ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব

লোকজ সুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন

সাক্ষাৎকার :আনিয়া উইটযাক

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমু সাহা

'লোকগানের কথায় রয়েছে জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ঐন্দ্রজালিক সুর অদ্ভুত এক ঘোরে আবিষ্ট করে রাখে। তবে পোল্যান্ডে রক মিউজিকের বেশ আধিপত্য। যদিও লোকজ ও ক্লাসিক্যাল গানেরও চাহিদা আছে। ব্যান্ড দিকান্দা গঠনের উদ্দেশ্যই ছিল সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারার মধ্যে সুষম অন্বয় ঘটানো। লোকসুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের মিশেলে দর্শককে ভিন্ন আস্বাদন দেওয়াই দিকান্দার প্রয়াস।'- এভাবেই বলছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পোল্যান্ডের ব্যান্ড দিকান্দার দলপ্রধান আনিয়া উইটযাক।

আজ রাতে 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট ২০১৮'-এ তাদের ব্যান্ড দল সঙ্গীত পরিবেশন করবে। তার আগে গতকাল সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপে অংশ নেন আনিয়া উইটযাক। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো :

সমকাল :ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবে প্রথমবার অংশ নিচ্ছেন। দিকান্দা ব্যান্ড দলের বাংলাদেশে এটিই প্রথম পরিবেশনা। সব মিলিয়ে এই ঢাকা সফরকে কেমন মনে হচ্ছে?

আনিয়া উইটযাক :একেক সফরের গল্প একেক রকম। আজকের আয়োজনের কথা যখন আগামীতে ভাবব, তখন বুঝতে পারব- আগেরগুলোর চেয়ে এটা  কতটা ভিন্নরকম। তবে বাংলাদেশে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশনা করব বলে অবশ্যই কিছুটা উচ্ছ্বসিত। দুই বছর আগে ভারতে একটি ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়েছিলাম। তখনই শুনেছিলাম লোকজ ঐতিহ্যে বাংলাদেশ অনেক সমৃদ্ধ; যে জন্য গত তিন বছর ধরে সেখানে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব হয়ে আসছে। তখন থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক কোনো লোকসঙ্গীত উৎসবে পারফর্ম করার। অবশেষে যখন বাংলাদেশের এই লোকসঙ্গীত উৎসবে আমন্ত্রণ পেলাম- তখন দলের সবার মুখেই আনন্দের আভা ফুটে উঠেছিল। যদিও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে টানা কয়েকটি কনসার্টে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে দিকান্দার। তারপরও এখন আমরা ঢাকায়। কিছুক্ষণ পরই অংশ নেব ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্টে। আশা করছি, এই উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশন অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা এনে দেবে।

সমকাল :কনসার্টের সিডিউল মিলিয়ে ঢাকায় এলেন কীভাবে?

আনিয়া উইটযাক :ফোকফেস্ট কর্তৃপক্ষ যখন আমন্ত্রণ জানায়, তখনই ভেবেছি, এ আয়োজনে দিকান্দার অংশ নেওয়া উচিত। লোকজ সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এ দেশের মানুষ সঙ্গীতের প্রতি যে গভীর আবেগ লালন করে তা আগেই জেনেছি। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও এ আয়োজনে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য পাঁচ দিন সময় বের করেছি। সবকিছুই হুটহাট করতে হয়েছে। গত চার বছর ধরেই দিকান্দা বিভিন্ন দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করে আসছে। এ মাসেও অস্ট্রিয়া, জার্মানি, স্লোভাকিয়া এবং পোল্যান্ডে আমাদের চারটি শো রয়েছে। তার পরও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্টকে প্রাধান্য দিয়েছি।

সমকাল :লোকজ সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারা আছে, দিকান্দা সঙ্গীতের কোন ধারায় নিজেদের নিবিষ্ট রেখেছে?

আনিয়া উইটযাক :দিকান্দার পরিবেশনায় লোকজ গানের সঙ্গে ফিউশনের গভীর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। লোকজ সঙ্গীতকে একটা নির্দিষ্ট ছকে কখনোই বেঁধে রাখতে চাইনি। আমাদের মৌলিক গানগুলোতে ঐতিহ্যগত লোকজ সুরের পাশাপাশি পাওয়া যায় প্রাচ্যের প্রভাব। সে ধারাবাহিকতায় আমাদের গানে বলকান থেকে শুরু করে ইসরায়েল, কুর্দি, বেলারুশ, ইন্ডিয়ার লোকজ সঙ্গীতেরও বেশ ছায়া আছে। লোকজ গানের কথায় যে গভীর প্রাণস্পন্দন এবং নিরেট অনুভূতি লুকিয়ে আছে তা আমাদের গানে তুলে ধরার চেষ্টা করি। গানে নিজস্ব লোকজ শব্দও প্রয়োজন মতো ব্যবহার করি। সবার কাছে যা দিকান্দিশ নামে পরিচিত। তবে আমাদের পরিবেশনার মূল লক্ষ্যই হলো সঙ্গীতের তাল, লয়ের মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করা।

সমকাল :এখন পর্যন্ত 'দিকান্দা'র কয়টি অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে?

আনিয়া উইটযাক :১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত দিকান্দার মোট ৮টি অ্যালবাম বের হয়েছে। সর্বশেষ গত বছর 'ডেবলা ডেবলা' শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে। অ্যালবামের প্রতিটি গানেই চেষ্টা করি লোকজ গানের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আছে তা সুর, তাল, লয়ের মাধ্যমে তুলে ধরার। গান পরিবেশনের জন্য বিশ্বের যে প্রান্তেই গিয়েছি, লোকজ সংস্কৃতির রস আস্বাদনের চেষ্টা করেছি। লোকসুরে খুঁজে পাই প্রাণের স্পন্দন। এখন পর্যন্ত আমরা জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, ভারত এবং আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন লোকজ কনসার্টে অংশ নিয়েছি। ২০০৫ সালে প্রখ্যাত জার্মান ম্যাগাজিন 'ফোকলার' আয়োজিত 'ডিস্ক অব দ্য ইয়ার' অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল আমাদের তৃতীয় অ্যালবাম 'উশতিজো'।

সমকাল :এ দেশের লোকগান কখনও শোনা হয়েছে কী?

আনিয়া উইটযাক :না, আগে এদেশের লোকগান তেমন একটা শোনা হয়নি। তবে বছর দুয়েক আগে ভারতে যখন শো করেছিলাম, তখন এ দেশের লোকজ গান সম্পর্কে জেনে আগ্রহ বেড়েছিল। এরপর মঝেমধ্যে ইউটিউবে লোকজ গানের বেশ কিছু ভিডিও দেখেছি। তবে ভিডিও দেখার পরই বুঝেছি এ দেশের মানুষ কতটা গানপাগল। যে জন্য এবারের সফরের শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল, ভিন্ন আঙ্গিকে লোকজ গান পরিবেশন করব।

সমকাল :লোকজ গান মৃত্তিকা সংলগ্ন মানুষের কথা বলে। এর জন্য গভীর নিমগ্নতা প্রয়োজন। নতুন কোনো সঙ্গীত সৃষ্টির জন্য কোন রীতি অনুসরণ করেন?

আনিয়া উইটযাক :যখন সৃষ্টির নেশায় বিভোর, তখন ভুলে যাই আমি কে, কী আমার পরিচয়? ধর্ম-বর্ণ-জাত নিয়েও ভাবি না। যখন অনুশীলন করি, নিমগ্ন চিত্তে তাল-লয়-ছন্দ নিয়ে একের পর এক নিরীক্ষা চলতে থাকে। একসময় অনুভব করি, কিসের সঙ্গে যেন মনের যোগসূত্র ঘটে গেছে। মননে মিশেছে নতুন এক মূর্ছনা। সৃষ্টির নেশায় এমনই বিভোর হয়ে যেতাম যে, পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে- তা বিন্দু-বিসর্গও জানার সুযোগ হয়নি। সৃষ্টির নেশাই বোধ হয় এমন।



সমকাল :এবার শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশের লোকজ সঙ্গীত নিয়ে যদি কাজ করার কখনও প্রস্তাব আসে, সে ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা কিরূপ হবে?

আনিয়া উইটযাক :আমাদের ভূমিকা নিশ্চয়ই ইতিবাচক হবে। সঙ্গীতের তো নির্দিষ্ট কোনো মানচিত্র নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের লোকগান আমাদের অনেক বেশি প্রাণিত করেছিল। কেউ যদি এমন উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চায়, অবশ্যই সাধুবাদ জানাই।

সমকাল :আপনাকে ধন্যবাদ।

আনিয়া উইটযাক :সমকাল পরিবারকেও 'দিকান্দা'র পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।