এমন কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না যিনি ঘুরতে ভালোবাসেন না। হয়তো অনেকেই আছেন যারা সময়ের অভাবে ঘুরতে পারেন না। তবে ঘোরাঘুরির ইচ্ছা হয়তো সবার মনেই থাকে। আমিও ঘুরতে খুব ভালোবাসি। কিন্তু নানা কারণে আমার ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাওয়া কম হয়। গেলেও কাজের কারণেই যাওয়া হয়। তবে আমিও চাই এক দিন সব ব্যস্ততা ফেলে ঘুরতে যাব। হারিয়ে যাব প্রকৃতির রাজ্যে। সময় কাটাব নিজের মতো করে। এই তো ক'দিন আগে শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলাম। শুটিংয়ের কারণে সেখানে যেতে হয়েছে। 'নাকফুল' নামে একটি ছবির শুটিংয়ের জন্য টানা ২০ দিনের বেশি সময় সেখানে ছিলাম। চায়ের দেশ। ছবির মতো সুন্দর শ্রীমঙ্গল। ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে এমন জায়গা দেখতাম। তখন এখানে ঘুরতে আসতে মন চাইত। এখন তো বাস্তবেই দেখছি। এতদিন যা কল্পনায় ছিল তা বাস্তবে এসে চোখের সামনে ধরা দিয়েছে। মন খারাপ নিয়ে কেউ এখানে ঘুরতে এলে মুহূর্তেই তার মন ভালো হয়ে যাবে। চারদিকে ঘুরছি আর অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছি। যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। ওপরে বিস্তৃত নীলাভ আকাশ। এদিক-ওদিক তাকালেই চোখে পড়ে বর্ণিল সব পাখি। মসৃণ সবুজ চা বাগানের গালিচায় ছাওয়া উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলা, বনভূমি, চিড়িয়াখানা, গিরিখাদ, লেক, হাওর, ঝরনা- কী নেই এখানে। ঘন জঙ্গল, খনিজ গ্যাসকূপ আর আনারস, লেবু, পান ও রাবার বাগান দিয়ে সাজানো অদ্ভুত সুন্দর এই শ্রীমঙ্গল।
শুধু তাই নয়, বাংলাশের সবচেয়ে বেশি শীতপ্রধান অঞ্চল, সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রধান অঞ্চল হিসেবেও শ্রীমঙ্গল পরিচিত। এখানে এই বৃষ্টি আবার এই রোদ। চমৎকার এক আবহাওয়া। আমার মন জুড়ায়। গোটা শ্রীমঙ্গল যেন বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের নীলাভূমি। তাই তো শ্রীমঙ্গলের রূপে বিমুগ্ধ কানাডিয়ান লেখক অ্যান্টনি আর ডেল্টন একে 'একখণ্ড স্বর্গ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশখ্যাত শ্রীমঙ্গলে অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে চা বাগান। চা বাগানে প্রবেশ করা মাত্রই মনে হবে সত্যি এ যেন এক ভিন্ন পরিবেশ। চারপাশে কেবল সবুজের মেলা। চা পাতার সজীবতা কল্পনায় আপনাকে সবুজ করে দেবে।
মাইলের পর মাইল কেবল সবুজ আর সবুজ। কাটিং করা চা গাছগুলো এত শৃঙ্খলভাবে বসে আছে, কখনও মনে হয় সাগরের ঢেউ আবার কখনও মনে হয় বিশাল কোনো সবুজ মাঠ। মনে হবে, কোনো দক্ষ শিল্পী যেন মনের মাধুরী মিশিয়ে স্তরে স্তরে সবুজকে সাজিয়ে রেখেছেন। চা গাছের ফাঁকে ফাঁকে একটি বিশেষ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো ছায়াতরু, যার ডালপালা, শাখা-প্রশাখায় শুনতে পাবেন রংবেরঙের পাখির কলকাকলি, শহরের কলকারখানা, গাড়ির শব্দ, ব্যস্ততা ও কোলাহলে অভ্যস্তদের কাছে এটি বর্ণাতীত শ্রুতিমধুর লাগবে। মনে হবে স্বর্গের এক আমেজ। সিলেট বিভাগের সব স্থানই মনে হয় ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এর আগে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়েছিলাম। 'হূদিতা' ছবির একটি গানের শুটিংয়ের কারণে সেখানে যাওয়া হয়েছে। ঢাকায় ফিরে বেশ কিছুদিন হাওরের সেই দৃশ্য চোখ থেকে সরাতে পারিনি- এমন সুন্দর জায়গা! দেখেই নিজের ভেতরে প্রশান্তি চলে এসেছে। গানের শুটিংয়ে এখানে এলেও মনে হয়েছিল, পিকনিকে গিয়েছিলাম। শুটিং ইউনিটের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দারুণ সময় কেটেছে সেখানে। নানা জাতের পাখির কলতান আর হিজল বনের অপরূপ সৌন্দর্যের সমাহার দেখেছি। শুটিংয়ের পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য দারুণ উপভোগ করেছি। মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেতাম অন্য জগতে। অনেকেই নিজের দেশের সব জায়গায় না গিয়ে দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তাঁদের উদ্দেশে বলব, আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ দেশে অনেক স্থান আছে, যা বিদেশের মাটিতে নেই। প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে সেসব স্থানে গেলে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে।
যে কোনো জায়গায় ঘুরতে গেলে সেখানকার মানুষজন, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। স্থানীয় খাবারদাবার খাই। তাঁদের সঙ্গে মিশতেও ভালো লাগে। যদিও শুটিংয়ে ব্যস্ততায় সময় খুব কমই পাই। শুটিংয়ের অবসরে যেটুকু সময় পাই, তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।