বরিশাল সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের গণপাড়া গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, দুই বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদে কৃষকদের আবহাওয়ার তথ্য দেওয়ার জন্য কিছু মেশিনপত্র লাগানো হয়। কিন্তু লাগানোর পর থেকে আজ পর্যন্ত ওই মেশিনপত্র থেকে কোনো তথ্য কৃষকরা পাননি। কাশীপুর ইউনিয়ন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কবীর হোসেন বলেন, কৃষকদের আবহাওয়ার তথ্য দেওয়ার জন্য যে রেইন গজ মিটার লাগানো হয়েছিল, সেগুলো কাজ করে না। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে স্থাপিত আবহাওয়া বোর্ডে তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয় না।

বরিশালে প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য জেলার ৫৮টি ইউনিয়নে স্বয়ংক্রিয় রেইন গজ মিটার স্থাপন করা হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি আবহাওয়ার তথ্য পেতে লাগানো ৫৮ ইউনিয়নের সব ডিভাইস এখন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। বরিশাল সদর উপজেলা এবং বাবুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে কোথাও রেইন গজ মিটার এবং তথ্য বোর্ডের কার্যক্রম সচল ও হালনাগাদ পাওয়া যায়নি।

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় 'কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতিকরণ' শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে দেশের মোট চার হাজার ৫১টি ইউপিতে রেইন গজ মিটার ও কৃষি আবহাওয়া তথ্য বোর্ড স্থাপন করে। একই সঙ্গে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য কৃষকদের দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ শেষে ইন্টারনেট সংযোগসহ ছয় হাজার ৬৬৪টি ট্যাব দেওয়া হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের ও উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী জেলেসহ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে পেছনের তিন দিন এবং পরবর্তী তিন দিনসহ মোট ছয় দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেবেন তথ্য বোর্ডের মাধ্যমে। এই ডিভাইসের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, ঝড়ের পূর্বাভাস, আলোকঘণ্টাসহ ১০টি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তা সর্বসাধারণের কাছে প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা হয়।

এসব তথ্য দেওয়ার জন্য প্রকল্পভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদের ছাদে রেইন গজ মিটার এবং সোলার প্যানেল বসানো হয়েছিল। আর আবহাওয়ার তথ্য হালনাগাদ করার জন্য তথ্য বোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরের দর্শনীয় স্থানে অথবা ইউপি সচিবের কক্ষে।

সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন পরিষদে কথা হয় টুমচর গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হকের সঙ্গে। ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের ছাদে থাকা স্বয়ংক্রিয় রেইন গজ মিটার ও নিচে থাকা আবহাওয়ার তথ্য বোর্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, 'সরকার মোগো উন্নতির লইগ্যা বহু কাজ করে; কিন্তু মোরা কোনো সুফল পাই না। মোরা নদীকূলের মানুষ। আবহাওয়ার খবর পাইতে পাশের বাড়ি যাওয়া লাগে। হ্যারা টিভিতে সব খবর জানে। সরকার আমাগো আবহাওয়ার খবর দিতে যে টাকা খরচ করছে, মোরা হ্যার কোনো উপকার পাই নাই।'

চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সুবোধ চন্দ্র দাস বলেন, পরিষদ ভবনের ছাদে ড্রামাকৃতির একটি মেশিন বসানো আছে, সঙ্গে সোলার প্যানেল। আর তথ্য বোর্ড রয়েছে ভবনের নিচতলায়। এর কাজ কী, তিনি নিজেই জানেন না।

কৃষি তথ্য বোর্ডের দায়িত্বে থাকা চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাকুরুর রহিম জানান, ছয় মাস হলো তিনি চন্দ্রমোহনে এসেছেন। এই বোর্ড অপারেট করার বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণও তিনি পাননি। এ সময় একই ইউনিয়নের ব্লক সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া তথ্য বোর্ড নষ্ট। তবে তার মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে কৃষকদের গ্রুপপ্রধানের কাছে। তাদের মাধ্যমে আবহাওয়ার তথ্য এবং পরামর্শ দেন তিনি।

সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, তথ্য বোর্ড রয়েছে ইউনিয়ন সচিবের কক্ষে টানানো। সেখানেও কৃষি বিভাগের তিন কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরের ঘর ফাঁকা রয়েছে।

সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, বোর্ডে তিনজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকলেও তথ্য হালনাগাদ নেই। রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও একই চিত্র দেখা যায়। এই ইউনিয়নের সচিব আতিকুর রহমান বলেন, আবহাওয়ার একটি তথ্য বোর্ড আছে; তবে তিনি কখনও এর কার্যক্রম দেখেননি।

কৃষি অধিদপ্তর বরিশালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোসাম্মাৎ মরিয়ম বলেন, প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকেই কৃষি আবহাওয়া তথ্য দেওয়ার জন্য বসানো মেশিনগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে না। বিষয়টি প্রকল্প পরিচালককে লিখিতভাবে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো সুফল মেলেনি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যে ট্যাবগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো মানসম্মত ছিল না। বলা যায় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতিকরণ প্রকল্পের সুফল কৃষকরা পাননি।

এদিকে বরিশালের ৫৮টি ইউনিয়নের রেইন গজ মিটার ও তথ্য বোর্ডের অবস্থা বেহাল হলেও 'কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতিকরণ' প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ড. শাহ কামাল খান। মোবাইল ফোনে প্রকল্প পরিচালক ড. শাহ কামাল খান সমকালকে বলেন, ২০২১ সালে জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত ৫ অক্টোবর মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। এখন যন্ত্রপাতিগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর মাঠ এবং জেলা পর্যায় থেকে যথাযথভাবে মনিটর করা হয়নি। বর্ধিত মেয়াদে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর্ধিত দুই বছরের জন্য আরও ৯৪ কোটি টাকার প্রস্তাব একনেকে পাস হয়েছে।