শুরু হবে বইমেলার গোড়াপত্তন। তখন মুক্তধারা ফাউন্ডেশন এর  জন্ম হয়নি। মুক্তধারা নিউইয়র্ক ও বাঙালির চেতনা মঞ্চের যৌথ উদ্যোগেই এর কার্যক্রম শুরু হয়। জাতিসংঘের সামনে শহীদ দিবস পালন করার অনুমতি না পাওয়ায় প্রথম বছর আমরা এস্টোরিয়া পার্কে শহীদ দিবস পালন করি। আর বইমেলা শুরু হয় একদিন ব্রুকলীনে। দুদিন কুইন্সে। প্রথম বছরের বইমেলা উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যক ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। এখনো স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে ১৯৯২ সালের রাত ১২টা১ মিনিট জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে কার্ডবোর্ড দিয়ে আমরা শহীদ মিনার তৈরি করার কথা। কবি নির্মলেন্দু গুণ এসেছিলেন সেই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে।  সেই প্রথম কবি শহীদ কাদরীও এসেছিলেন স্টন থেকে নিউইয়র্কে। সেই তরুণ বয়সেই কতগুলো বিষয় নির্ধারণ করি। এক. শহীদ মিনারে প্রথম ফুল দেবে উপস্থিত সর্বকনিষ্ঠ শিশু। তবে কোনভাবে উদ্যোক্তাদের সন্তান এর জন্য বিবেচিত নয়। তেমনি বইমেলার ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল প্রতি বছর একজন লেখক নিউইয়র্ক বইমেলা উদ্বোধন করবে। দীর্ঘ ২৮ বছর বরণ্য লেখক-সাহিত্যিকগণ এই বইমেলা উদ্বোধন করে সেই পরম্পরা অব্যাহত রেখেছেন। এই কাজটি অব্যাহত রাখা এত সহজ ছিল না। কেননা প্রায় প্রতি বছরই কোন না সরকারী উচ্চপদস্থ মন্ত্রী, সচিব এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে প্রতি বছর একজন লেখককে দিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করানো নিউইয়র্ক বইমেলার আলোকজ্বল ঘটনা।

আদনান সৈয়দ: বইমেলা প্রতিবছর ঠিক সময় মত নিয়ম বেধে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই পথচলা অবিরাম গতিতেই চলছে। কোন রকম বাধা নেই, কোন রকম দ্বিধা নেই, দ্বন্দও নেই। অথচ একটি সংগঠনের জন্যে তাদের কার্যক্রম এতকাল ব্যাপি নিয়ম বেধে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন কাজ। তাও যদি আবার সেই কার্যক্রম হয় বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি কেন্দ্রিক! চোখের সামনেই দেখেছি কত বড় বড় সংগঠন তাদের অনেক ভালো কাজের প্রত্যয় নিয়েও ঝড়ে পরেছে। অথচ মুক্তধারা বইমেলার সে ক্ষেত্রে কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। এর পেছনের কারণটা কী বিশ্বজিত সাহা? এই অসম্ভব কাজটাকে কীভাবে সম্ভব করলেন? বলবেন?

বিশ্বজিত সাহা: এর প্রধান কারন বইয়ের প্রতি বইমেলার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কিছু মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা। আসলে ভাবলে অবাকই লাগে ২৫/২৬ বছর বয়সে আমরা শুরু করি। আজ আমাদের সন্তানের বয়স ২১/২২। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা। তারপরেও নিউইয়র্ক বইমেলা তার আপন গতিতে চলছে। কারন এই বইমেলাটি কখনো ব্যক্তি বিশ্বজিত সাহা ও মুক্তধারা নিউইয়র্ক তাদের করতে চায়নি। শুরু থেকে লক্ষ্য করলেই দেখবেন যখন বাংলাদেশ থেকে কোন প্রকাশক যখন নিউইয়র্কের বইমেলায় যোগ দেয়া দূরের কথা চিন্তাও করতো না। তখন নিউইয়র্ক শহরে যারা বই বিক্রি করতেন ব্যাটস এর জলিল সাহেবসহ অন্যান্যদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়। তারপর নিরন্তর চেষ্টার পর ১৯৯৪ সাল থেকে ঢাকা থেকে প্রকাশকরা নিউইয়র্ক বইমেলায় যোগ দেয়া শুরু করলে এর ঔজ্বল্যতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তবে একটি বিষয় আমার খুব অল্প বয়স থেকেই আমার মাথায় ছিল, পেছনে থেকে নীরবে একাগ্রতার সাথে কাজ করে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষের একটি ফ্লাটফরম তৈরী করার বিষয়টি আমার মাথায় ছিল। ছিল পরম শ্রদ্ধার সাথে সকল গুণীজনদের শ্রদ্ধা করা এবং তাদেরকে বইমেলার সাথে সম্পৃক্ত করা।

আদনান সৈয়দ: বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং বাংলা বইমেলা নিয়ে আপনি কোথায় নিয়ে যেতে চান? আপনার স্বপ্নটা কী?

বিশ্বজিত সাহা: আসলে এই বইমেলা হয়তো বিশ্বজিত সাহা একদিন একা শুরু করার কথা ভেবেছিল। কিন্তু এই স্বপ্ন  বাস্তবায়নে নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকার লেখক-সাহিত্যিক-সাংবাদিক বিশেষ করে পাঠকদের কৃতিত্বতো দিতেই হবে। আপনি ভাবুন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বা কবি শামসুর রাহমান এর উপস্থিতিতে তাদের ৫/১০টি বই যে শহরেও কেনার পাঠক ছিল না, সেই শহরে নিয়মিত বইমেলা হকে সেটা ছিল অচিন্তনীয়। নিউইয়র্ক বইমেলা বিশ্বপরিমন্ডলে বাংলাকে ছড়িয়ে দেয়ার যে কাজটি শুরু করে ১৯৯২ সালে সেটি আজ ছড়িয়ে পেড়ছে টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, ওয়াশিংটন, ফ্লোরিডা, লন্ডন, সিডনী, টোকিওসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে। এটাই আমার স্বপ্ন পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি অভিবাসী সমাজ গড়ে উঠবে সেখানেই একুশের চেতনা ও বইমেলা ছড়িয়ে পড়ুক।

আদনান সৈয়দ: বলছিলাম যে স্বপ্নটি আপটি দীর্ঘ ২৮ বছর আগে বপন করেছিলেন সেই স্বপ্নটি কতটুকু সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্বজিত সাহা: কতটুকু সফল হয়েছে সেটিতো বলবে সমালোচক বা সমাজবিজ্ঞানীরা। তবে আমি বিনয়ের সাথে একটি কথা বলতে পারি স্বপ্নটি তখনি সার্থক হওয়া শুরু হয়েছে যেদিন থেকে সেমন্তী ওয়াহেদ, মুরাদ আকাশ, তানভীর রাব্বানীর মত তরুণরা মনে করা শুরু করেছে এটি তাদের বইমেলা। আর বাকিটুকু সময়ই বলবে।

আদনান সৈয়দ: এবার বইমেলার বাইরে একটি প্রশ্ন। ইদানিং নিউইয়র্কে শিল্প-সাহিত্যের বেশ একটি জোয়ার লক্ষ্য করার মত। এই বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গী কী? কতটুকু আশাবাদী?

বিশ্বজিত সাহা: নব্বই দশকের শুরুতে যখন নিউইয়র্কে বইমেলা শুরু হয় তখন নিউইয়র্ক প্রবাসী ৪ জন কবির একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় । গত তিন দশকে নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকায় লেখকের সংখ্যা বহু গুণ বৃদ্ধি পয়েছে। লেখালেখির অনেকগুলো ফ্লাটফর্ম সৃষ্টি হয়েছে। তবে একটি বিষয়ে এখনো জোয়ার সৃষ্টি হয়নি তা হলো নিয়মিত পাঠ্যাভাসের। লেখালেখি নিয়ে অবশ্যই আমি আশাবাদী, অনেকেই চেষ্টা করছেন। তবে লেখালেখি যদি সেলফি সর্বস্ব হয় সেটি বেশিদিন টিকে থাকবে না। সৃষ্টিশীলতা লুকিয়ে রাখার নয়। তার সৃষ্টিই বলে দেবে তার বুদ্ধিবৃত্তির দৌড় কতটুকু। 

আদনান সৈয়দ: নতুন প্রজন্ম নিয়ে একটি প্রশ্ন। বর্তমানে নতুন প্রজন্মদের বুক থেকে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি এক রকম উঠেই যাচ্ছে বলা যায়। চারদিকেই দেখি ইংরেজি ভাষার দৌরাত্ম। আমেরিকার মত একটি বিদেশে বিভুই ইংরেজি শহরে নতুন প্রজন্মদের আত্মায় বাংলা ভাষার শেকড় রোপন করে দেওয়ার জন্যে আপনারা কী করছেন? এই নিয়ে  আপনার ভবিষ্যতে বড় কোন পরিকল্পনা আছে কী?

বিশ্বজিত সাহা: এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে বর্তমানে আমি খুব আনন্দ উপভোগ করছি। আপনারা জানেন ১৯৯২ সালে বইমেলার শুরু থেকে মুক্তধারা শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা লিখন ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা করে আসছে। গত তিন দশকে আমেরিকায় বেড়ে ওঠা বাঙালি সমাজের চিন্তা-ভাবনার বিশাল একটা পরিবর্তন লক্ষনীয়। একসময় যখন ওপিওয়ান-ডিভিওয়ান এ বাংলাদেশীরা আমেরিকায় আসেন তারা সন্তানদেও ইংরেজী শেখানোটাকেই প্রাধান্য দিতেন। হয়তোবা সেটা ছিল নিজেদের অপরাগতা সন্তানদেও মধ্যে পূরণ করতে চাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু পরবের্তী প্রজন্মের অভিবাসী সমাজের চিন্তাধারার মধ্যে একটা  পরিবর্তন লক্ষনীয়। তারা মনে করে আমেরিকার মূলধারার স্কুলে যদি স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পঠিক হতে পারে, তাহলে বাংলা নয় কেন। একারণেই এখন বাংলা চর্চার প্রসার বেেেড়ছে। ছেলে মেয়েদের উদ্দুদ্ধ করতে হবে যার যার ঘর থেকে। পিতা-মাতাই পারেন সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন গত তিন বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর জন্মতিথিতে শিশু-কিশোর সম্মেলন করে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে। এর আহ্বায়ক হলেন একজন তরুণী। সে এবং তার সহযোগিরা এই কাজটি করে থাকে। আর আমরা অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত হতে পারছি আমাদের সন্তানরা সঠিকভাবেই এগুচ্ছে। এখন দরকার শুধু ওদের প্রতি আস্থা রেখে পথচলার রসদ যোগানো।

আদনান সৈয়দ: সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিনেট ২৫শে সেপ্টেম্বরকে ’বাংলাদেশ ইমিগ্রেন্ট ডে' হিসেবে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে। সন্দেহ নেই বিষয়টি গোটা বাঙালি জাতির জন্যে এক গৌরবময় অধ্যায়। এর পেছনের কারিগরও আপনি। কীভাবে এই কঠিন কাজটি সম্ভব হল? একটু বলবেন?

বিশ্বজিত সাহা: বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। এক সপ্তাহ পর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৩০তম অধিবেশনে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্বসভায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণ ছিল বাংলায়। এই প্রথম বিশ্ব সংস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হলো। বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ বাঙালিদের মনে প্রবল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। সম্ভবত সে ভাষণের ভেতর দিয়েই আরও বৃহত্তর একটি স্বপ্নেরও জন্ম হয়েছিল। বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে বিশ্বের ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করলে এ নিয়ে বাংলা ভাষাভাষীদের মনে নতুন উৎসাহের সঞ্চার হয়। ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় ২০১২ সালে। এটাও বাঙালির বিশাল অর্জন। জাতিসংঘতো সারা পৃথিবীর সংসদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণেই বলে গেছেন। এখন সেই জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা হওয়ার জোর দাবি উঠেছে।

শুধু জাতিসংঘ, ইউনেস্কো  নয় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের পতাকা আজ নিউইয়র্কের ক্যাপিটাল হিলেও পত পত করে উড়ছে। নিউইয়র্ক স্টেট ২০০১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। করছে উদযাপন বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। আর এ বছর ২৫ সেপ্টেম্বর যেদিন জাতির জনক বাংলা ভাষায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন সেদিনটিকে নিউইয়র্ক স্টেট ঘোষণা করলো বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে। ৪৫ বছর আগে যিনি এই শহরে বীরদর্পে ঘোষণা করে গিয়েছিলেন বাংলা নামে দেশের কথা। বাংলা ভাষার কথা। বাঙালি জাতির কথা। আজ সেই বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী লগ্নে সেই শহরই তাকে সম্মান জানালো ২৫ সেপ্টেম্বরকে ‘বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট ডে’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ভাবলে অবাক লাগে, সত্তর দশকে কতজন বাঙালি ছিল এদেশে। আজ শুধু নিউইয়র্কেই ৩ লক্ষাধিক বাঙালি বসবাস করছে। সাবওয়ে, ট্রেনে, বাসে সকলে বাংলায় কথা বলছে। জ্যাকসন হাইটসতো বাঙালি পাড়াই হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ দেখতেন তার বাঙালিরা শুধু আমেরিকা নয় সারা বিশ্বেই বাংলাদেশ তৈরি করে ফেলেছে।  

আরো অনেক অর্জন করছে বাঙালিরা আজ সারা পৃথিবীতে। আর তা সম্ভব হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নীতির জন্য। নানান বৈরীতার মাঝে তিনি জাতিসংঘের সদস্যপদ অজন করে যে কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছেন, তা এককথায় অনন্য অসাধারণ। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সরাসরি ব্রিটেনে এসে এডওয়াড হিথ এর সাথে দেখা করা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া কি সহজ বিষয় ছিল? ৭৪ এর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বসভায় জানান দিলেন। তারপর এক বছরও বাঁচতে দিলোনা হায়েনার দল। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বংশ নির্বংশ করে আইন করলো হত্যার বিচার করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বে সকল বিশ্বনেতাদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার সময়কার সকল নেতাকেই তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তার রাজনৈতিক ক্যারিসমা দিয়ে। তাইতো আজো চিরঞ্জিবী। তার দেখানো ‘কারো সাথে বৈরীতা নয়’ নীতি গ্রহণ করেই তো আজকের বাংলাদেশ সাফল্যের চূড়ায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যদি বাঙালির মুক্তির সনদ হয়, ২৫ সেপ্টেম্বরের ভাষণ বিশ্ববলয়ে বাঙালির শৌর্য-বীর্য তুলে ধরার সনদ। বাঙালিই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা মাতৃ-ভাষার জন্য যুদ্ধ করে, তার কাংখিত বিজয় অর্জন করে। তা অর্জিত হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে।

আর সেই দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য গত সাড়ে তিন বছর ধরে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি। প্রথমে ২০১৬ সালে সেনেটর স্ট্যাভেস্কির মাধ্যমে উত্থাপন করা নিউইয়র্ক স্টেট সেনেটে। সে বছর রিপাবলিকান সেনেটরদের বিরোধীতায় এটা উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালে সেনেটর হোজে প্যারাল্টাকে দিয়ে পুণরায় উত্থাপন করা হলে বিলটি বাতিল হয়ে যায়। ২০১৮ সালে আরো তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে সেনেট্ও স্ট্যাভেস্কিকে দিয়ে সিনেটে উত্থাপন করা হলে দীর্ঘ শুনানি হয়। শুনানী শেষে বিলটি সর্বসন্মতিক্রমে পাশ হয়। পাশ হওয়ার পর এবারই প্রথম দিনটি পালিত হয়।

ভালো লাগছে ভেবে মুক্তধারা নিউইয়র্ক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে ২০০১ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর প্রথম প্রামাণ্যচিত্র ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ প্রকাশ করে। সেটি উদ্বোধন করেছিলেন জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আদনান সৈয়দ: প্রতি বছর ২৫শে সেপ্টম্বর এই দিনটিকে স্মরণ রাখার জন্যে আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কী?

বিশ্বজিত সাহা: স্মরণীয় করে রাখার কাজতো এবছরই সকলে দেখলেন। নিউইয়র্ক স্টেট এর সিনেটর জন ল্যু এসে অভিবাসী বাংলাদেশি সমাজের কৃতিত্বের কথা বলে গেলেন। তিনি স্মরণ করলেন বাংলাদেশীদের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার গৌরবোজ্বল ইতিহাসকে।
এখন কাজ বাংলাদেশ সরকারের। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই দিনটিকে ‘অভিবাসী দিবস’ ঘোষণা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর লগ্নে  তাকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সারা বিশ্বে যে বাংলাদেশী অভিবাসী সমাজ গড়ে উঠেছে তাদেরকে সম্মান জানিয়ে প্রতীক হিসেবে দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে পারে।

আদনান সৈয়দঃ বাঙালি আর বাংলা নিয়ে আপনার নতুন কী স্বপ্ন? জানতে পারি?

বিশ্বজিত সাহা: বাঙালি আর বংলা নিয়ে আমার ভাবনা নিউইয়র্কে একিটি ‘বাংলাদেশ ভবন’ তৈরি করা। তাতে বাংলা ভাষার সকল তথ্য-উপাত্ত নিয়ে থাকবে একটা গবেষণাগার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর সেই গবেষণাগারটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। আপনি ভাবুন তিন দশক আগে আমেরিকার মূলধারায় বাঙালিদের অবস্থান আর আজকের অবস্থান এর কথা। আজ মেট্রো, বিলবোর্ড, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ এমনকি ভোটার কার্ডেও বাংলার ছড়াছড়ি। বাঙালিদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প বুননের কাজ শুরু হয়ে গেছে যে কখন, অনেকেও টেরও পাননি। আর এই বুনন শুরু করেছে এখানে বসত গড়া বাঙালি অভিবাসী সমাজ। এদের এক একটি ফেলা ইট একদিন অট্রালিকা হয়ে উঠবে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন একদিন হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রবেশ করবে এটিই আমার স্বপ্ন।

আদনান সৈয়দ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে সময় দেওয়ার জন্যে।

বিশ্বজিত সাহা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।