বেকার হওয়ায় বাড়িতে বসেই সময় কাটত আরমানের। প্রায়ই বকা খেতেন পরিবারের সদস্যসহ গ্রামের মুরুব্বিদের কাছে। চেষ্টা থাকলেও কাজ করার সুযোগ পাননি। সেই যুবক এখন সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। দূর হয়েছে পরিবারের কষ্ট। রিকশা চালিয়ে আয় করছেন। একটি উদ্যোগ বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন। আরমানের মতো এলাকার আরও অনেকের কষ্ট লাঘব করেছে একটি সেতু ও সড়ক।

সেতুটি নাটোরের গুরুদাসপুরের বিলসায়, নাম 'মা জননী'। পাশেই গুরুদাসপুর-খুবজিপুর-তাড়াশ গণমৈত্রী সড়ক। এ দুটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর পাল্টে গেছে চলনবিলের মানুষের জীবনমান। অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এলাকায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা বাড়ায় কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারও মানুষের। নৌকায় করে পর্যটকরা ঘুরে বেড়ান বিলে, উপভোগ করেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

অটোচালক রমজান আলী বলছিলেন, বছরের প্রায় ছয় মাস বসে কাটাতে হতো। বর্ষায় মাছ ধরে ও আড্ডা দিয়ে সময় কেটে যেত। এখন ইজিবাইক চালিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। বাড়ির মেয়েরাও দোকান বসিয়ে আয় করছে। দিনমজুর আব্বাস আলী বলেন, চাষাবাদের পাশাপাশি ফুচকা বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে। গ্রামের অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। জামেলা বেগমের ভাষ্য, বাড়ির পাশে সড়ক ও সেতু হওয়ায় তাঁদের ভাগ্য ফিরেছে।

চলনবিলের হূৎপিণ্ড বলা হয় বিলসাকে। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাজুড়ে রয়েছে এর বিস্তৃতি। এলাকাটি একসময় ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত। দুর্গম হওয়ায় মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না। বর্ষায় নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। ২০১৩ সালের দিকে মা জননী সেতু ও গণমৈত্রী সড়ক নির্মাণের পর বদলে গেছে এলাকার দৃশ্য। তিন কিলোমিটার ডুবন্ত সড়ক এখন পর্যটকদের আগ্রহের শীর্ষে। স্থানীয়রা বলছেন, গুমানী নদীতে একটি সেতু হলে এলাকার মানুষের আর কষ্ট থাকবে না।

ইউপি সদস্য হাসান আলী বলেন, এখন বিলসা ও রুহাই গ্রামে আর কেউ বেকার নেই। এলাকার সৌন্দর্য বাড়ায় ভ্রমণপিপাসুরা আসছেন।

নাটোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম জানান, ১৭৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। ১০ কিলোমিটার গণমৈত্রী সড়কের তিন কিলোমিটার ডুবন্ত সড়ক ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে আরও কিছু পরিকল্পনা আছে।

ইউএনও তমাল হোসেন বলেন, বিলসার সেতু এলাকায় গেলে চলনবিলের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটক আসায় এলাকায় কাজের সুযোগ বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হয়েছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠে পরিণত হয় চলনবিল। সেখানে রবিশস্যের আবাদ হয়। উৎপাদিত হয় টনকে টন মধু। এ সেতু এখন এলাকার মানুষের সৌভাগ্যের সোপান। বেকার জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস বলেন, 'এলাকায় নিদারুণ দুর্ভোগে শৈশবসহ যৌবনের অর্ধেক কেটেছে। শহরে আসতে যে কষ্ট, সেই অনুভব থেকেই সেতু ও সড়কের উদ্যোগ। চলনবিল ঘিরে থাকা চার জেলার যোগাযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চলনবিলের পানিও সংরক্ষণ করা হবে। সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।'