প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, সিন্ডিকেট করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও চাপ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাজি হননি বলে এখনও সিন্ডিকেট হতে পারেনি।

শনিবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে পাঁচ মাস। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপর যথেষ্ট চাপ ছিল। যারা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা ক্ষমতাবান। মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই অনেক চাপ আছে। অভিবাসন খাতে সিন্ডিকেট থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী চান না। তিনি চাইলে অনেক আগেই সিন্ডিকেট হয়ে যেতো। প্রধানমন্ত্রী চাননি বলেই হয়নি। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের বিরুদ্ধে যদি কিছু হয়, প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই তা ঠেকান।

‘সিন্ডিকেট অনুমোদন না দিয়ে প্রতিযোগিতা আইনানুযায়ী এবং মালয়েশিয়ার ১৩টি সোর্স কান্ট্রির মতো বাংলাদেশের সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী।

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তৃতা রাখেন অভিবাসন বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই'র সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, বায়রার সাবেক সভাপতি মো. নূর আলী, আবুল বাসার, সাবেক মহাসচিব রিয়াজুল ইসলাম, শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান।

গত ১৯ ডিসেম্বর সমঝোতা স্মারক সই (এমওইউ) সই হলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এখন পর্যন্ত খুলেনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিতে চায় দেশটি। কিন্তু তাদেরকে 'সিন্ডিকেট' বলছে বাকি এজেন্সিগুলো। ২০১৫ সালে ১০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়েছিল মালয়েশিয়া। ব্যাপক দুর্নীতির কারণে ওই চুক্তি বাতিল হয়েছে।

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, বলা হচ্ছে যে, ‘২৫টি এজেন্সিতে রাজি না হলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে না মালয়েশিয়া।’ মালয়েশিয়ায় প্ল্যান্টেশন, পাম, বনায়ন, সেবা ও ইলেক্ট্রনিক খাতে কর্মীর মারাত্মক সঙ্কট চলছে। তাদের সরকারের উপরও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে চাপ রয়েছে। কর্মী না নেওয়ার হুমকিতে ভয়ের কিছু নেই।

স্থায়ী কমিটির সভাপতি বলেন, নিরাপদ অভিবাসন, স্বল্প ব্যয় ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করে কর্মী পাঠাতে হবে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া ২৫টি এজেন্সি বাছাই করলে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। প্রশ্ন থাকলে স্বচ্ছ অভিবাসন হবে না। সিন্ডিকেটের কারণে যদি তেলের দাম বাড়ে, তাহলে সিন্ডিকেট হলে অভিবাসন ব্যয়ও বাড়বে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এমন সিন্ডিকেট হতে পারে।

মূল প্রবন্ধের বরাতে এ কে আজাদ বলেন, সবক্ষেত্রে প্রতারণা, নিযার্তনের শিকার বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীরা। সৌদি আরব যেতে কর্মী প্রতি এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা। কিন্তু নেওয়া হচ্ছে পাঁচ লাখ টাকা। মালয়েশিয়ায় যেতে নেওয়ার কথা ৩৫ হাজার টাকা। নেওয়া হচ্ছে চার লাখ টাকা।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়িয়েছেন, তাদের পাশে থাকার কথা জানিয়ে এ কে আজাদ বলেছেন, সংবাদমাধ্যম ন্যায়ের পক্ষে থাকবে। যাতে সিন্ডিকেট মুক্তভাবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়।

হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গার্মেন্টের পরই রেমিট্যান্স। রপ্তানি থেকে আসে ৫০ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স আসে ২৪ বিলিয়ন ডলার। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। যারা সিন্ডিকেট করে, তারা কম শক্তিশালী নয়। তারা অবৈধভাবে উপর্জিত টাকা অনেক জায়গায় বিতরণ করেন। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলে জনশক্তি ব্যবসায়ীরা সফল হবেন। সিন্ডিকেটের বাইরে কর্মী পাঠানো সম্ভব হলে কর্মীর সংখ্যা বাড়বে, রেমিট্যান্সও বাড়বে।

বায়রার সাবেক সভাপতি নূর আলী বলেছেন, সিন্ডিকেট হলে অভিবাসন ব্যয় বাড়বে। কর্মীরা আগেরবারের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এই মুহুর্তে দেশে ডলারের সঙ্কট চলছে। সিন্ডিকেট হলে ভিসা কেনাবেচায় দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হবে

সংগঠনের আরেক সাবেক সভাপতি আবুল বাসার বলেন, মালয়েশিয়া বাকি ১৩টি দেশ থেকে যেভাবে কর্মী নিচ্ছে, বাংলাদেশ থেকেও একই পদ্ধতিতে নিতে হবে। বাংলাদেশি কিছু এজেন্সি মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীনদের একাংশের সঙ্গে আঁতাত করে অতীতের মতো সিন্ডিকেট করতে চাইছে। সব বৈধ এজেন্সির জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখতে হবে।