আশঙ্কাজনক হারে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ফের বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্য ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়াতে কারফিউ জারির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় স্লোভেনিয়ার বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেস হোজ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

মূলত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশ ফ্রান্সকে অনুসরণ করেই স্লোভেনিয়ার সরকারের এ কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত, এমনটি জানিয়েছেন আলেস হোস। 

প্রথম পর্যায়ে করোনা মোকাবিলায় স্লোভেনিয়া ছিল গোটা ইউরোপের মধ্যে একটি রোল মডেল। পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালি থেকে শুরু করে স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশগুলো করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে একের পর এক মৃত্যুর মিছিল দেখছিল সেখানে স্লোভেনিয়াতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ছিলো অনেকটা কম। অথচ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশটির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটতে আরম্ভ করছে। দেশটিতে প্রায়ই দৈনিক সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হচ্ছে। 

স্লোভেনিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় স্লোভেনিয়াতে ২ হাজার ৬৩৭ জনের শরীরে কোভিড-১৯ এর টেস্ট করা হয়েছে যাদের মধ্যে ৫৩৭ জনের শরীরে নতুন করে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

দেশটিতে বর্তমানে নমুনার বিপরীতে শনাক্তের হার ২০ শতাংশ এরও অধিক যা দেশটির সরকারের মধ্যে নতুন করে কপালের ভাঁজ সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত স্লোভেনিয়াতে মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৩  হাজার ৬৭৯ জন। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত দেশটিতে মারা গেছে ১৯০ জন ও চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন ৬ হাজার ৩৮৫ জন। 

স্লোভেনিয়ার গণমাধ্যম আরটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেস হোস বলেছে, সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে মূলত এ কারফিউ জারির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এ কারফিউ অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এ কারফিউ চলমান থাকবে। প্রাথমিকভাবে রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোতে এ কারফিউ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ ইনশা এক টুইট বার্তায় উল্লেখ করেন, স্লোভেনিয়াতে বর্তমানে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আবারও আগের মতো মহামারি আকার ধারণ করেছে এবং এ লক্ষ্যে তিনি আগামী ৩০ দিনের জন্য দেশটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির ঘোষণা দেন। 

উল্লেখ্য, স্লোভেনিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অবালনো-ক্রাসকাকে অরেঞ্জ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতীতে পশ্চিমাঞ্চলীয় গোরিস্কা এবং আড্রিয়াটিক সাগরের তীরবর্তী অঞ্চল প্রিমোরস্কো-নট্রানিস্কা অরেঞ্জ জোনের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বর্তমানে এ দুইটি অঞ্চল রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত। 

স্লোভেনিয়া সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতি এক লাখের মধ্যে ১৪০ জনের বেশি মানুষের শরীরে করোনার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সে অঞ্চলটি রেড জোন হিসেবে বিবেচিত হয়। অবালনো-ক্রাসকার কোনো অধিবাসী এখন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত কোনো এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না।

এর আগে যেখানে একই স্থানে একসেঙ্গে ১০ জনের বেশি মানুষের সমাগমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সেখানে ১০ জন থেকে কমিয়ে ছয়জন করা হয়েছে। ধর্মীয় আচার-উৎসব থেকে শুরু করে বিবাহ অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়াও বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যাতায়াতের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে এ মুহূর্তে বন্ধ হচ্ছে না গণপরিবহন সেবা। গ্রন্থাগার, গ্যালারি কিংবা মিউজিয়ামগুলোকেও খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

কারফিউ চলাকালীন কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যাতায়াত করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি যদি এ আইনের না মানেন তাহলে তাকে ৪শ’ থেকে শুরু করে ৪ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেস হোস। 

প্রাথমিক অবস্থায় জরিমানা করার ক্ষমতা কেবলমাত্র দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। তবে তিনদিন আগে দেশটির জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত পঞ্চম করোনভাইরাস স্টিমুলাস প্যাকেজ কার্যকর হওয়ার পর পুলিশও সরাসরিভাবে এই ক্ষমতা লাভ করবেন বলে তিনি জানান। প্রাথমিক অবস্থায় এ আইন অমান্য করা অবস্থায় পুলিশের হাতে কেউ ধরা পড়লে পুলিশ তার যাবতীয় বৃত্তান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালকের কাছে পাঠাবেন। ওই বিবরণ অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক তার জরিমানার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।