হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরে হাঁটে। বৈরাগ্য ভাব আছে বলে পাঞ্জাবিটা পকেট ছাড়া, রং হলুদ। কখনও কখনও তার হাঁটার গন্তব্য থাকে না, এমনি এমনিই হাঁটতে থাকে। বেখেয়ালি ছন্নছাড়া জীবনের এই হিমু মাঝেমধ্যে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠে, ভবিষ্যদ্বাণী করে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট হিমু চরিত্রের বেশকিছু ভক্তও আছে, যারা মনে করে, হিমুর মধ্যে রয়েছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা।

দুই মলাটবদ্ধ বইয়ের পাতার হিমু আন্দোলিত করেছিল অনেক তরুণকে। হিমু সিরিজের বই যেদিন বইমেলায় আসত, সেদিন অনেক তরুণকে হলুদ পাঞ্জাবি পরে হাঁটতে দেখা যেত। এমন হিমুদের নিয়ে সংগঠনও আছে। কলমের টানে এমনই এক চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন হুমায়ূন, যে হিমু ছাপ ফেলেছে অনেকের মনন ও চিন্তায়। বলা যেতে পারে রূপার কথা, যাকে চিন্তা করে অনেক তরুণীর কাছে নীল শাড়ি হয়ে উঠেছিল অধিক প্রিয়।

হিমু বা রূপা নয়, তাদের ছলে হুমায়ূন আহমেদই এক স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসেছেন পাঠকের হৃদয়ে। লেখা দিয়ে যিনি পাঠককে অভাবনীয় জগতে নিয়ে যেতে পারতেন এক তুড়িতে, আজ শনিবার তার ৭৪তম জন্মদিন। কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে শরীরের ভেতরের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে পেরে ওঠেননি তিনি। উচ্চতর চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে যাওয়ার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই না ফেরার দেশে চলে যান জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। এবারও নানা আয়োজনে পালিত হবে তার এ জন্মদিন।

হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটালেও তার শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। পরে উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তার দৃপ্ত পদচারণা। যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই পেয়েছেন মুঠোভর্তি সাফল্য। 'কোথাও কেউ নেই' নাটকের 'বাকের ভাই' চরিত্রটি তো রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করেছে। নাটকটির কলাকুশলীরা অনেক জায়গাতেই বলেছেন, নাটকটির শেষ পর্ব প্রচারিত হওয়ার আগে কানাঘুষা চলছিল যে, বাকের ভাইকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। তখন ঢাকার রাজপথে মিছিল হয়েছে 'বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে' স্লোগানে। হুমায়ূন আহমেদকে অনেকেই অনুরোধ করেছিলেন, নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি না দেখাতে। হুমায়ূন কারও কথা রাখেননি, শুনেছিলেন তার ভেতরের লেখক সত্তার আওয়াজ। শেষ পর্বে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির দৃশ্যটি এখনও অনেকের মনে গেঁথে আছে।

অথবা উল্লেখ করা যেতে পারে আরেক অনবদ্য চরিত্র মিসির আলীর কথা। মিসির আলীর 'হিউমার' এখনও বুঁদ করে রাখে পাঠককে। হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসে এমন চরিত্রগুলো সৃষ্টি করে আলোড়ন তৈরি করেন চারদিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ অধ্যয়ন শেষে ওই বিভাগেই প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। দুই দশক পর তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে নিজেকে পুরোপুরি যুক্ত করেন লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে। ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে' প্রকাশের পরপরই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পরে সেই খ্যাতিকে তিনি নিয়ে যান রীতিমতো তারকাস্থানে। হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিরও জনক।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে পরিণত করতে ও এগিয়ে নিতে হুমায়ূন আহমেদের অবদান অপরিসীম। এককভাবে বইয়ের বাজার সৃষ্টি করে ও প্রকাশনা শিল্পে অর্থপ্রবাহ তৈরির মধ্য দিয়ে এ শিল্পে গতিশীলতা নিয়ে আসেন তিনি। বেঁচে থাকা অবস্থায় তিনি ছিলেন অমর একুশে গ্রন্থমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। লাইন ধরে তার ভক্ত-অনুরাগীরা প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফসহ বই সংগ্রহ করতে একরকম যুদ্ধই করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পরও বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদের বই দেদার বিক্রি হয়।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাসের সংখ্যা দুই শতাধিক। তার লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমণি, লীলাবতী, কবি, সাজঘর, গৌরীপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, শ্রাবণমেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাব যাব, জোছনা ও জননীর গল্প প্রভৃতি। তার সর্বশেষ উপন্যাস 'দেয়াল'। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পটভূমিতে লেখা এ উপন্যাসটিও আকাশচুম্বী পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া তিনি রচনা ও পরিচালনা করেছেন বহু একক ও ধারাবাহিক নাটক এবং চলচ্চিত্র।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। জনপ্রিয় এ লেখকের মৃত্যুতে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিউইয়র্ক থেকে ২৩ জুলাই দেশে নিয়ে আসা হয় তার মরদেহ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পর্ব শেষে পরদিন তাকে সমাহিত করা হয় তারই হাতে গড়ে ওঠা নুহাশ পল্লীর লিচুতলায়।

হুমায়ূন আহমেদ তার দীর্ঘ চার দশকের সাহিত্যজীবনে উল্লেখযোগ্য প্রায় সব পুরস্কারেই ভূষিত হয়েছেন। একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়াও তার অর্জিত পুরস্কারগুলোর মধ্যে লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার, হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। দেশের বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। জাপানের এনএইচকে টেলিভিশন তাকে নিয়ে 'হু ইজ হু ইন এশিয়া' শিরোনামে ১৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ ও প্রচার করে।

নুহাশ পল্লীর কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বুলবুল সমকালকে জানিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উদযাপন করতে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিতের শুক্রবার রাতেই নুহাশ পল্লীতে চলে আসার কথা রয়েছে। সেখানে তার জন্মদিনের কেক কাটা হবে। এ ছাড়া আজ শনিবার পরিবারের পক্ষ থেকে হুমায়ূন আহমেদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে।