ঢাকা লিট ফেস্ট

শেষবেলায় ছন্দপতন বুলবুলের ঝাপটায়

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

বিশেষ প্রতিনিধি

শনিবার বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত লিট ফেস্টের 'ইন্ডিয়া অ্যাগেইনস্ট ইটসেলফ' শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দেন ভারতের লেখক ও রাজনীতিবিদ শশী থারুর-সমকাল

শনিবার বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত লিট ফেস্টের 'ইন্ডিয়া অ্যাগেইনস্ট ইটসেলফ' শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দেন ভারতের লেখক ও রাজনীতিবিদ শশী থারুর-সমকাল

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ঝাপটায় শেষ দিনের শেষ বেলায় কিছুটা বিধ্বস্ত হয়েছে ঢাকা লিট ফেস্ট। তুমুল বৃষ্টির ফলে বন্ধ করে দিতে হয়েছে সন্ধ্যার সেশনগুলো। একই সঙ্গে সর্বশেষ সেশনে 'শংকর' নামে খ্যাত দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মনিশংকর অংশ নিতে পারেননি শারীরিক অসুস্থতার কারণে। তবে ২০২০ সালে দশম ঢাকা লিট ফেস্ট আরও বড় পরিসরে করার প্রত্যয়ে পর্দা নেমেছে ঢাকায় সাহিত্যের বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের, দক্ষিণ ভারতীয় সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তিশানি দোশির আবৃত্তি ও নৃত্যনাট্য দিয়ে। এরপর বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, আয়োজনের পরিচালক সাদাফ সায্‌ ও ব্রাজিলিয়ান লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বৈসো লেপেস্কি।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, 'বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে আগামীতে আরও বড় করে এই আয়োজন করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।' ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্‌ আয়োজনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই আয়োজন আরও আকর্ষণীয় ও জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।'

এর আগে তৃতীয় দিনের সকাল শুরু হয় ইসকনের সংগীত দলের ভজন কীর্তন দিয়ে। এরপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্য দিয়েই সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় দিনের পর্বগুলো।

সকালে নজরুল মঞ্চে একটি শিশুতোষ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটির নাম 'সাগর তীরে'। উন্মোচনের পর লেখক নাজিয়া জেবীন বই থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান। একই মঞ্চে পরে 'দ্য এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম' বইয়ের লেখক নন্দিতা খান বইটি থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান।

পরে আবারও একই মঞ্চে ওঠেন কার্টিস জবলিং। তিনি শিশুদের বিভিন্ন শব্দজট ও ছবির মাধ্যমে নানা জিনিস শেখান। কয়েকটি গল্পের সঙ্গে অভিনয় করেও দেখান। তিনটি সেশনেই শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশুদের পর্বে 'লনে রিভাইভিং দ্য আর্ট অব স্টোরিটেলিং' শীর্ষক শিশুতোষ আলোচনায় মাদিহা মোরশেদের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ফ্রান হুরলি, নিউরোসায়েন্টিস্ট নাইলা জামান খান এবং সাজিয়া জামান।

এ পর্বে কার্টিস জবলিং বলেন, 'একমাত্র পরিবারই শিশুকে গল্প শুনিয়ে আনন্দময় শিক্ষা দিতে পারে, যা তার সঠিক মানসিক বুদ্ধিবৃত্তিতে সাহায্য করবে। শিশুদের গৎবাঁধা বই হাতে ধরিয়ে না দিয়ে, খেলাচ্ছলে কল্পনানির্ভর শিক্ষা দেওয়া উচিত।' তার সঙ্গে একমত হয়ে ফ্রান হুরলি বলেন, 'প্রযুক্তি নয়, পরিবার শিশু শিক্ষার প্রধান মাধ্যম।'

সকালের পর্বে বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে 'পাওয়ার অব পিকচার' সেশনে উপস্থিত ছিলেন গ্রাফিক নভেলিস্ট ও কার্টুনিস্ট ফাহিম আঞ্জুম এবং চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা আবরার আখতার। সঞ্চালক ছিলেন কার্টুনিস্ট সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়। স্থিরচিত্র ও সচলচিত্রের শক্তি ও সমাজে এর প্রভাব নিয়ে সেশনের আলোচনা শুরু হয়। সঞ্চালক তন্ময় নির্মাতা জীবনের শুরুর কথা জানতে চাইলে আবরার আখতার বলেন, 'আমি ছোটবেলা থেকেই গল্প নিয়ে কাজ করতাম। আশপাশের মানুষের নিজের গল্প বলতাম। আমার মধ্যে যে ছবি বা গল্পের চরিত্রগুলো মাথায় ঘুরত, তা কল্পনার মাধ্যমে আমি অনেকদূরে নিয়ে যেতাম।'

আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটোরিয়ামে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জেফরি গেটেলম্যান তার বই 'লাভ, আফ্রিকা :আ মেমোয়ার অব রোমান্স, ওয়ার অ্যান্ড সারভাইভাল' নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। 'লাভ, আফ্রিকা' শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন জাফর সোবহান। এ পর্বে জেফরি গেটেলম্যান জানান, আফ্রিকা থাকাকালে তার ১০ বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস এই বই। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসের পূর্ব আফ্রিকাবিষয়ক ব্যুরোপ্রধান ছিলেন।

তিনি বলেন, 'আফ্রিকায় পরিবারসহ থাকাটা সবসময় নিরাপদ ছিল না। সোমালিয়ায় যে কোনো মুহূর্তে অপহরণ হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু আমি ও আমার স্ত্রী পুরো সময়টাতে প্রাকৃতিক জীবন উপভোগ করেছি, মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের জীবন বোঝার চেষ্টা করেছি।'

সকালে সবচেয়ে জমজমাট আলোচনা ছিল ভারতীয় রাজনীতিক শশী থারুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সি আর আবরারের আলাপ। লেখক শশী থারুরের বই নিয়ে আলাপ করার পরিকল্পনা থাকলেও সেটি গড়ায় কাশ্মীর, মোদি ও রামমন্দির ইস্যুতে। শশী থারুর বলেন, "কাশ্মীর ইস্যুতে মোদি অনেকটা কার্যকর উপায়ের কথা বলেছিলেন কয়েক মাস আগেও, 'গুলি না করে, গালি না দিয়ে, বুকে টেনে নিয়ে কাশ্মীরিদের সমস্যার সমাধান হবে।' কিন্তু এখন নিজের এই 'প্রেসক্রিপশন' তিনি হয়তো ভুলে গেছেন।"

কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী- দর্শক সারি থেকে ওঠা এমন প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেসের এই নেতা বলেন, 'গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটা কোনো পন্থা হতে পারে না। এ রকম পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘরবন্দি করে রাখা গণতন্ত্রে অগ্রহণযোগ্য চর্চা।'

তিনি আরও বলেন, 'ড. মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বলে গেছেন, আশা করি ইতিহাস আমার প্রতি সদয় আচরণ করবে। এখন তার কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।'

বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত 'সাহিত্য ও সাংবাদিকতা :দ্বৈতসত্তার মিল-অমিল' শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত, লেখক ও সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি এবং প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কবি সাজ্জাদ শরীফ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মৃদুল দাশগুপ্ত বলেন, 'আমি কিছুতেই কবিতাকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়াই না। আমি মাথা দিয়ে সাংবাদিকতা করি এবং বুক ও মাথা দিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গে যারা লেখালেখি করে, তাদের একবার হলেও বাংলাদেশে ঘুরে যাওয়া উচিত। আর বাংলাদেশের যারা লেখালেখি করে, তাদেরও পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে ঘুরে আসা উচিত। বাংলাদেশ কবিতার আবাদ ক্ষেত্র।'

মুস্তাফিজ শফি বলেন, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য পরস্পরের পরিপূরক। আমার যা কিছু মৌলিক লেখালেখি তার পেছনে রয়েছে সাংবাদিকতা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা। তিনি তার আলোচিত উপন্যাস 'জিন্দা লাশ অথবা রমেশ ডোম' এবং 'ঈশ্বরের সন্তানেরা'র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সাংবাদিকতা না করলে হয়ত এই লেখা দু'টি হতো না। তবে একই সঙ্গে তিনি সক্রিয় সাংবাদিকতার জন্য মৌলিক লেখালেখির পর্যাপ্ত সময় বের করা কষ্টকর বলেও উল্লেখ করেন।

সাজ্জাদ শরীফ বলেন, 'আমার স্বপ্নের এবং কল্পনার বড় অংশ সাংবাদিকতায় দিয়েছি। এতে করে কবিতা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'সাংবাদিকতা ও কবিতার শব্দ আলাদা। কবিতায় এমন শব্দ ব্যবহার করতে পারব না, আমি যেটা মুখে বলছি।'

বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে 'অন দ্য রোড :ট্রাভেল রাইটিং উইথ উইলিয়াম ডালরিম্পল' শীর্ষক সেশনে ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল বলেন, 'গত শতকের নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকের গোড়ার দিকে প্রায় ২৫ বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের পর এখানকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র্য আমাকে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।'

বিকেল ৩টায় মঞ্চের জুটি ও ব্যক্তিজীবনের জুটি ফেরদৌসী মজুমদার ও রামেন্দু মজুমদার আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মঞ্চে বসেন জীবন ও পেশার গল্প নিয়ে। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন নাট্যকার ও শিক্ষক আব্দুস সেলিম।

শুরুতেই ফেরদৌসী মজুমদারের কাছে সঞ্চালক তাদের বিয়ের আগের জীবনের কথা জানতে চান। ফেরদৌসী বলেন, 'আমরা অনেক যুদ্ধ করে এতদূর আসতে পেরেছি। আমার বাবা ছিলেন খুবই রক্ষণশীল। ওই সময়ে আমাদের ভালোবাসার কথা জানানোর কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ৭০ সালে এই বিয়ে প্রকাশ্যে হওয়া সম্ভব ছিল না। দুই ভাই কবীর চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরীর সাহায্যে এই বিয়ে সম্ভব হয়।' রামেন্দু মজুমদার বলেন, 'আমরা দুজনই মুনীর চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তারা না থাকলে থিয়েটারে এতদূর আসতে পারতাম না।'