ক্ষমতা ও লোভ সবকিছুর মূলে- এ কথা আমরা বিশ্বাস করি বা না করি তাতে লোভের কোনো ঘাটতি দেখা দেবে না এবং তার সারফেসে যে ক্ষমতার দাপট আছে; তাতেও কোনো হেরফের হবে না। এমনটাই মনে হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীন ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আমেরিকার সামরিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ত্রিমুখী রাজনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা দেখে।
অতি সম্প্রতি, দক্ষিণ চীন সাগর ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক উত্তেজনা প্রকাশ পাচ্ছে আমেরিকা, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ার তৎপরতায়। এই দেশগুলো তাদের সামরিক বিমান বহনকারী জাহাজ নিয়ে টহল শুরু করেছে। আবার চীন, রাশিয়ার নেতৃত্বে ভারত মহাসাগরে সামরিক মহড়ায় যোগ দিয়েছে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা। এসব সামরিক তৎপরতার মানে হচ্ছে, একটি সংঘাতের দিকে ছুটে চলেছে দেশগুলো; সেখানে পৃথিবীর সাধারণ মানুষের তেমন কোনো স্বার্থ ও কল্যাণ নিহিত নেই।
একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকা তার আধিপত্য বিস্তারে দক্ষিণ চীন সাগরের চারপাশের দেশগুলোর মিত্র হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন আমেরিকা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে রণতরী পাঠিয়েছে। তার সঙ্গে এসেছে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রণতরী। তারা সম্মিলিতভাবে সামরিক মহড়ার মতো করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ঘুরছে। মনে হচ্ছে, তাদের অভিলাষ- অচিরেই তারা হামলে পড়তে চায় কারও ওপর বা কোনো দেশের ওপর। কিন্তু কেন- সেটাই হলো মূল প্রশ্ন।
দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার কীসের স্বার্থ- এ প্রশ্নের অনেক উত্তর হতে পারে। প্রথমত, সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার। দ্বিতীয়ত, উদীয়মান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে চীনকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা। তৃতীয়ত, দক্ষিণ চীন সাগরে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা চীনের গ্রাস থেকে মুক্ত করে নিজেদের করায়ত্তে নিয়ে আসার চেষ্টা। এ ক্ষেত্রে চীন ওই সাগরের বেশিরভাগ অংশই সামরিক শক্তির জোরে দখলে রেখেছে এবং তাদের সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টি করে সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলছে। এতে সাগরে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজের অসুবিধার কথা বলছে আমেরিকা। সাগরের অন্যান্য অংশীদার ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দারুস সালাম, ফিলিপাইন- এরা বলছে, চীন তাদের সমুদ্রসীমার ভেতরে ঢুকে তাদের জায়গায় দ্বীপ নির্মাণ করছে এবং তাদের যে পরিমাণ সাগরসীমার অধিকার, তা নস্যাৎ করছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ চীন সাগর থেকে যে বিপুল পরিমাণ মৎস্যসম্পদ আহরণ করছে চীন, তা হিস্যা অনুযায়ী হচ্ছে না। অধিকাংশই যাচ্ছে চীনের পেটে।
বিরোধের মূল হচ্ছে ওই সাগরে যে পরিমাণ তেল, গ্যাস, মৎস্যসম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে। কিন্তু তারা বলছে, মালাক্কা প্রণালি দিয়ে প্রতি বছর ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্য হয় তা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে চীনের কারণে। ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন কিলোমিটার আকারের দক্ষিণ চীন সাগর ভূমধ্যসাগরের অর্ধেক হলেও সম্পদের বিবেচনায় এর গুরুত্ব অনেক বেশি। সেই সঙ্গে আছে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে তা অনেক। বলা যায়, গোটা বিশ্বের ৭০ শতাংশ পণ্যবাহী জাহাজ এই পথে চলাচল করে। চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ- দেশটি 'ফ্রিডম অব নেভিগেশন' লঙ্ঘন করছে।
চীন দক্ষিণ চীন সাগরের ৮০ শতাংশই শুধু দাবি করে না; সে দখলেও রেখেছে ওই সাগরের ৮০ শতাংশ। দূরের দেশ আমেরিকা তার স্বার্থ দেখে ফ্রিডম অব নেভিগেশন সূত্রে। কারণ তার বাণিজ্য জাহাজগুলো এ পথেই চলাচল করে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মূল বিষয় সম্ভবত দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ। আমেরিকার হিসাবে ওখানে আছে ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আর ১৯০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসসম্পদ। চীনের হিসাবে ১২৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আর ৫০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিশ্বের ১০ শতাংশ মৎস্যসম্পদ মজুদ আছে এই সাগরে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের কারণেই যে পরাশক্তি আমেরিকার চোখ এখানে আটকে আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চীন যদি এ সাগরের ৭০-৮০ শতাংশ সম্পদ নিজেদের দখলে রাখতে পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে চীনের পরাশক্তি হয়ে ওঠার সাধনা রুখতে পারবে না আমেরিকা। এটা সে অনেক আগেই বুঝতে পেরে দুই বছর আগে দক্ষিণ চীন সাগরে রণতরী পাঠিয়ে চীনকে শাসিয়েছিল। তখন চীনের বড় আকারের রণতরী ছিল না। মার্কিন হুমকি মোকাবিলায় চীন বিশাল আকারের যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ নির্মাণ করেছে। বলা হচ্ছে, তারা তিনটি বিমানবাহী জাহাজ নির্মাণ করেছে। তার মানে, আমেরিকার যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় এখন চীন অনেক সক্ষম। সত্যই যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধে, তা হবে দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ চীন সাগরকে নিয়ে আমেরিকা তার মিত্র ভারত, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়াকে কাতারবন্দি করে রেখেছে। অন্যদিকে, ওই এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি গুয়াম দ্বীপে। তবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে জাপান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াসহ সাগরের চারপাশের দেশগুলোতে। অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগর আমেরিকার সামরিক চোখের ভেতরে। সে কারণেই চীন সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টি করে সামরিক স্থাপনা করছে। সেই দ্বীপগুলোতে শুধু মিসাইলই বসায়নি চীন; বিমান ওঠানামার এয়ার স্ট্রিপ এবং যুদ্ধবিমান মজুদ রেখেছে যে কোনো জরুরি সময়ে ব্যবহারের জন্য। অর্থাৎ দু'পক্ষই প্রস্তুত যে কোনো সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার জন্য।
তবে অতি সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারা চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চান। যুদ্ধের মতো সংঘাতে জড়াতে চান না। ওদিকে চীনও যুদ্ধে জড়াতে চায় না। সেও তার মিত্রদের কাতার তৈরি করেছে। চীনের পাশে এখন রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরানসহ অনেক দেশ। এমনকি শ্রীলঙ্কাও এখন চীনের লাইনে আছে। সেও রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরানের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
কোল্ড ওয়ার যুগের অবসানের পর একক পরাশক্তি আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে চীনের মাথা তুলে দাঁড়ানো এবং নতুন করে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বৃদ্ধিই আমরা লক্ষ্য করছি। অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে চীন দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেরই সহযোগী।
প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো দেশেরই একান্ত নিজস্ব নয়। সামুদ্রিক সম্পদ তো আরও নয়। পৃথিবীর সব মানুষেরই মালিকানা সেখানে আছে। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিনি তৎপরতার যেমন বৈধতা আছে, সেটা চীনের একচ্ছত্র গ্রাস করার কারণেই। এই সাগরপথে যাদের বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল করে, তাদের সেই অধিকার আছে। ফ্রিডম অব নেভিগেশনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, যাতে সব দেশ তার বাণিজ্য করতে পারে কোনো রকম বাধা ছাড়াই। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগরে ফ্রি নেভিগেশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চীনের সামরিক তৎপরতার কারণে। হিস্যাপ্রাপ্তদের বঞ্চিত করার এমন মানসিকতা থেকেই পৃথিবীতে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, যা কোনো মানুষের কাম্য নয়।
আমরা কোনো যুদ্ধ চাই না। চাই পৃথিবীর ক্ষুধা আর দারিদ্র্য দূর করতে সম্পদশালী দেশগুলো যেন তাদের লোভের লাগাম টেনে ধরে এবং তাদের সেই সম্পদ কাজে লাগায় গরিব দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে। আফ্রিকার দেশগুলোতে ক্ষুধার যে মহামারি চলছে দশকের পর দশক ধরে, তা নিবারণে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এবং চীন, রাশিয়া ও তাদের মিত্ররা তাদের মানবিক বোধ জাগ্রত করছে না- সেটাই আজ বড় প্রশ্ন।
সাংবাদিক

বিষয় : ভূ-রাজনীতি

মন্তব্য করুন