ঘড়ির কাঁটা রাত ২টা ছুঁই ছুঁই। কিন্তু মাসকাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আলোয় তা যেন মিথ্যা মনে হচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ছুটল আল মৌজের দিকে। রাস্তার দু'পাশে অনেক পতাকা। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা দেখলাম না একটিও! বাংলাদেশে এই দুই দলের হাজার হাজার পতাকা দেখা অভ্যস্ত চোখে বিস্ময় জাগল, ওমানে কি বিশ্বকাপের উত্তাপ নেই! এই ঘোর নিয়ে শুরু করলাম নতুন এক সকাল। ক্যালেন্ডারের পাতায় যা ১ ডিসেম্বর, ২০২২।

আল মৌজ গেস্ট হাউস থেকে গাড়ি ছুটতে থাকল উত্তরে। এক পাশে চোখ ঘোরালে আরব সাগর। অন্য পাশে আধুনিক সব স্থাপনার নান্দনিক শহর। তবে সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের মতো বিশাল উঁচু অট্টালিকা নেই ওমানে। চার থেকে ছয়তলার ভবন বেশি। ছাদে ছাদে পতাকার পরিবর্তে এখানে বিশ্বকাপের উন্মাদনা অন্য রং-ঢংয়ে, ক্রমশ স্পষ্ট হয়।

মাসকাট বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন পয়েন্টের সামনে এসে দাঁড়ালেন ইমিগ্রেশন পুলিশের ইয়াছিন। একবার আরবি, আরেকবার বাংলা ভাষায় বলছিলেন, সবাই লাইনে দাঁড়াও। যাদের ওমানের ভিসা তাঁরা ডানে। যাদের ভিজিট ভিসা তাঁরা বামে। গুনে দেখি ডানের চেয়ে বামের লাইনেই মানুষ বেশি। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটিতে এসেছেন বাংলাদেশি যাত্রী শতাধিক। ইমিগ্রেশন পয়েন্টে দেখলাম তাঁদের বেশিরভাগই ভিজিট ভিসার যাত্রী। অর্থাৎ কাতার কিংবা দুবাইয়ের পথে মাঝে ভিজিট ভিসায় ঢুকেছেন ওমানে।

তানভীর ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের মালিক মো. শাহজাহান জানান, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ওমান এয়ার নতুন দুটি ফ্লাইট চালু করেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সব এয়ারলাইন বাড়িয়ে দিয়েছে ভাড়াও। আগে ওমান থেকে ৫০০ মাইল দূরের কাতারে যেতে বাংলাদেশি মুদ্রায় ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।

বিশ্বকাপের সময়টাতে ভিসা প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে ওমান সরকার। কেউ কাতার যাওয়ার আগে চাইলে ঘুরতে পারবেন ওমান। খেলা দেখার আগে শান্ত দেশ ওমান দেখার সুযোগ পর্যটক হয়ে। এতে চাঙ্গা ওমানেরও পর্যটন খাত।
প্রতিটি পাম্প স্টেশনে সুপারশপ। তেল নিতে গাড়ি যখন থামে তখন সুপারশপে ভালো সময় কাটে ওমানিদের। ভারতের নাগরিকদের ভালো প্রভাব আছে এখানে। খাবার, পোশাক ও জীবনযাপনে স্থানীয়দের অনেকে প্রভাবিত হচ্ছে ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা। ৫৪ লাখ বাসিন্দার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী ভারতের। বাংলাদেশি আছে ৭ থেকে ৮ লাখ।

গাড়ি ছুটে এলো আল খেরার বিন আতিক হোটেলে। সেখানে রয়েছে বিশেষ এক খাবার। মাটির নিচে গর্ত করে চারপাশে পাথর দিয়ে স্বতন্ত্র এক কৌশলে রান্না করা সুহা। মাংস থেকে ফ্যাট আলাদা করে রান্না করা এই খাবার ওমানের বাসিন্দাদের ট্র্যাডিশনাল। আমরা যাকে খাসির মাংস বলি সেটিই এখানে সুহা। একেকজনের জন্য প্লেট প্রায় ১০০ গ্রাম ওজনের, বললেন কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা নূর আহমেদ। বিন আতিকে বসেই সুহা সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছিলেন তিনি। কথা বলতে বলতে এলেন ওয়েটার। তাঁর বাংলা বলা শুনে চমকে গেলাম সবাই। জানালেন বাড়ি সিলেটে। এই দোকানে চাকরি নিয়েছেন তিন মাস হলো। বিশ্বকাপ উপলক্ষে তাঁর মতো নতুন ওয়েটার আছেন আরও ১৫ জন, যাঁদের বেশিরভাগই বাঙালি। তিন মাসের চুক্তিতে। বিশ্বকাপ শেষ হলে যোগ দেবেন নতুন কোনো চাকরিতে।

বাংলাদেশি মুদ্রার চেয়ে ২৭০ গুণ শক্তিশালী ওমানের রিয়েল। তাই বাংলাদেশিদের পছন্দের তালিকায় আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ। স্থানীয় গাড়িচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানালেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভিসার নিয়মে পরিবর্তন আনায় প্রতিদিন বাড়ছে বাংলাদেশির সংখ্যা। তিন মাসের ভিজিট ভিসা নিয়ে এসে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ তাদের।

গত ৫০ বছরে আমূল বদলে গেছে ওমান। তেল বিক্রি করে ধু-ধু বালুচরে গড়েছে তারা সুপারমার্কেট, হাসপাতাল কিংবা পার্ক। বালুর বুক চিরে শত শত মাইল মসৃণ সড়কের ব্যবস্থাপনাও মসৃণ হওয়ায় গ্রামের সবজি, মাছ, ফলমূল ও পশু সহজলভ্য হচ্ছে শহরে। প্রতি কিলোগ্রাম ছাগলের মাংসের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় পড়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। স্থানীয় জাতের একটি ছাগল গড়ে ২০ থেকে ২২ কিলোগ্রাম ওজনের হয়।

মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিশ্বকাপের উত্তাপ ওমানের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল আল খুররাম এলাকায় গিয়ে। গাড়ি ছুটছে আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে উড়তে দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের পতাকা। সব দেশের পতাকাই চোখে পড়েছে, স্বাগতিক কাতারের পতাকা একটু বেশিই।

আল মাওয়া স্ট্রিট হয়ে গাড়ি ছুটছে সুলতান প্যালেসে। দুই পাশে পাহাড়। নেই সবুজের ছিটেফোঁটাও। তবে রুক্ষ পাহাড়ও খুব যত্ন করে কেটেছে ওমানিরা। পাহাড়ের মাঝে পর্যটন স্পট। চোখ আটকে গেল আল সাদাব স্ট্রিটে এসে। পাহাড় ও আরব সাগর এখানে পাতিয়েছে বন্ধুত্ব। দুই পাশে পাহাড়ের মাঝে আরব সাগর তৈরি করেছে অনন্য সুন্দর এক পরিবেশ। ওমানের নাগরিক ওমর আল জাবের বললেন, 'বিশ্বকাপ কাতারে হলেও ওমানের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে এটি। অনেকেই এখানকার পাঁচতারকা মানের হোটেলে থেকে, খেলা দেখতে আবার চলে যাচ্ছে কাতারে। আপনি বিলাসবহুল কোনো হোটেলে এখন থাকতে চাইলেও পাবেন না রুম।'

তাঁর কথার রেশ কাটতে না কাটতে গাড়ি এলো পাঁচতারকা মানের হোটেল শেরাটনে। বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল মানুষের চাপ। পাশেই সুলতান প্যালেস। সেখানে গিয়ে মনে হলো জীবনের সব সৌন্দর্য যেন স্বাগত জানাতে বসে আছে আপনার জন্য। সুলতান প্যালেসে প্রবেশের আগমুহূর্তে পত পত করে উড়তে দেখা গেল কাতার, সৌদি আরব, ইরানের পতাকা। ওমানের পতাকার সঙ্গে ওড়ানো হয়েছে বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বী এই তিন মুসলিম দেশের পতাকা।

সুলতানের বাড়ি বলে কথা। মাঝখানে প্রাসাদ। দুই পাশে বিশাল প্রবেশতোরণ। বিভিন্ন দেশের পর্যটক দেখা গেল সুলতান প্যালেসে। বিশ্বকাপের উন্মাদনার ছোঁয়া এখানে। মেসি ও নেইমারের ১০ নম্বর জার্সি পরে ছবি তুলতে দেখা হলো ঘানা থেকে আসা এক দম্পতিকে।

কেমন জার্সি বিক্রি হয়েছে ওমানে? জিজ্ঞাসার জবাবে করাচি স্টোর নামে দোকানের পাকিস্তানি মালিক শোয়েব আকতার জানালেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষে অন্তত ৮শ পতাকা বিক্রি করেছেন তিনি। এর অর্ধেক ওমানের পতাকা। এখন বিশ্বকাপে না খেললেও এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে একদিন বিশ্বকাপ খেলবে তারাও। বললেন, 'জাতীয়তাবাদ এখানকার মানুষের মধ্যে প্রবল।'