সাক্ষাৎকার: অন্তরা গাঙ্গুলী

এখনও মুক্ত হয়নি উপমহাদেশের নারী

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

.

অন্তরা গাঙ্গুলী

অন্তরা গাঙ্গুলী ভারতের নারীবাদী লেখক। জন্ম কলকাতায়, বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ে। বাংলা বোঝেন, বলতেও পারেন। লিখতে কিংবা পড়তে পারেন না। কর্মরত ইউনিসেফ, ইন্ডিয়ায়। জাতিসংঘের নারী উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা 'ইউএন উইমেন'-এর কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশেও কাটিয়েছেন প্রায় এক বছর। এ কারণে বাংলাদেশ খুব চেনা তার। তার উপন্যাস 'তানিয়া তানিয়া' ভারতজুড়ে আলোচনার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যেও আলোচনায় এসেছে। তিনি এসেছিলেন এবারের ঢাকা লিট ফেস্টে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী।

সমকাল: ঢাকা তো আপনার খুব চেনা। এবার এসে কেমন লাগছে?

অন্তরা গাঙ্গুলী: 'ইউএন উইমেন'-এ কাজের সুবাদে ঢাকায় প্রায় এক বছর ছিলাম। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল। এখানে বলে রাখি, আমার জন্ম কলকাতায় হলেও সেখানে বড় হইনি। বেড়ে উঠেছি মুম্বাইতে। আর আমার জন্য বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে, আমার বাড়ির ভাষা, আমার বাবা-মায়ের ভাষা বাংলা। এর সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগটা এই ঢাকায় এসেই প্রথম হয়েছে। এ কারণে ঢাকাকে মনে হয় আমার শহর, এখানে এলেই মনে হয় নিজের বাড়িতে এসেছি। আমার সঙ্গে আমার স্বামী এসেছেন। তিনি আমাকে বলছিলেন, আমি ভাবতেই পারছি না তুমি এখানে কেবল এক বছর ছিলে, দেখে মনে হচ্ছে এটা তোমার সেকেন্ড হোম।

সমকাল: আপনি ইউএন উইমেনে কাজ করেছেন, কাজের প্রয়োজনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করতে হয়েছে। সেই কাজের প্রতিফলনই কি 'তানিয়া তানিয়া'-তে পড়েছে?

অন্তরা গাঙ্গুলী: আমি নারীবাদী। সেই দৃষ্টিকোণটাই আমার লেখায় থাকে। 'তানিয়া তানিয়া' ভারত ও পাকিস্তানের দুই তরুণীর গল্প, যারা দু'দেশের সীমান্ত এলাকায় থাকে। আমার পাকিস্তানি অনেক বন্ধু আছে, যাদের সঙ্গে আমি যুক্তরাষ্ট্রে একসঙ্গে পড়েছি। আর কাজ করতে গিয়ে যেটা বুঝেছি, ভারত, পাকিস্তান, এমনকি বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা এবং নারীর অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রচুর মিল রয়েছে। সংকট, সম্ভাবনা, যেটাই বলুন- প্রায় একই। এ কারণে 'তানিয়া তানিয়া'র গল্পে এ উপমহাদেশের নারীর অবস্থানের একটা প্রতিফলন আছে।

সমকাল: যেহেতু বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে কাজ করেছেন, অতএব বাংলাদেশের নারীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

অন্তরা গাঙ্গুলী: সমাজ বাস্তবতার যে চ্যালেঞ্জ সেটা তো আগেই বলেছি। আমি বরং বাংলাদেশের চিত্রটা আরও ইতিবাচকভাবে দেখি। এখানে কিন্তু মেয়েরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা, মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসা, এ ধরনের অনেক সূচকে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের চেয়ে ভালো করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে মেয়েরা অনেক বেশি শিক্ষায় আসছে, স্কুলে যাচ্ছে। শিক্ষায় মেয়েদের উপস্থিতির ক্ষেত্রে সামনে কিন্তু বাংলাদেশ আরও ভালো করবে। এখনকার নির্ণায়কগুলো সেটাই বলছে। কিন্তু একটা বিষয় ভাবার মতো আছে। যেমন ধরুন গার্মেন্ট শিল্পে এখন ৮০ শতাংশ নারী কর্মী। এই কর্মীরা ভালো কাজ করছে, অবদান রাখছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তরুণ বয়সী নারীরা কিন্তু ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারছে না। কারণ তারা যেটা উপার্জন করে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের জন্য রাখতে পারে না। সেটা তার স্বামীরা নিয়ে নেয় কিংবা বিবাহিত না হলে বলা হয় টাকাটা বিয়ের জন্য রেখে দাও। এই যে একটা মেয়ের সামনে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিয়েটাকে রাখা হয়, সেটাই তার সামনে, কর্মক্ষেত্রে ক্যারিয়ার তৈরির স্বপ্নের সামনে, একটা বাধা হয়ে যায়। বিয়ে জীবনে খুব স্বাভাবিক একটা অনুষঙ্গ। কিন্তু এটাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গেলে সেটা জীবনের অন্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নকে ফিকে করে দেয়। এই বাস্তবতা কিন্তু্তু শুধু বাংলাদেশ নয়, এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই আছে।

সমকাল: তাহলে কি এ অঞ্চলের মেয়েরা এখনও বিয়ের গোলকধাঁধার ভেতরেই আটকে আছে?

অন্তরা গাঙ্গুলী: না, সেটা বলা ঠিক হবে না। কারণ আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগের কথা ভাবুন। কি নিম্নবিত্ত, কি মধ্যবিত্ত, মেয়েদের বিয়ে হতো কিন্তু ষোলোতেই। ষোলোর পরে বিয়ে হয়েছে, এমন মেয়ের সংখ্যা হাতেগোনা ছিল। তারও আগে আরও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ের রেওয়াজ ছিল। এখন কিন্তু সেটা নেই। এখন কিন্তু মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, তারপর চাকরি করে, মাঝামাঝি বয়সে গিয়ে বিয়ে করে। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এখনও বাল্যবিয়ে আছে, সে পরিস্থিতিরও কিন্তু দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। অতএব অবশ্যই যে গোলকধাঁধার কথা বলছেন, সেটার বড় পরিবর্তন হয়েছে।

সমকাল: এবার সাহিত্যে নারীবাদের প্রসঙ্গে আসি। একটা সময়ে নারীবাদী চিন্তার একটি সাহিত্যধারা তৈরি হয়েছিল। বেটি ফ্রাইডেন, কেট মিলিয়েটের মতো বড় বড় সাহিত্যিক সেই ধারায় ধ্রুপদি হয়ে আছেন। সাহিত্যে এ মুহূর্তে নারীবাদের উপস্থিতি কতটা দেখছেন?

অন্তরা গাঙ্গুলী: আমি একটা বিষয় আমার লেখার ক্ষেত্রে অনুভব করি। যে গল্পটা আমার মাথায় আসে, যেটা সবার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত বলে মনে করি, সেটা লিখে ফেলি। সেভাবেই কিন্তু 'তানিয়া তানিয়া' কিংবা 'দ্য বাগলস' লেখা। যেহেতু আমার চিন্তায়, কর্মে নারীবাদই প্রধান, সে কারণে আমার লেখায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। এখানে সচেতনভাবে নারীবাদকে আনতে হবে, সেটা মনে করি না।

আপনি বিশ্বসাহিত্যের বড় দু'জনের কথা বলেছেন। সে সময়ে নারীর যে লড়াই ছিল, সেটাই তারা তুলে এনেছেন। বেটি ফ্রাইডেনের 'ফ্যামিনিন মিস্টিক'-এর কথাই ধরুন। সেখাতে তো সে সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে নারীর সংকট উঠে এসেছে। তিনি তার মতো করে নারীর সে সময়কে তুলে এনেছেন। পরে এটা নারীবাদী চিন্তাবিদদের কাছে বড় একটা চিন্তার খোরাক হয়েছে। এ কারণেই আমি বলতে চাই, সাহিত্য রচিত হয় সাহিত্যিকের আপন চিন্তায়, পরে সেটা পাঠকের বিশ্নেষণে কোনো বিশেষ ধারার মাইলফলক হয়ে উঠতেই পারে। আমি যেটা বলব, নারীবাদ এখনও বিশ্বে প্রবলভাবেই উপস্থিত। অতএব সাহিত্যেও তার উপস্থিতি নানাভাবেই আছে।

সমকাল: আজকের ভার্চুয়াল রিয়ালিটি যুগের তরুণরা কি আগামীতে সাহিত্যানুরাগী থাকবে?

অন্তরা গাঙ্গুলী: এই ঢাকা লিট ফেস্টের দিকে দেখুন। প্রতিদিন যারা আসছেন তাদের বেশিরভাগই কিন্তু তরুণ। তাদের অবশ্যই সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ আছে। এই তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত, স্মার্টফোনের স্ট্ক্রিনের দিকে তাদের নজর। কিন্তু তারাও সেখানে কিন্তু 'স্টোরি' খোঁজে। সেই 'স্টোরি' তো সৃষ্টি হতেই হবে। অতএব আগামীতে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কিংবা আরও প্রযুক্তির ব্যবহার আসুক, রিয়েল রিয়ালিটি হচ্ছে- সাহিত্য সৃষ্টি হবে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখা হবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অবশ্যই সেটার কদর থাকবে।

সমকাল: ডিভাইসের স্ট্ক্রিনেই যদি সবাই 'স্টোরি' খোঁজে তাহলে ছাপা বইয়ের ভবিষ্যৎ কী?

অন্তরা গাঙ্গুলী :দেখুন, যখন টেলিভিশন এলো তখন সবাই বলল, এবার তো বইয়ের কদর কমবে, হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দিন শেষ। কিন্তু আসলেই কি সেটা হয়েছে? বই এমন একটা বিষয় যেটা মানুষ তার নিজের কাছে রাখে, একেবারে সংসারের নিজের মানুষের মতো করে। কাছে টেনে নেয়, মাথার কাছে রাখে, পড়তে পড়তে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে, ঘুম থেকে উঠে আবার পড়ে। কিন্তু এর বাইরে রেডিও, টিভি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট যা কিছু বলুন, সেটা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে সত্যিই, বিনোদন, চিন্তা বিনিময়ের বড় ক্ষেত্র হতে পেরেছে, কিন্তু বইয়ের মতো আপন হতে পেরেছে কি? মানুষের একান্ত আপন হিসেবে ছাপা বই বেঁচে আছে, থাকবে।

সমকাল: খুব ভালো লাগল আপনার সঙ্গে আলাপে। অসংখ্য ধন্যবাদ।

অন্তরা গাঙ্গুলী: আপনাকেও ধন্যবাদ।