বাংলাদেশের মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের চিকিৎসা-জ্ঞান কানাডিয়ান গ্র্যাজুয়েটদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়, কিন্তু রোগীর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পেশাদার এবং সংবেদনশীল যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতির কারণে তারা কানাডিয়ান চিকিৎসা সেবায় জায়গা করে নিতে পারছেন না।

বিদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের রেসিডেন্সির ইন্টারভিউ বোর্ডের অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনির্সিটির চিকিৎসা শিক্ষার অধ্যাপক ডা. তানিয়া রুবাইয়াত এই মন্তব্য করেছেন। 

তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে দুইজন বাংলাদেশি চিকিৎসক বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট অভিবাসী হয়ে বিদেশে যচ্ছেন। ফলে উন্নত দেশের চিকিৎসা সেবা এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো দরকার।

কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় স্থানীয় সময় বুধবার রাতে ’শওগাত আলী সাগর লাইভে’র আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।

‘বাংলাদেশি চিকিৎসকরা কানাডায় কেন স্বীকৃতি পান না ‘ শীর্ষক এই আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ওয়েস্টার্ন ইউনির্ভাসিটির সুলিখ মেডিকেল স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানিয়া রুবাইয়াত। কানাডায় চিকিৎসা পেশায় যোগ দেওয়ার প্রচেষ্টায় থাকা দুই বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. খন্দকার মাহমুদুল হক এবং ডা. বীথিকা সেন আলোচনায় তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

ডা. তানিয়া রুবাইয়াত বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের কানাডার চিকিৎসা সেবায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিধিবিধানগুলো তুলে ধরে বলেন, মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের রেসিডেন্সি দেওয়ার ইন্টারভিউতে প্রার্থীর চিকিৎসা-জ্ঞান বা দক্ষতাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ধরেই নেওয়া হয় একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞান থাকবেই বা তিনি সেটা শিখে নিতে পারবেন। তারা গুরুত্ব দেন- একজন চিকিৎসক কীভাবে কথা বলছেন, তার আচরণ, কথা বলার ধরন কতোটা মার্জিত এবং রোগীকে বোঝার সক্ষমতা তার কতোটা আছে। রোগীর সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে তিনি কতোটা সংবেদনশীল ও পেশাদার সেটিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডা. তানিয়া রুবাইয়াত বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসকরা শুধুমাত্র চিকিৎসাই দিয়ে থাকেন, কিন্তু কানাডায় চিকিৎসা সেবাটাকে সামগ্রিকভাবে রোগী-চিকিৎসকের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। একজন চিকিৎসক রোগীর আর্থ সামাজিক এবং সংস্কৃতি বুঝে তার সঙ্গে কতোটা সংবেদনশীল আচরণ করছেন- সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই জায়গাটায় এসে অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসক পেছনে পড়ে যান।

তিনি বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজের পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষকদের নম্বর দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করে বলেন, পাকিস্তান বা ভারতের কোনো গ্র্যাজুয়েট যখন সিভি জমা দেন, তাদের নম্বর থাকে শতকরা ৯০। কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর থাকে না। ফলে বাংলাদেশি প্রার্থী পেছনে পড়ে যান। বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ থেকে পাওয়া নম্বর দিয়ে তারা মাস্টার্স প্রোগ্রামে আবেদনই করতে পারেন না। 

ডা. তানিয়া বলেন, ভবিষ্যতের ডাক্তারদের শুধু চিকিৎসা শেখালেই চলবে না, তাদের যোগাযোগের দক্ষতাও (কমিউনিকেশন স্কিল) শেখাতে হবে। রোগীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়- সেটিও শেখাতে হবে।

ডা. খন্দকার মাহমুদুল হক বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটরা কানাডিয়ান মানদণ্ডে নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন করাতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরেন। বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েটদের অধিকাংশের স্কোরই 'সি' বা 'সি প্লাস' থাকে। কদাচিৎ 'বি' বা 'বি প্লাস' থাকে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষকদের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্যের কারণে বিদেশে এসে চিকিৎসকদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। 

ডা. খন্দকার মাহমুদ বিদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের ব্যাপারে আরো উদার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অভিবাসী চিকিৎসকদের ৫৫ শতাংশই চিকিৎসা পেশা থেকে ছিটকে গিয়ে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছেন। কানাডা সরকার এই ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক এইসব মেধা কানাডার স্বার্থে লাগাতে পারেন।

ডা. বীথিকা সেন তার আলোচনায় বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সংবেদনশীল, পেশাদার যোগাযোগ দক্ষতা সেই অর্থে শেখানো হয় না। ফলে বাংলাদেশি চিকিৎসকরা উন্নত বিশ্বে পড়াশোনা বা চাকরি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক চিকিৎসক কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে মেডিকেল কলেজের কারিক্যুলাম ঢেলে সাজানো দরকার।

ডা. বীথিকা আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোয় কী পড়ানো হয় সেগুলো খোঁজ করে সেইভাবে মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর নতুন অভিবাসীদের জন্য সরকারের সেটেলমেন্ট কর্মসূচির মতো চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তাব করেন।

তিনি বলেন, প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টে পেশাজীবীদের বিদেশি সার্টিফিকেট এবং অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দিতে একটি বিল উঠেছে। এটি দ্রুত পাস করে পেশাজীবীদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।