স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমণের প্রতিবাদে বাম ছাত্রজোটের কুশপুত্তলিকা দাহ কর্মসূচিতে  ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দ্বীপ এলাকায় এই হামলা চালায় কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহানগর উত্তরের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে কয়েকজন ফটো সাংবাদিকসহ জোটের অন্তত ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকেলে নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরোধীতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে বাম ছাত্রজোটের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। তবে সকাল থেকে রাজু ভাস্কর্য এলাকায় অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে ছাত্রজোটের ৩০ থেকে ৪০ জন নেতাকর্মী টিএসসি চত্ত্বর থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার হয়ে আবার টিএসসি ফিরে এসে ডাসের সামনে নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা দাহ এবং ভারতবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী কুশপুত্তলিকার আগুন নেভানোর জন্য দূর থেকে পানি ছুঁড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা জোটের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে ইট পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। জোটের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে ছাত্রলীগ সংঘবদ্ধ হয়ে আবারো তাদের উপর হামলা চালালে দুইপক্ষই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

হামলার একটি মুহূর্ত -সমকাল

এসময় ছাত্রলীগের কর্মীরা বাঁশ, লাঠি ও হেলমেট দিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। এছাড়াও রাস্তার পাশের ডাবের দোকান থেকে ডাব ছিনিয়ে নিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা জোটের নেতাকর্মীদের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক রুবেল রশিদ, মানবজমিনের ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ, ইউএনবির ফটো সাংবাদিক জাবেদ হাসনাইন চৌধুরীসহ জোটের অন্তত ২৫ জন আহত হয়। পরে আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হামলায় আহতরা হলেন- ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার, ঢাবি শাখার সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান সাদিক, ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক তমা বর্মন, ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুমাইয়া সেতু, কেন্দ্রীয় নেতা আসমানী আশা, ঢাবি শাখার নেতা মেঘমল্লার বসু, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাবি শাখার সভাপতি জাবির আহমেদ জুবেলসহ প্রগতিশীল ছাত্রজোটের অন্তত ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।

বাম ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার রাজ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ইমন খান জীবন, সহ-সভাপতি মিলন হোসেন, বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মেহেদি হাসান শান্ত, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাহিম হাসান, এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ সাজুর নেতৃত্বে এ হামলা হয়।

হামলায় আহত একজন -সমকাল

হামলায় আহত সাংবাদিক জীবন আহমেদ বলেন, আমার ক্যামেরাকে লক্ষ্য করে হেলমেট দিয়ে আঘাত করা হয়। ক্যামেরা রক্ষা করতে গিয়ে বা-হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছি।

হামলার পর সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয় গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা এ দেশের ছাত্র-জনতা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে প্রতিহত করবো। আমাদের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা হয়েছে। সে আতঙ্ক এখনও বিরাজ করছে। এ ঘটনার বিচার হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

হামলা শেষে রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। সেখানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, নামসর্বস্ব কিছু ছাত্র সংগঠন, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২০ থেকে ৩০ জন নিয়ে এসে আন্দোলন করে। তাদের প্রত্যেকের বয়স ৩০ থেকে ৪০ জনের ওপর। এরা পাকিস্তানের কাছ থেকে টাকা এনে পাকিস্তানের রাজত্ব কায়েম করবে, ষড়যন্ত্র করবে, তা হতে দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উদযাপন করছি, যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব নতুনভাবে চিনছে, তখন তাদের চুলকানি শুরু হয়ে গেছে। আজকে যখন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র যখন ঢাকায় উপস্থিত হবেন। তার আগ মুহূর্তে তারা বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত শুরু করেছে। চক্রান্ত করার কোন সুযোগ আমরা তাদের দিব না।

এর আগে, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা বানিয়ে তা দাহের আগেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী এসে তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা জানায়, সকাল সাড়ে ১১টার সময় টিএসসির সঞ্জীব চত্বরে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা কর্মসূচী পালনের জন্য নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা বানিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ছাত্রলীগের ২৫ থেকে ৩০ জন নেতাকর্মী এসে কুশপুত্তলিকা ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টিএসসি থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শুরুর আগে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রইচ উদ্দিন তাদের ক্যাম্পাসের মধ্যে থেকেই কর্মসূচী শেষ করার অনুরোধ জানান।

ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ফ্যাসিস্ট নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের প্রতিবাদে কুশপুত্তলিকা দাহের আগেই সেটা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আমরা এর নিন্দা জানাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, নরেন্দ্র মোদি কোনো ব্যক্তি নন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এ ধরনের কর্মসূচী পালন করলে ছাত্রলীগ তাদের বাধা দেবে, এটাই স্বাভাবিক।