প্রত্ননাটক 'মহাস্থান'

হাজার বছরের পথে

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

দীপন নন্দী, মহাস্থানগড় (বগুড়া) থেকে

মানুষ আসছে গ্রামের আলপথ ধরে। আসছে দল বেঁধে নাটক দেখতে-যে নাটকে উঠে এসেছে আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। এমন দৃশ্য দেখা গেল গতকাল শুক্রবার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানগড়ে। দেশের তৃতীয় প্রত্ননাটক 'মহাস্থান' প্রদর্শিত হলো সেখানকার ভাসুবিহারের প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে। নাটক দেখলেন আর হাজার বছর আগের পথে হাঁটলেন বগুড়া এবং আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে আসা দর্শকরা।

প্রায় দুই বছরের মহড়ার পর মঞ্চস্থ হয়েছে প্রত্ননাটক 'মহাস্থান'-যাতে রয়েছে অতীতের ওই সময়ের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের নানা দিক। দেশের সবচেয়ে বড় এ প্রত্ননাটকের মঞ্চায়ন উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নাট্যজন আতাউর রহমান ও অধ্যাপক আবদুস সেলিম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন, বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গাজীউর রহমান।

ড. সেলিম মোজাহারের লেখা এ নাটক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রযোজনা করেছে শিল্পকলা একাডেমি। নাটকের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় রয়েছেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। নাটকটির দ্বিতীয় মঞ্চায়ন হবে একই স্থানে আজ শনিবার।

গতকাল নাটকের মঞ্চায়ন উদ্বোধনের সময় হাসান আজিজুল হক বলেন, 'এ ধরনের শৈল্পিক আয়োজনকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ সংস্কৃতি যত ছড়াবে সমাজের তত মঙ্গল হবে। এ মাটি বৌদ্ধ জনপদের পরিচয় বহন করে। বাঙালির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির তীর্থস্থান মহাস্থান। বাঙালির অখণ্ড সংস্কৃতি এখন প্রত্নস্থলের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হচ্ছে।'

নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৫০০ বছর আগের সভ্যতার এই নগরী মহাস্থানের ভাসুবিহার। এই ভূখণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

নাটকের শুরুতেই আসাদুজ্জামান নূর নিজেকে 'মহাস্থান' আখ্যা দিয়ে শুরুতেই বর্ণনা করেন স্থানটির ইতিহাস। মন্দ্রিত কণ্ঠে বলেন, আড়াই হাজার বছর পূর্বেকার মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর রাজধানী ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অংসখ্য হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছেন। মূল নাটক শুরু হয় তার ধারাবর্ণনা শেষ হওয়ার পর, যাতে তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৫০০ সাল সময়ের শাসকদের শাসন ও শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয়। ঘটনার পালাবদলে ঐতিহাসিক এই স্থান পরিণত হয় ধর্মীয় তীর্থস্থানে। এ নাটক শেষ হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। একেবারে শেষ প্রান্তে আবির্ভূত হন একজন মূকাভিনেতা। সকল আঁধার কাটিয়ে

আলোকবর্তিকা হয়ে এগিয়ে আসতে থাকেন তিনি। এ সময় আবহে বেজে উঠে সৈয়দ শামসুল হকের 'আমার পরিচয়' কবিতার অংশবিশেষ- 'আমি জন্মেছি বাংলায়/আমি বাংলায় কথা বলি/আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি'... অংশটুকু।

নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী সমকালকে বলেন, এ নাটকে প্রত্ন-ইতিহাসকে দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভেতর দিয়ে সমগ্র বাংলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প নাটকটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

নাট্যকার সেলিম মোজাহার বলেন, বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী পুন্ড্রনগরের মহাস্থানকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে মহামুনি গৌতম বুদ্ধের বাংলায় আসার সময় থেকে একাত্তরের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কালপর্বকে এ নাটকে তুলে ধরা হয়েছে। বাঙ্গালা অঞ্চলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পট ও তার পরিবর্তনের ইতিহাসের 'জানা ও জনপ্রিয়' গল্পপ্রবাহ এ নাটকের আখ্যানভাগ।

নাটকটিতে ঢাকার ৬০ এবং বগুড়ার ১০০ জন অভিনয়শিল্পী এবং ঢাকার ৩০ ও বগুড়ার ৭০ জন নৃত্যশিল্পী অংশ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে অংশ নিয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক কলাকুশলী।

এর আগে শিল্পকলা একাডেমি ২০১৪ সালের ২০ এপ্রিল নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে দেবাশীষ ঘোষের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ করে দেশের প্রথম প্রত্ননাটক 'সোমপুর কথন'। নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর খননের মাধ্যমে যে আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিস্কার হয়েছে, সেই নিদর্শনকে উপজীব্য করে ২০১৪ সালের ৬ জুন মঞ্চস্থ হয় প্রত্ননাটক 'উয়ারী-বটেশ্বর'।