দিনাজপুরে বিতর্ক: ছোট শহরের বড় উৎসব

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯      

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর

উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ -সমকাল

ছোট শহর দিনাজপুর, সেই শহরের ছোটরাই আয়োজন করল এক বড় উৎসবের। শুধু বিতর্ককে কেন্দ্র করে এত বড় উৎসব আয়োজন করা যে সম্ভব, তা শহরবাসী দেখেছে বিস্ময় নিয়ে। আয়োজকদের দাবি ঢাকার বাইরে বিতর্কের প্রথম জাতীয় মানের উৎসবটি হয়ে গেল দিনাজপুরে। যেখানে অংশগ্রহণ করেছেন দেশের ২০টি জেলার প্রায় ৬৫০ জন তরুণ বিতার্কিক এবং বিতর্কের এই উৎসব ঘিরে দিনাজপুর শহরে বসে গিয়েছিল মিলনমেলা।

যুক্তিবাদী মনন নিয়ে যথাযথ তথ্য ও তত্ত্ব উপস্থাপনের সঙ্গে নিজের কথা বলা এবং বাচনভঙ্গিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই প্রকৃতপক্ষে বিতর্ক শিল্পের কাজ। বিতর্ক চর্চা একজন বিতর্কিকের মধ্যে গড়ে তোলে অনন্য ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণ এবং কোনো বিষয় সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা।
উৎসবের উদ্বোধনীতে জাতীয় সংগীত বাজার সময় দাঁড়িয়ে সন্মান জানান অতিথিরা -সমকাল
শুক্রবার, ছুটির দিন। ঘড়ির কাঁটায় তখনও ৮টা বাজেনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি দিনাজপুর জেলা কার্যালয়ে আসতে শুরু করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়সহ দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসে রিজার্ভ বাসে করে। আবার কেউ এসেছে মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেটকারে করেও।

হসকাল ৯ টার আগেই শিশু একাডেমির প্রাঙ্গন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে শিক্ষার্থীদের পদাচারণায়, এ যেন এক তারুণ্যের উচ্ছাস মঞ্চ। আগত শিক্ষার্থীদের সবারই আসার উদ্দেশ্য একটি- দিনাজপুর জাতীয় বিতর্ক উৎসবে যোগদান করা। দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির আয়োজনে 'উত্তরে আজ যুক্তির রেশ, দেখবে সারা বাংলাদেশ' এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো এ বিতর্ক উৎসব অনুষ্ঠিত হলো উত্তরের এই জেলায়।

শুক্রবার সকাল ৯ টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি দিনাজপুর জেলা শাখা কার্যালয়ে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার। পরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যও রাখেন তিনি। 
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার -সমকাল
দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি এম. গাওসুল আজম শান্তর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা জোজ কোর্টের আইনজীবী শামসুর রহমান পারভেজ, দিনাজপুর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহজাহান আলী সাজু, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ভাবনার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, দিনাজপুর জেলার অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশিকা আকবর তৃষা, দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবু ওয়াজেদ শাহ সৌমিক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির সহ-সভাপতি অম্লান মোস্তাফিজ ও যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক জিনিয়া আক্তার সুইটি।

উৎসবে দিনাজপুর জেলাসহ পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট, ঢাকা, নাটোর, নওগাঁসহ ২০টি জেলার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও আলাদাভাবে দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। 

অনুষ্ঠানে দলগত বিতর্ক প্রতিযোগিতা (সনাতনী ও সংসদীয়) বিতর্কের ১০টি দল, বারোয়ারি আঞ্চলিক, রম্য এবং প্ল্যানচেট বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে ক্যুইজ প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহন করে। এছাড়াও দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বিতর্কের কর্মশালা। যেখানে বিতর্কের বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। ছিল জনবক্তৃতা প্রতিযোগিতা ও বিশেষ আকর্ষণের 'মিট দ্যা সেলিব্রেটিস'। এছাড়াও আগের দিন বৃহস্পতিবারে ছিল সনাতনী ও সংসদীয় বিতর্কের আয়োজন। যেখানে ৮টি করে ১৬টি দলের সদস্যরা অংশগ্রহণ করে।

বিতর্ক উৎসবে আগত গাইবান্ধা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, 'আমরা গাইবান্ধা থেকে এখানে ১৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছি। এখানে এসে বিতর্কের বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করছে শিক্ষার্থীরা।' 

ঠাকুরগাঁও বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা জানান, শুধুমাত্র ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এখানে অংশগ্রহণ করছে ২৮ জন শিক্ষার্থী। এছাড়াও ঠাকুরগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও অন্যান্য বিদ্যালয় থেকেও এখানে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। 
নিজের বক্তব্য রাখছে  বিতর্ক উৎসবে অংশগ্রহণকারী এক শিক্ষার্থী -সমকাল
সৈয়দপুর থেকে আসা সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এহসানুল হক বলেন, আমি আমার নাতি মুহিদকে নিয়ে এখানে এসেছি। সে গাইবান্ধা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এখানে এসে ভালই লাগছে, শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখতে পারছে। এই ধারা চলমান থাকলে একদিন এই অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা বিতর্কে বেশ সুনাম অর্জন করবে।

দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির সহ-সভাপতি অম্লান মোস্তাফিজ জানান, বিতর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে, বিতর্ককে সবার মাঝে ছডিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ২০১৭ সালে গঠিত হয়েছিল দিনাজপুর ভিত্তিক এ বিতর্ক-সংগঠনটি। মূলত দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম এটি, যেখানে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নিজেকে একজন বিতার্কিক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়। তৃণমূল পর্যায় থেকে বিতার্কিক তৈরি করাই দিনাজপুর ডিবেটিং সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে গত বছর অত্যন্ত সফলভাবে আয়োজিত হয়েছিল 'দিনাজপুর বিতর্ক উৎসব ২০১৮' যার স্লোগান ছিল 'উত্তরে আজ বইছে, যুক্তির দখিনা হাওয়া।'