সাহিত্য ও সংস্কৃতি

থেমে গেল অবিনশ্বর কবিকণ্ঠ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

'কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সেতো ভেসে ওঠা ম্লান/ আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি/ পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন/ আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি 'রাবেয়া রাবেয়া'/ আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!' ... বাংলা ভাষার কবিতায় ভেজানো কপাটের পর কপাট আবিস্কারের অনন্য সাধারণ রূপকার, অভাবনীয় কল্পনাশক্তির অধিকারী, কবিতায় অবিনশ্বর কণ্ঠস্বর কবি আল মাহমুদ আর নেই।

শুক্রবার রাত ১১টায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি পাঁচ পুত্র, তিন কন্যাসহ তার কবিতার অগণিত অনুরাগী রেখে গেছেন।

রাতে আল মাহমুদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ইবনে সিনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে, তাকে রাজধানীর ধানমণ্ডির এই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সে অবস্থায় তিনি রাত ১১টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আল মাহমুদ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি অধ্যাপক  ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

আল মাহমুদ পঞ্চাশ দশকে বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। এক দশকের কাব্যপ্রচেষ্টার ফসল 'লোক লোকান্তর' [১৯৬৩] প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাব্য অনুরাগীদের দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। কবিতায় তার ঋজু ভঙ্গি, ছন্দ কুশলতা, কল্পনা বিস্তার, নিপুণ বিন্যাস কৌশল তাকে রবীন্দ্রউত্তর ত্রিশ দশকের কবিদের সারি থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। এরপর একের পর এক কাব্য- বিশেষত 'কালের কলস' [১৯৬৩] ও 'সোনালি কাবিন' [১৯৬৬] তাকে বাংলা ভাষার সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর ধ্রুপদী মৌলিক কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। আল মাহমুদের কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য- তিনি জাত কবি, একান্ত রক্তের ভেতরে তার কবিতা খেলা করেছে স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রেমে ও তাপে। পশ্চিম থেকে তিনি ঋণ করেননি, নিজের মধ্যেও ঘুরপাক খাননি ক্রমাগত- বরং নিজের চারপাশ- নদী ও নারী, স্বদেশ ও স্বকালকে তিনি কবিতায় রূপান্তর করেছেন একান্ত নিজস্ব বয়ানে।

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ম্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর ও মা রৌশন আরা বেগম। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দির সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তিনি বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকায় সম্পাদক থাকাকালে সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ 'পানকৌড়ির রক্ত' প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

১৮ বছর বয়স থেকে আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' পত্রিকা এবং কলকাতার 'নতুন সাহিত্য', 'চতুস্কোণ', 'ময়ূখ', 'কৃত্তিবাস' ও 'কবিতা' পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস 'কবি ও কোলাহল'।

তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- 'অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না', 'মিথ্যাবাদী রাখাল', 'আমি দূরগামী', 'দ্বিতীয় ভাঙন', 'উড়ালকাব্য' ইত্যাদি। 'কাবিলের বোন', 'উপমহাদেশ', 'ডাহুকি', 'আগুনের মেয়ে', 'চতুরঙ্গ' ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। 'পানকৌড়ির রক্ত'সহ বেশকিছু গল্পগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। 'যেভাবে বেড়ে উঠি' তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনী গ্রন্থ।

ছড়া রচনাতেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- সবকিছুই তার ছড়ায় রূপান্তরিত হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরছে। 'আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/ হেথায় খুঁজি ...সারা বাংলাদেশে!' 'ট্রাক, ট্রাক, ট্রাক'...'আব্বা বলেন পড়রে সোনা/ আম্মা বলেন মন দে, ...' এ ধরনের শত শত ছড়া বাঙালির মুখে মুখে ফিরছে।

প্রয়াত সৈয়দা নাদিরা বেগম ছিলেন আল মাহমুদের সহধর্মিণী। বছর কয়েক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আল মাহমুদ মগবাজারের বাসায় নিভৃতেই বসবাস করতেন।

তিনি তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীমউদ্‌দীন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

কবিতায় বিস্তারিত দার্শনিকতা আল মাহমুদের বড় এক শক্তির জায়গা। জীবনকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তাকে কবিতায় তিনি স্থাপন করেছেন অন্তরঙ্গ আর মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায়।

কবি আল মাহমুদ তার প্রত্যাবর্তনের লজ্জা কবিতায় লিখেছিলেন- কুয়াশার সাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো/ শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে/ চোখের পাতায়/ শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতোন হঠাৎ/ লাল সূর্য উঠে আসবে। / পরাজিতের মতো আমার মুখের উপর রোদ নামলে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো ঘরবাড়ি, গ্রাম। .../ দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা / একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,/ ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান.../ বাসি বাসন হাতে আম্মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন.../ আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।'

কবি আল মাহমুদ চলে গেছেন মহাসিন্ধুর ওপারে; কিন্তু তার রচিত কবিতা পরম্পরা বাংলা ভাষার চিরস্থায়ী সম্পদে এরইমধ্যে পরিণত হয়েছে। আল মাহমুদের ভাষায়, 'পরাজিত হয় না কবিরা!' সত্যিই কবি আল মাহমুদ অপরাজেয়, অবিনশ্বর কাব্যভাষার জন্য তিনি চিরকালের বাংলা ভাষার সম্পদ হিসেবে পরিগণিত ও বারবার উচ্চারিত হবেন।

বিষয় : আল মাহমুদ