খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ক্রিসমাস বা বড়দিন। যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতি বছর দিবসটি উদযাপন করা হয়। 

মূলত ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের বা বড়দিন উদযাপিত হয়। তবে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি বড় অংশ যারা অর্থোডক্স চার্চে বিশ্বাসী তারা ৭ জানুয়ারি বড়দিনের উৎসব করে থাকেন। অর্থোডক্স চার্চগুলো গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে পুরাতন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, যিশুখ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল ৭ জানুয়ারি। 

অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মের একটি প্রাচীন শাখা, বিশ্বাসগত দিক থেকে অর্থোডক্সের সঙ্গে ক্যাথলিকের বেশকিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত গ্রিস, রোমানিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, মেসিডোনিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়া, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। 

ক্যাথলিক চার্চগুলো পোপের কর্তৃত্ব স্বীকার করে, রোমের ভ্যাটিকানকে রোমান ক্যাথলিক গির্জার প্রধান সদর দফতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে অর্থোডক্স চার্চগুলো পোপের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে না, যদিও প্রাথমিকভাবে পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স চার্চগুলো অনেকাংশে গ্রিস দ্বারা প্রভাবিত। ক্যাথলিক চার্চগুলো ধর্মযাজকদের বিবাহের অনুমতি দেয় না কিন্তু অর্থোডক্স চার্চের ধর্মযাজকেরা চাইলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। 

ফেসবুকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক মেয়ের পরিচয় হয়, তার নাম ইরেনা প্রসহিচ। ইরেনা মেসিডোনিয়ার অধিবাসী। তার কাছ থেকে জানার চেষ্টা করলাম মেসিডোনিয়ার বড়দিনের সংস্কৃতি সম্পর্কে। 

মেসিডোনিয়ায় ক্রিসমাসের ধারণাটি ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা। কাগজে-কলমে দেশটির বেশিরভাগ মানুষ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। কিন্তু বাস্তবে কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়া মেসিডোনিয়ার মানুষের মাঝে ধর্মের তেমন একটা প্রভাব নেই। ক্রিসমাস উৎসবকে মেসিডোনিয়াতে একটি সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 দেশটিতে ক্রিসমাস ট্রি, বর্ণিল আলোকসজ্জা বা ক্রিসমাস মার্কেটের প্রচলন আছে। তবে সেটা যতোটা না ক্রিসমাসকেন্দ্রিক তার থেকে বেশি আসন্ন নতুন বছরকে কেন্দ্র করে। মেসিডোনিয়াতে বড়দিনের উৎসবে ক্রিসমাস ট্রির পরিবর্তে ওক গাছের প্রাধান্য বেশি। আর সান্তা ক্লজ মেসিডোনিয়ার সংস্কৃতিতে তেমন একটা জনপ্ৰিয় নয়। 

ক্রিসমাস উপলক্ষে সাত ও আট জানুয়ারি মেসিডোনিয়ায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। জানুয়ারির পাঁচ তারিখে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বড়দিনের আনুষ্ঠানিকতা। পরিবারের সদস্যরা এ সময় বাড়ির উঠানে ইয়ুল নামের এক বিশেষ প্রজাতির ওক গাছের গুঁড়িতে আগুন ধরায়। এরপর সবাই সেখানে জড়ো হয়, প্রত্যেকের হাতে থাকে বিভিন্ন খাবার ও পানীয়। মেসিডোনিয়ার সব উৎসবে রাকিয়া নামক এক বিশেষ ধরনের পানীয়ের প্রচলন রয়েছে। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর বিভিন্ন ধরনের গানের সুরে তারা রাতটি অতিবাহিত করেন।

পরের দিন অর্থাৎ ছয় জানুয়ারি সূর্য উঠার পর বাড়ির ছোটো বাচ্চারা দলবদ্ধ হয়ে ছোটে পাড়ার বিভিন্ন বাসায়। এ সময় তাদের কণ্ঠে থাকে বিভিন্ন ধরনের গান। পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা এদিন বাচ্চাদের চকলেট ও ক্যান্ডি, ফল, বাদাম কিংবা খেলনাসহ বিভিন্ন উপহার দেন। যারা তুলনামূলকভাবে ধর্মভীরু তাদের অনেকে এদিন কিংবা তারপরের দিন নিজেদের মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবরে ফুল দেন ও তাদের জন্য প্রার্থনা করেন।

ছয় জানুয়ারির মূল আকৰ্ষণ হচ্ছে রাতের খাবার, এদিন পরিবারের সব সদস্য একত্রে বসে রাতের খাবার উপভোগ করেন। মেসিডোনিয়ার ভাষায় এ খাবারকে বলা হয় 'পসনা'। এদিনের রাতের প্রায় সব আইটেম বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি হয়। অর্থাৎ এ রাতে তারা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার থেকে শুরু করে মাংস কিংবা অন্যান্য আমিষ জাতীয় খাবার পরিহার করেন। এছাড়া ক্রিসমাস উপলক্ষে এদিন বিশেষ ধরনের পাউরুটি তৈরি করা হয়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু একটি করে পাউরুটি বরাদ্দ থাকে। আরও দুটি পাউরুটি তৈরি করা হয়, যার একটি সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে এবং অন্যটি নিজেদের ঘরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। পাউরুটি বেক করার সময় যে কোনো একটি পাউরুটির মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কয়েন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। রাতের খাবারের শেষে পরিবারের সবার মাঝে পাউরুটি বণ্টন করা হয়, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা সবার প্রথমে পাউরুটি গ্রহণ করেন। যার পাউরুটির ভেতরে কয়েনটি লুকানো থাকে ধারণা করা হয় আসন্ন বছরটি তার জন্য মঙ্গলময় হতে যাচ্ছে। 

সাত জানুয়ারি যারা তুলনামূলকভাবে ধর্মভীরু তাদের অনেকে চার্চে প্রার্থনায় যান। এদিন তেমন একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে দুপুরের খাবার উপভোগ করে। দুপুরের খাবারে থাকে রোস্টেড মাংশ,সসেজ, সালামি, পনিরের পাই, বিভিন্ন ধরণের রুটি, সালাদ এবং কেক।