১৪ বছর পর রংপুরে বিদিশা, এরশাদের ছবি জড়িয়ে কান্না

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০   

রংপুর অফিস

ছেলেকে নিয়ে এরশাদের কবর জিয়ারতের সময়ও কান্নায় ভেঙে পড়েন বিদিশা -সমকাল

ছেলেকে নিয়ে এরশাদের কবর জিয়ারতের সময়ও কান্নায় ভেঙে পড়েন বিদিশা -সমকাল

রাজনীতিতে প্রবেশের ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদ। এরশাদের করব জিয়ারত শেষে রাজনীতির জন্য সারাদেশ ভ্রমণের কথা জানিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ ১৪ বছর পর জাপা’র প্রয়াত চেয়ারম্যান এরশাদের রংপুরস্থ পল্লী নিবাস বাসভবনে আসেন বিদিশা এরশাদ। ছেলে এরিক এরশাদকে নিয়ে প্রবেশ করেন বাড়িটিতে। বাড়িতে প্রবেশের পর নিচ তলায় এরশাদের ছবিকে জড়িয়ে কেঁদে ওঠেন এরিক এরশাদ ও তার মা বিদিশা। এরপর দ্বিতীয় তলায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এরিক।

তিনি বলেন, আমি আমার মাকে নিয়ে রংপুরে এসেছি বাবার কবর জিয়ারত করার জন্য। আমার অনেক আগেই আসার কথা ছিল, কিন্তু অনেক বাধার কারণে আসতে পারিনি। ফোন করে আমাকে অনেক হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যেন আমি রংপুরে না আসি। এবার আমরা কৌশল করে এসেছি। আমার মাকে আব্বা অনেক ভালোবাসতেন, তাই বাবার কবর দেখাতে মাকে নিয়ে এসেছি।

এরিক বলেন, রংপুরের মানুষ আমার আব্বার পাশে ছিলেন। তারা আমার পাশেও থাকবেন এবং আব্বার কবর দেখে রাখবেন। এটি রংপুরবাসীকে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম।

সাংবাদিকদের বিদিশা এরশাদ বলেন, রাজনীতি করতে অনেক সাহসের প্রয়োজন। আমি বিদিশা, আমার হাতে পয়সা নেই তবে আমার সাহস হচ্ছে আমার সন্তান। আমি আমার সন্তানের বাবার কাছে অনেক কিছু শিখেছি। মানুষের কাছে যাওয়া, কথা বলা শিখেছি। রংপুরের মানুষের ঘরে ঘরে আমাকে নিয়ে যেতেন তিনি। এই রংপুর থেকে রাজনীতি শিখেছি। আমি কিছুই ভূলি নাই।

রাজনীতিতে আসার বিষয়ে বিদিশা বলেন, আমি কথা দিচ্ছি রংপুরের মানুষের পাশে থাকবো। রংপুরের মানুষ চাইলে আমি রাজনীতিতে আসবো, না হলে নয়। তবে রাজনীতি আজ হোক কাল হোক আমি করবো। রংপুরে এরশাদ সাহেবের কবর জিয়ারত করে দোয়া নিতে এসেছি। এরপর আমি গোটা দেশ ঘুরবো।

তিনি আরও বলেন, এরশাদ সাহেবের লাশ পর্যন্ত আমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। রংপুরে আসা তো বিশাল যুদ্ধ ছিল আমার কাছে। এর মধ্যে বিমানের ৫-৬ বার টিকেট চেইঞ্জ করেছি। অনেকে আমার সঙ্গে রংপুরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, শেষ মুহূতে তারা আসতে পারেননি। সব সময় তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। জাতীয় পার্টির যারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এটি একটি দলের সুষ্ঠু রাজনীতি হতে পারে না। এরশাদ সাহেব যাদের হাতে দল দিয়ে গেছেন তারা সরকারের বিরোধীতা করুক কিংবা সহায়তা করুক এটা তাদের কাজ। কিন্তু তাদের ঘুম থেকে উঠে একটাই কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার পেছনে লাগা।

বিদিশা আরও বলেন, ২০০৫ সালের পর থেকে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে আমার কম দেখা হয়েছে। এরপর আমি মধ্য বয়সী থেকে এখন বৃদ্ধ বয়সের দিকে যাচ্ছি। কুচক্রী মহল আমার চরিত্র নিয়ে এখনও কথা বলে। তারা একবার চিন্তা করে না আমি যদি মুখ খুলি তাদের ঘর-সংসার কোথায় যাবে।

বিদিশা এরশাদ বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পর রংপুরে আসলাম। যেদিন এরশাদ সাহেবের সঙ্গে এরিককে নিয়ে রংপুরের মাটিতে পা রাখি, রাস্তার দু’পাশে ফুলে ফুলে মানুষ আমাকে বরণ করে নিয়েছিলেন। অনেক শখ করে এরশাদ সাহেব আমাকে বিয়ে করেছিলেন। সুখের সংসার ছিল আমাদের এই সন্তানটিকে নিয়ে। কিন্তু সেটি সহ্য হয়নি অনেকের। কারণ এটি রাজনৈতিক পরিবার ছিল, আমরা প্রাসাদ রাজনীতির শিকার।

তিনি বলেন, সব সময় এরশাদ সাহেবকে একটি গ্রুপ ভূল বোঝানো ও আমাদের মধ্যে দুরুত্ব তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। তাদের জন্য আমরা সংসার করতে পারিনি। আজও সেই গ্রুপটি সক্রিয় আছে। তারা এখন পাগল হয়েছে এরিকের সম্পদ লুটপাট করার জন্য। এরিকের ট্রাস্টে কত সম্পদ আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরিকের কোন কিছুই এরিকের কাছে নেই, সব দখল হয়ে গেছে। সবাই দখলের জন্য ব্যস্ত হয়ে গেছে। কেউ এই প্রতিবন্ধী বাচ্চার জন্য চিন্তা করে না।

এ সময় বিএনএ জোটের সভাপতি সেকেন্দার আলী মনি, মুখপাত্র শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, মহাসচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, সমন্বয়কারী আখতার হোসেন, এরশাদ ট্রাস্টের পরিচালক ও এরিক এরশাদের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাড. কাজী রুবায়েত হোসেন, ট্রাস্টের প্রেস সচিব ও বিদিশা এরশাদের একান্ত সহকারী সায়েম সাকলায়েন সজীব উপস্থিত ছিলেন।

এরপর এরিক এরশাদ, বিদিশা এরশাদ তাদের সফর সঙ্গীদের নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তারা। এরিক এরশাদ তার বাবার করবে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলেন, বাবা মাকে নিয়ে এসেছি। তুমি দেখতে চেয়ছিলে না। মা আমার সাথে এসেছে।

বিদিশা এরশাদ কবরের মাটি মাথায় লাগিয়ে ছেলে এরিক এরশাদকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। সোমবার সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে সৈয়দপুরে নেমে কবর জিয়ারত শেষে ঢাকায় ফিরে যান তারা।