শেখ আবদুল হাকিম, যাঁকে আমি ডাকতাম হাকিম চাচা বলে, তিনি মারা গেছেন। ২৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে। কত দিন দেখা হয়নি ওনার সাথে, কত বছর- আর দেখা হবে না, কোনোদিন। ছেলেমানুষের মতো কেন যেন মনে পড়ে। হাকিম চাচার একটা উপন্যাস আছে, 'দেখা হবে কবরে'; নাহ, খুব ভালো করেই জানি, আর দেখা হবে না- সব শূন্যতা পূরণ হয় না।
১৯৪৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে জন্ম। যখন বছর চারেকের বালক মাত্র তখন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে তাঁর পরিবার। পড়াশোনা? বোধকরি, স্কুল পেরোননি! এইখানে একটু থমকে দাঁড়াতে হয়। স্কুল শেষ করেননি, অথচ অনুবাদ-রূপান্তর করে গেছেন বিশ্বসাহিত্যের অমর সব রত্ন থেকে জমজমাট সব থ্রিলার? যে ইংরেজিতে দাঁত ফোটাতে আমাদের মতো 'উচ্চশিক্ষিত'দেরও ভয় হয়, সেসব লেখা পড়ে-বুঝে-আত্মস্থ করে লিখে ফেলেছেন, বিশ্বাস করা যায় না এমন গতিতে!
দ্রুত লেখা ছাড়া উপায় ছিল না, ওটাই যে তাঁর রুটি-রুজি। মুদ্রিত শব্দ বেচেই চালাতেন পেট, সংসার। তরুণ বয়স থেকেই লেখেন, লিখেই গ্রাসাচ্ছাদন। আর কিছু করেননি, আমৃত্যু।
শেখ আবদুল হাকিমের সাথে দেখা হয়নি গত অনেকগুলো বছর। কালেভদ্রে ফোনে কথা হতো, তাও এক-আধটু। মাঝেমধ্যে ওনার খবর পেতাম শিল্পী ধ্রুব এষ মারফত। পত্রিকা, টেলিভিশন আর ফেসবুকের বিচারালয় থেকে জানতাম মাসুদ রানা নিয়ে তাঁর সাথে আমার আরেক শ্রদ্ধাভাজন কাজী আনোয়ার হোসেনের, কাজীদার, মামলামোকদ্দমার খবর। ব্যস, এইটুকুই।
তাহলে, কেন লিখছি এই লেখা, কোন অধিকারে? এইখানে অধিকারটা দার্শনিক : দুনিয়ার সব সৃষ্টিতে সবার সমান অধিকার; সেই হিসেবে তাঁর বইপত্তরের মতো তিনিও আমাদের অনেকের কাছের মানুষ। ওই যে, তার চিরকালীন অনুবাদ 'গডফাদার'-এ বনাসেরা যখন বলে, '... যা থাকে কপালে। ডন কর্লিওনির কাছেই যাব আমি ...', তখন থেকেই তো এই শেখ আবদুল হাকিম আমাদের কোথায় কোথায় নিয়ে গেছেন, মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন কত বিচিত্র চরিত্রের। এই লোকটা তো আমাদেরই ভীষণ রকম নিজস্ব!
দীর্ঘদিন সেবা প্রকাশনীর 'রহস্যপত্রিকা'র সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন। তখনও, 'রহস্যপত্রিকা'র ভীষণ নামডাক, ওখানে লেখা ছাপা হওয়া মানে বড়োসড়ো কিছু। সে সময়, আমি সদ্য তরুণ। তখনকার নামি ওই পত্রিকায় ডাক মারফত একটা লেখা পাঠিয়েছিলাম, ফিচার মতো ছোট্ট একটা লেখা। কদিন পর বাড়ির ল্যান্ডফোনে একটা ফোন : রহস্যপত্রিকার অফিস থেকে কেউ একজন জানালেন, শেখ আবদুল হাকিম তলব করেছেন।
পরদিন সকালবেলা হাজির হলাম রহস্যপত্রিকার অফিস, সেগুনবাগিচায়। ততদিনে পড়া শেষ তাঁর প্রথম উপন্যাস 'অপরিণত পাপ', 'কামিনী', 'গডফাদার'-সহ আরো অনেক বই। মাসুদ রানার জাঁদরেল ঘোস্ট-রাইটার দলের তিনি একজন, তাও জানা। সব মিলিয়ে একটু দুরু দুরু বুকেই হাজির হয়েছিলাম। সামনে পুরোনো ইংরেজি বই আর পত্রিকার স্তূপের পেছন থেকে, পাঞ্জাবি কি ফতুয়া পরনে, রোগ টিংটিঙে এক বয়স্ক লোক, চশমার আড়াল থেকে চোখ-মুখ কুঁচকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে একদম শুদ্ধ বাংলায় প্রশ্ন করলেন, 'কোথা থেকে টুকেছেন লেখাটা? কোন পত্রিকা? ইংরেজি, না এ দেশের?'
'টুকেছি মানে?', বয়সের দোষেই বোধহয়, আমিও একটু ফুঁসে উঠেছিলাম, 'তথ্যগুলো যে বিদেশি বইয়ের সেটা তো বুঝতেই পারছেন, কিন্তু লেখার প্রতিটা শব্দ আমার।' ভদ্রলোক আমার কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না, চমশার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলেন, 'বসুন'। বাড়িয়ে দেন আমার লেখাটা, মার্জিনে তাঁর সম্পাদনার অগুনতি চিহ্ন, নতুন শব্দ, এমনকি দু-একটা নতুন বাক্য। বলেন, 'দেখুন। কত ভুল করেছেন, ভালো করে দেখুন।' আমি এবার খানিকটা নরম। তিনি বলেন, 'কী কী করেছি, মনে রাখুন, এসব যেন আর না হয়। সামনের সংখ্যায় আরেকটা এমন ফিচার দিতে পারবেন?' সেই থেকেই, প্রতিমাসেই লেখা নিয়ে হাজির হতাম। ভাই ডাকা হয়নি কখনো, ডাকতাম 'হাকিম চাচা'। পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত কাজী শাহনুর হোসেন, টিংকু ভাই আর কাজী মায়মুর হোসেন, রিংকু ভাই- চাচা ডাকতেন; সেই সুবাদে আমিও তাই।
আস্তে আস্তে লেখা নিয়ে যাওয়া ছাড়াও, যাওয়া হতো- বিশেষ কোনো কারণে নয়, একটু আড্ডার লোভে। নাহ, ঠিক আড্ডা না, আড্ডা দু'তরফা হয়; ওখানে আমি ছিলাম মূলত শ্রোতা। হাকিম চাচা রুগ্‌ণ মানুষ ছিলেন, সব সময় বলতেন, 'শরীরটা ভালো না'; কিন্তু ছটফটে মানুষ, কথার তুবড়ি ফুটত মুখে। আগেই বলেছি, স্মৃতিশক্তি দুর্বল আমার, তাও, যা যা বলতেন প্রায়ই তা অনেকটা এ রকম : 'সাহিত্যের দুপয়সা দাম নেই আমার কাছে, বুঝলেন আসমার। লিখি, টাকা কামাই, ব্যস। তবে, খেটেখুটে লিখি। নকল করি-অনুবাদ করি, কিন্তু যত্ন নিয়ে করি। দুর্বল বাক্য, ভুল শব্দ, বেঠিক এক্সপ্রেশন একটা লেখায় জল ঢেলে দেয়; ওটা ঠিক হওয়া চাই। আর, যদি লিখে পাঠক টানতে চান, তাহলে লেখায় বাহুল্য একদম বাদ দেবেন, বুঝলেন? মেদ কেটেছেঁটে ফেলে দেবেন একদম।' আমি ওনার এই ডেডিকেশনকে শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি ওই বিরাগে অস্বস্তি হতো। একদিন বলে বসলাম, 'সাহিত্যের দাম নেই কেন বলছেন? যেসব সাহিত্য ক্লাসিক-চিরায়ত ওগুলো কি আমাদের ভাবায় না? একটু হলেও বদলে দেয় না?' উনি তেড়েফুঁড়ে বললেন, 'ভাবায়। কিন্তু, মানুষকে বদলানো? অত সহজ না! আপনাদের এসব আবেগী কথাবার্তা মাত্র। সাহিত্যের দায় একমাত্র শুদ্ধ-সুন্দর ভাষায় একটা নিটোল গল্প বলা; এর বাইরে কিচ্ছু না!' 'গল্প থাকতেই হবে? ভাষার কারিগরি নিয়েও তো কত গল্প দিব্বি দাঁড়িয়ে যায়', বলেছিলাম। 'কচু যায়! নিজেদের আড্ডায় পিঠ চাপড়ানো, আর দু-একটা পুরস্কার- এই তো আপনাদের দাঁড়ানো!' সপাট উত্তর ওনার।
সেবা প্রকাশনীর মহিউদ্দীন সাহেব চা আনাবার ব্যবস্থা করতেন। সেই পেয়ালায় হাকিম চাচা চুমুক দিতেন অনবদ্য ভঙ্গিতে। নানান ফিচারের আইডিয়া বলতেন, ভাষার খেলায় গল্পের গল্পটুকু সে বিষয়ে সতর্ক করতেন বারবার। একদিন একটা ফিচারের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, 'লেখাটা হয়নি।' বলেছিলাম, 'এডিট করে নিলে হয়না?' উনি দাঁত খিচিয়ে বললেন, 'এডিট করতে হলেও তো কিছু থাকা চাই ভেতরে, নাকি?' রোখ চেপে গিয়েছিল, লেখাটা ফেরত নিয়ে আরেকটা নামি পত্রিকায় ওই লেখাটাই ছাপিয়ে ওনাকে জানিয়ে দিলাম একদিন কায়দা করে। উনি হো হো করে হেসে উঠে বললেন, 'পাত্র যতই দামি হোক আসমার, আপনার রান্না করা খাবারটা কিন্তু অখাদ্যই আছে!' আমিও রীতিমতো চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলাম, 'আর কখনো কোনো লেখা অমনোনীত করতে পারবেন না!' উনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, 'তাই তো চাই, এটাও বোঝেন না!'
মাঝেমধ্যে আরো অনেকের মতো ওনার 'কামিনী' 'গডফাদার', 'অপরিণত পাপ', 'আমি কী হত্যাকারী?', 'আততায়ী', 'দড়াবাজ স্পাই' নিয়ে মুগ্ধতার কথা বলতাম। উনি পাত্তা দিতেন না। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতেন, 'এগুলো আপনাদের কথা। আমার কাছে এসবের কানাকড়ি দাম নেই। লিখেছি, পয়সা পেয়েছি। ব্যস, খতম!' 'কিন্তু, আপনার ভাষা? টান টান, পড়লেই চেনা যায়' নাছোড়বান্দা আমি। 'আসলে আমরা যারা অ্যাডাপটেশন করি, অনুবাদ করি- তাদের এটা এক-আধটু থাকতেই হয়। নইলে লোকে পয়সা দিয়ে কিনবে কেন? এমনিতেই অন্যের লেখায় পোদ্দারি করছি, অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে কেরামতি না থাকলে চলবে?' ওনার উত্তর।
সেই ৬৬-৬৭ সালে কাজীদার 'কুয়াশা' সিরিজের একটা বই দিয়ে সেবায় তাঁর ঘোস্ট রাইটিং শুরু। যদ্দুর মনে হয়, মাসুদ রানা সিরিজের 'জাল' বইয়ে তাঁর ঘোস্ট রাইটিং। তারপর অনেক অনেক রচনায় কাজ করেছেন। এর বাইরে দুহাতে লিখেছেন আরো নানান বই। অ্যাডভেঞ্চার, থ্রিলার, এমনকি রোমান্টিক-ও!
যখন সেবা থেকে বেরিয়ে গেলেন নানান কারণেই, তখনও তিনি সমানতালে লিখছেন। লিখলেন জাকি আজাদের নানান গল্প। আরো কত কী। সবই, প্রচলিত অর্থে 'বাজারি' বই, অর্থাৎ মৌলিকত্বের ধার না ধেরে বুদ্ধিদীপ্ত গদ্যে সব গল্প বলে গেছেন তিনি; করেছেন অনুবাদ। একমাত্র উদ্দেশ্য বই বিক্রি, পয়সা! কিন্তু কে বলবে যে তাঁর জাকি আজাদ সিরিজের 'বিষবৃক্ষ' বইয়ের এইরকম সব বাক্য নিছক বাজারি? '... চাঁদ আছে। যদিও পাহাড়ের কোন চূড়োয় আত্মগোপন করেছে বলা মুশকিল; তবে আকাশজুড়ে উজ্জ্বল মুক্তোর অসম্পূর্ণ মালা তৈরি করেছে যত নক্ষত্র ...'। মনে পড়ছে তাঁর কটি উপন্যাসের নাম : 'এবং নন্দিতা', 'সবুজ সংক্রমণ এবং ললিতার প্রতি শ্রদ্ধা', 'মধুবালা, কাঠফাটা এবং একজন উদ্যম'। এগুলোও নাকি তাঁর বিদেশি গল্পের ছায়ায় তৈরি বাজারি সব লেখা; তাও, রহস্য-রোমাঞ্চ ঘরানার! 'শয়তান' উপন্যাসে ডাক্তার কান্তিক কলকাতা থেকে ফিরলে বন্ধু সিআইডি চিফ প্রশ্ন করেন, 'মিহিদানা খেয়েছেন? ভেলপুরি?' কান্তিক উত্তর দেন, 'আরে, রাখুন ভাই, ওসব লাগে নাকি? পরিবেশই তো পেট ভরিয়ে দেয়। কী সুন্দর পোষ মানানো আবহাওয়া ওদের! কিন্তু সীমান্ত পার হতে যা দেরি, ছিঁচকাঁদুনে আকাশ বলল- আয়, ব্যাটা বাঙ্গাল, তোকে আজ নাস্তানাবুদ করি। তারপর যেই ঢাকায় পা দিয়ে একটু দম নিতে যাব, দেখি আমার স্বস্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য দরজায় স্বয়ং নালিশ হাজির হয়েছেন।' দুই বন্ধুর রসালাপ, একটা রোমাঞ্চ উপন্যাসে! দেখে কে বলবে যে এর স্রষ্টা নাকি বিদেশি বই অবলম্বনেই লিখে গেছেন বরাবর, নিছক পয়সা কামাবার ধান্দায়! আমরা, আম পাঠকেরাও, অতটা বোকা তো নই যে চিনে নিতে পারব না এই 'রাঁধুনি'কে; যিনি 'বিদেশি উপকরণ' দিয়ে 'দেশি রান্না' করে আমাদের মনোহরণ করে নিয়েছেন যুগের পর যুগ।
গত এক যুগের বেশি সময় ধরে আমাদের দেশের সব বড় পত্রিকার ঈদসংখ্যাগুলো তাঁর রহস্য- রোমাঞ্চ উপন্যাস ছাড়া ছাপা হয়নি। যে থ্রিলার-জনরা ফিক্‌শন আমাদের 'মূলধারা' সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে ছিল ব্রাত্য, সেগুলোতে জায়গা করে নিলেন শেখ আবদুল হাকিম। প্রায় সব বড় প্রকাশনাগুলো তাঁর বই করল। আমাদের দেশে গত ক'বছর ধরে থ্রিলারের যে রমরমা, তার পেছনে যে গুটিকয়েক মানুষের উজ্জ্বল মস্তিস্ক আর কলমের জোর পথ দেখিয়েছে তাঁদের মধ্যে শেখ আবদুল হাকিম, অনেক বিচারেই অগ্রগণ্য। আজকের আমাদের একঝাঁক স্মার্ট-তরুণ থ্রিলার লেখকেরা এটা খুব ভালো মতোই জানেন যে, বাংলা ভাষায় দাঁতে-দাঁত চেপে একটা আধুনিক-বুদ্ধিদীপ্ত-প্রাপ্তমনস্ক রোমাঞ্চ-সাহিত্য জগতের ভিত্তি তৈরির পেছনের কারিগরদের অন্যতম একজন এই শেখ আবদুল হাকিমও।
অনেকে বলেন : নাহ, জমেনি ঠিক আগের মতো। সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেনের, আমাদের কাজীদার পরামর্শ-এডিটিং ছাড়া কেমন পানসে লাগছে। বিষয়টা হয়তো খানিকটা এমন : ক্ষমতাটা তাঁর ছিল, কিন্তু সময়টা এবং পারিপার্শ্বিকতা তাঁর অনুকূলে আসেনি আর কখনোই। বার্ধক্য-অসুস্থতা-আর্থিক অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা-বেহিসেবি জীবনযাপন-মামলার দুশ্চিন্তা তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল; গল্পের অভাব হচ্ছিল। যা চাইছিলেন, সেটা হচ্ছিল না ঠিকমতো। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, অগুনতি থ্রিলার ঘরানার বই অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে লিখে যাওয়া ভারি দুরূহ একটা ব্যাপার। তাও আমাদের মতো এই দেশে, যেখানে লিখে খাওয়া প্রায় অবিশ্বাস্য একটি বিষয়।
শেখ আবদুল হাকিমকে আমরা কোথায় বসাব?
মানে, ওই যে সাহিত্যিক সব পর্যালোচনা, ছোট-বড়র নানান আসন- সেখানে কোথায় থাকবেন তিনি?
শেখ আবদুল হাকিম, প্রচলিত অর্থে, মহৎ-কালজয়ী সাহিত্যের জনক নন। আজীবন পাল্প-ফিক্‌শন, জনরা-ফিক্‌শনের মানুষ; সিন্ডিকেটেড-ঘোস্ট রাইটিংয়ের লোক। তাঁর মূল্যায়ন আমাদের সাহিত্য-বিশ্নেষণের চলতি আয়নায় হলে, দেখা যাবে না অনেক কিছুই। কপিরাইট, সাহিত্যের দায়, মৌলিকত্ব- সবের বাইরে গিয়ে এই হিসাব। মনে রাখা প্রয়োজন সেই সময়টাকে যখন দেশটা পরাধীন, স্বাধীন হলো মাত্র। বইপত্তর নেই, তথ্য নেই, টাকা নেই, কিছু নেই। তারও পরে, আশির দশকেও- এই নগরটা যখন প্রায় গ্রামীণ, একটাই মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল, যা খুব কম বাড়িতেই মেলে, ল্যান্ডফোনের লাইন যেন সোনার হরিণ, বিদেশযাত্রা অতি দুর্লভ এক অভিজ্ঞতা- তখন, ঠিক তেমন একটা সময়, অমন আধুনিক-বুদ্ধিদীপ্ত-প্রাপ্তমনস্ক গল্প টান টান-মেদহীন গদ্যে বলে যাওয়া, যে এক নব-বিচিত্র অভিজ্ঞতা সবের জন্যই, তাতে আর সন্দেহ কী!
কেউ কেউ আক্ষেপ করেন, 'আহা! উনি মৌলিক লিখলে কতসব রত্ন পেতে পারত আমাদের এই বাংলা সাহিত্য!' এমনটা কেউ বলতেই পারেন; কিন্তু কিসে কী হতে পারত, সে আলোচনা অহেতুক। শেখ আবদুল হাকিম যেটুকুই দিয়ে গেলেন- তাই তাঁকে আলোচিত করে রাখল।
তিনি যে অনেক ভেবেচিন্তে, পরিকল্পনা করে আমাদের সামনে হাজির করছিলেন ওই অদেখা দুনিয়া-না চেনা চরিত্র-অজানা গল্প; তা নয়। শেখ আবদুল হাকিমের পথচলায়, কী সাহিত্যিক কী পেশাগত, পেছনে তাকাবার-একটু থেমে দম নেবার-কী লিখেছেন তা ফিরে দেখবার ফুরসত তাঁর হয়নি কখনো। কাজটুকু তিনি করে গেছেন, তাঁর মতো করেই- খেটেখুটে, সাবলীল গদ্যে, অনাধুনিকতাকে পরিহার করে। এর মূল্য সাহিত্যিক বিবেচনার নয়, এর মূল্য কয়েকটা প্রজন্মের এক স্বপ্ন-যাত্রার।
মনে পড়ে, একবার বলেছিলাম, 'আপনি যে রোমান্টিক সিরিজে ছোট ছোট প্রেমের উপন্যাস লিখেছেন, সেগুলো কিন্তু তেমন জুতের লাগেনি আমার কাছে। আপনার ট্রেডমার্ক গদ্যটা আছে, কিন্তু বড্ড ছেলেমানুষি গল্প, আপনার ওই গদ্যের সাথে মানায়নি।' আমার কথাকে উড়িয়ে দিয়ে হাকিম চাচা বলেছিলেন, 'ভালো না লাগলে পড়তে গেছেন কেন? শুনুন, একটা মানুষের কাছে একটা সময়ে একটা বই দুরকম লাগতে পারে- হয় ভালো লাগবে, নয় লাগবে না। যেটা ভালো লাগছে না, সেটা পড়ে সময় নষ্ট করতে যান কেন? মনে রাখবেন, এই একটা জীবনে সময় বড্ড কম।'
আসলেই, এই একটামাত্র জীবনে সময় বড্ড কম। সেই কম সময়টুকু শেষ করে, আমাদের বিষণ্ণ করে, তাঁর সারাজীবনের মতোই শেখ আবদুল হাকিম যাত্রা করলেন আবারো- একাকী।