করোনার প্রাদুর্ভাবে পুরো বিশ্বই নতুন এক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের ঢেউ অধিক হারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে। করোনার আগে ইউরোপ-আমেরিকা শক্তিধর ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো তারা তাদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে যে গর্ব বোধ করত করোনার ধাক্কায় তাদের সেই গর্ব ধুলোয় মিশে গেছে বলা যায়। কারণ আমেরিকা, ইতালি, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর দুর্বলতা ফাঁস হয়েছে করোনার মোকাবিলায়। করোনা সুরক্ষাসামগ্রী যেমন মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই ইত্যাদির অভাব ছিল প্রকট। অতি নাজুক রোগীদের সেবায় যে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন আমেরিকায় সেই ভেন্টিলেশনের ছিল চরম অভাব। তাই করোনা-পরবর্তী বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিনিয়তই আসছে পরিবর্তন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশই বার্ষিক বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য, রোগ ও প্রতিষেধকবিষয়ক গবেষণাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা সুরক্ষাসামগ্রী ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে এগিয়ে এসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। জরুরি সেবা দিতে বিশ্বজুড়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য অস্থায়ী হাসপাতাল। এগুলো নির্মাণে কারিগরিভাবেও অনেক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রায় সবাইকে। এ ক্ষেত্রে চমক সৃষ্টি করেছে চীন। করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিতে মাত্র ১০ দিনে উহানে এক হাজার ও এক হাজার ৬০০ শয্যার হোসেনসান ও লোশেনসান নামে দুটি হাসপাতাল নির্মাণ করে দেশটি।
এসবের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাতেও এসেছে পরিবর্তন। টেলিমেডিসিন বা ডিজিটাল মাধ্যমে ডাক্তারদের রোগী দেখার প্রবণতা বেড়েছে। সবার সুরক্ষায় ভবিষ্যতেও একই পথে হাঁটতে চায় সবাই। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে টেলিমেডিসিন বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়ার মাত্রা পূর্বের ২৮ শতাংশ থেকে উন্নীত হয়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থায় কাজের চাপ ও স্ট্রেস মোকাবিলা করে কীভাবে সেবা দেওয়া যায় সেসব নিয়েও নতুন ডাক্তার ও মেডিকেল সায়েন্সে যুক্ত হয়েছে নতুন পাঠ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ছয় কোটির মতো নার্সের সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও ভাবছে বিভিন্ন দেশ।
এসব প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি করোনাকালে চিকিৎসা খাতে নিত্যনতুন উদ্ভাবনও ছিল চোখে পড়ার মতো। করোনা আক্রান্ত রোগীদের জরুরি শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তায় ভেন্টিলেটরের অভাব দূর করতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সহজলভ্য ও সহজে নির্মাণযেগ্য ভেন্টিলেটর তৈরি করে। যার মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের ডাক্তার রাইস থমাস ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সিআর ক্লার্কের যৌথ তত্ত্বাবধানে তৈরি ভেন্টিলেটর। যুক্তরাজ্যেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান 'জার্ম ট্রাপ' নামে বিশেষ একধরনের কাপড়ে বানানো মাস্ক তৈরি করে। যার সংস্পর্শে আসা জীবাণুগুলো মারা যায়। চীন এবং জাপানের কয়েকটি টেক কোম্পানি ডাক্তারদের জন্য রোগীর সংস্পর্শে না এসে সেবা দিতে তৈরি করে বিশেষ ধরনের রোবট। ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠান ঘর বিশেষ করে হাসপাতাল স্যানিটাইজ করার জন্য বানিয়েছে বিশেষ রোবট। মেক্সিকোর এক কোম্পানি তৈরি করে 'প্লাস্টিক প্রোটেকটিভ ক্যাপসুল'। যার মধ্যে থেকে রোগী এবং ডাক্তার উভয়ই নিরাপদ থাকবে এবং ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে না।
এই সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল প্লাজমা থেরাপি। এই পদ্ধতিতে সাধারণত কোনো ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই রক্ত সঞ্চালিত করা হয় একই ধরনের ভাইরাল সংক্রমণের শিকার রোগীর দেহে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফু্ল এবং ১৯৩০ সালে হামের চিকিৎসায় এ পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়। ইবোলা ও সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবেও প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
করোনা থেকে বাঁচতে সচেতনার কোনো বিকল্প নেই। কারণ এর প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। নিউমোনিয়া ও সাধারণ জ্বরের ভ্যাকসিন দিয়েই প্রাথমিকভাবে রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা দেওয়া হয় বিভিন্ন দেশে। পাশাপাশি নানা দেশে প্রচলিত হারবাল পদ্ধতির চিকিৎসাও পরীক্ষামূলকভাবে রোগীদের দেওয়া হয়। যেমন- চীনে নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ ও হারবাল পদ্ধতি করোনা রোগীর সুস্থতায় বেশ কাজ করে। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গে চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্র্যাডিশনাল মেডিসন বিশেষজ্ঞকে বিভিন্ন হাসপাতালে কাজে লাগানো হয়।

মন্তব্য করুন