পর্তুগালে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে গত বছর ২ মার্চ। ১৮ মার্চ থেকে পর্তুগাল সরকার দেশটিতে লকডাউন ঘোষণা করে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর মেয়াদ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানেও দেশটিতে সরকারি ছুটির দিন অর্থাৎ শনি ও রোববার আংশিক লকডাউন চালু আছে। পর্তুগাল গত বছর ২৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম চিকিৎসকদের জন্য করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান কর্মসূচি চালু করে। পরে এ বছরের জানুয়ারিতে দেশটি গণটিকা কর্মসূচি হাতে নেয়, যা এখনও চলমান।

পর্তুগালের নাগরিকদের একটি আইডেনটিক্যাল মেডিকেল নম্বর রয়েছে। একে এসএনএস নম্বর বলা হয়। এই নম্বর দিয়ে একজন ব্যক্তির যাবতীয় চিকিৎসার ইতিহাস বের করা সম্ভব। এখানকার প্রত্যেক চিকিৎসকের টেবিলে একটি কম্পিউটার থাকে। সেখানে এই এসএনএস নম্বর এন্ট্রি করে চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানতে পারেন এবং পূর্ববর্তী প্রেসক্রিপশন দেখেন ও নতুন তৈরি করে থাকেন।

পর্তুগাল এই মেডিকেল নম্বর ব্যবহার করে করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। এ জন্য গত দশকে তারা গড়ে তোলে এসএনএসের নিজস্ব ওয়েবসাইট, যা দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করে। কভিড-১৯ এর সংকট শুরু হলে তারা এসএনএসের ওয়েবসাইটে করোনাভাইরাসের টিকা নিবন্ধন করার জন্য একটি আলাদা পেজ খোলে। সেখানে এসএনএস নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে টিকা গ্রহণের জন্য খুব সহজে কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নিবন্ধন করা যায়। একই সঙ্গে এসএনএসের এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে সুস্থতা ও টিকা গ্রহণের সার্টিফিকেট তোলার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এসএনএস ২৪ নামক অ্যাপ ব্যবহার করেও এসব কাজ সম্পন্ন করা যায়। আগে থেকেই পর্তুগাল মেডিকেল নম্বর সিস্টেম গড়ে তোলায় তাদের করোনা মোকাবিলা ও টিকাদানে অথৈ পানিতে পড়তে হয়নি। বরং আগে থেকেই বর্তমান একটি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে এই টিকাদান কর্মসূচি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে সরকারি কোষাগারের মূল্যবান অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।

পর্তুগাল সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশটির নাগরিকদের স্বাস্থ্য তথ্য নিয়ে গবেষণা করে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েকটি ধাপে জনগণকে টিকাদানের ঘোষণা দেয়। দেশটি গণটিকা কার্যক্রমে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, মডার্না এবং জনসনের টিকা ব্যবহার করেছে। মূলত ৬৫+ বয়সীদের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিয়েছে এবং যাদের একবার অন্তত করোনা সংক্রমণ হয়েছে, তাদের মূলত জনসনের টিকা প্রদান করেছে। অন্যদিকে ৬৫ বছরের কম বয়সী নাগরিকদের জন্য পর্তুগাল সরকার মডার্না ও ফাইজারের টিকা ব্যবহার করেছে।

পর্তুগালে টিকা কার্যক্রমের সর্বপ্রথম ধাপে ৫০ বছরের অধিক বয়স্ক হার্ট, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভোগা নাগরিকদের টিকা প্রদান করে। দ্বিতীয় ধাপে তারা প্রথমে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান করে। তৃতীয় ধাপে ৫০ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের টিকা প্রদানের আবেদন গ্রহণ ও টিকা প্রদান করে। ক্রমশ ৪০-৪৯ বয়সীদের জন্য চতুর্থ ধাপ, ৩৫-৩৯ বছর বয়সীদের জন্য পঞ্চম ধাপ এবং ৩০-৩৪ বছর বয়সীদের ষষ্ঠ ধাপে করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান শুরু করে। জুলাই মাসের ৭ তারিখের পর থেকে ২৫-২৯ বছর বয়সীদের টিকা প্রদান শুরু হয়। বর্তমানে তারা ১৮+ নাগরিকদের টিকা প্রদান কর্মসূচি চালু করছে। এ ছাড়া বিশেষ কেস বিবেচনায় ১-১৭ বছর বয়সী প্রায় ১৮শ শিশু করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ এরই মধ্যে ২ ডোজ টিকা নিতে সক্ষম হয়েছে।

পর্তুগাল অভিবাসীবান্ধব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত দেশ হওয়ায় এখানে প্রচুর সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন, যাদের এসএনএস অর্থাৎ মেডিকেল নম্বর নেই। দেশটিতে করোনাভাইরাস নির্মূল করতে বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় পর্তুগিজ সরকার তাদেরও টিকার আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে এখানে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকরাও করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করতে পারছে। যাদের এসএনএস নম্বর নেই, তাদের জন্য পর্তুগাল সরকার কেন্দ্রীয় টিকা প্রদানের ওয়েবসাইটে (এসএসএস২৪) আলাদা একটি পেজ রেখেছে। সেখানে পাসপোর্ট নম্বর, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা দিয়েও করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণের জন্য আবেদন করা যায়। ফলে এখানে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিক, অভিবাসন প্রার্থী অবৈধ নাগরিকরাও সহজে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করতে পেরেছেন।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় পর্তুগাল সরকার গত বছর মার্চের শুরুতে লকডাউনের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিসের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পর্তুগিজ সরকার দ্রুতই শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করে করোনা নির্মূলে গণটিকা কর্মসূচি হাতে নেয়। ফলে দেশটিতে এখন স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত প্রায় স্বাভাবিকভাবে চলছে। মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে পারছে। বর্তমানে পর্তুগালে মোটামুটি একটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে এসেছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ সরকারও পর্তুগালের মতো লকডাউন কর্মসূচির নেতিবাচক প্রভাব উপলব্ধি করে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করবে। একই সঙ্গে কভিড-১৯ সংকটের সময় পর্তুগালের মতো বাংলাদেশের জনগণের জন্যও জাতীয় মেডিকেল ডাটাবেজ তৈরি ও মেডিকেল নম্বর প্রদানের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ আরও ভালো চিকিৎসা সুবিধা লাভ করবে এবং চিকিৎসকদেরও রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য খুঁজতে বেগ পেতে হবে না।

শিক্ষার্থী, নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স, পর্তুগাল
kaisulkhan@yahoo.com