চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। কাঙ্ক্ষিত পানি নেই চলনবিলে। বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলে বর্ষা বা বন্যার পানি না থাকায় মাঠ-ঘাট শুকিয়ে যাচ্ছে। যাতে করে চলতি রোপা আমনের আবাদের কৃষকদের কৃষিকাজে ছন্দপতন ঘটছে। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসময়ে বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু বিরুপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাবে চলনবিলাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় পরিবর্তন আসছে।

চলনবিল অঞ্চলে জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবে এখন পরিবেশবাদীদেরও ভাবিয়ে তুলছে। তারা বলছেন, একসময়ে চলমান জল প্রবাহের এই চলনবিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এরই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এখন।

নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার রুহাই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন বলেন, তিন থেকে সাড়ে তিন দশক পূর্বেও চলনবিলের মাঠ-ঘাট, নদীনালা, খাল-বিল জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে আষাঢ়ের প্রথম পানিতে ভরে থাকতো। তখন পানির ওপর নির্ভর করেই নৈসর্গিক চলনবিলে অপরুপ সাঁজে সেঁজে উঠতো।

‌‘একসময় চলনবিল পানির ওপর নির্ভর করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া ও নওগাঁর আত্রাই এলাকার কৃষক প্রায় লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে সাদা দিঘা, বরণ, মাটিয়া গড়ল, শরশরিয়া, লাউজাল, লালদিঘা সহ বিভিন্ন জাতের বোনা আমণ ধানের আবাদ করতেন। যে ধানের চাল ছিল যেমন পুষ্ঠিকর ও আবাদে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কম হতো।’ এমনটি জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ লুৎফুন্নাহার লুনা।

‘এছাড়া ১৯৮৬, ৮৭, ৮৮, ২০০৪ পর্যন্ত অস্বাভাবিক বন্যার পর ১৮ বছরেও চলনবিলাঞ্চলে স্বাভাবিক বন্যাই হয়নি বললেই চলে। আশির দশক থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে চলনবিল এলাকায় ৭০০ থেকে ৭৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বন্যার পানির বিস্তৃতি থাকলেও এখন ভরা মৌসুমে পানির বিস্তৃতি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নয়। গত এক দশকে তাও নেই বললেই চলে।’ যোগ করেন তিনি।

চলনবিলের পানির ওপর নির্ভর করে ৫ থেকে ৬ মাস জেলেরা মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকতেন। মূলত তারা এখন বেকার। আর স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একসময় চলনবিলের দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ এলাকার চাহিদা পূরণ করতে সে সময়ে বড় একটা ভূমিকা রাখতো। চলনবিলের কৈ, শিং, মাগুর, পাবদা, ট্যাংরাসহ ৩০-৩৫ প্রজাতির মাছ এলাকার মানুষের মাছের চাহিদা দেশের বিভিন্ন শহরে উচ্চ মূল্যে বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমান অবস্থা ১০-১৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় মাছের উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ ভাগ কমে গেছে।

আবার চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খড়স্রোতা নদী গুমানী, আত্রাই, গুড়, করতোয়া, বড়াল, ভদ্রাবতী, চিকনাই, বানগঙ্গা, বারনই, তেলকুপি, চেচুয়ার সহ ৩৯টি নদী নিমাইচড়া খাল, ভাসানীর খাল, হক সাহেবের খাল, উলিপুরের খাল, কিশোর খালী খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলার খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাল, গোহালা খাল, গাঁঢ়াবাড়ী খাল, বিদ্যাধার খাল, দারুখালী খাল, বিলসূর্য্য, কুমারডাঙ্গা, কিনু সরকারের ধর, পানাউল্লার খাল, জানিগাছার জলা ও কাটেঙ্গার খালের আর বর্তমানে চলনবিলের মাঠ-ঘাটে নেই কাঙ্ক্ষিত পানি।

চলনবিলে নির্দিষ্ট সময়ে পানি না আসার কারণ প্রসঙ্গে চলনবিল বাঁচাও আন্দোলন নামের সংগঠনের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও অ-পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, যত্রতত্র পুকুর খনন, বাঁধ নির্মাণ, দখল অন্যতম কারণ। আর এক যুগ চলনবিলে আষাঢ় মাসেও পানি শূন্য থাকাটা জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত। তাই চলনবিলকে বাঁচাতে কার্যকর উদ্দ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমান সময়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরির্তনের প্রভাব চলনবিল এলাকায়ও লক্ষণীয়। তাই চলনবিলের মানুষের অনেকেরই পেশার পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন জীবন-জীবিকার তাগিদেই।