পেইন্টিং থেকে ভাস্কর্য, আবার ভাস্কর্য থেকে পেইন্টিংয়ে তার শিল্পযাত্রা। কঠিন পাথর বা ধাতবে মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বগুলো জলরঙের জাদুতে মূর্ছনা ছড়ায়। আর এখানেই শিল্পী হামিদুজ্জামান খান হয়ে ওঠেন অনন্য। এই বরেণ্য শিল্পী ও ভাস্করের শতাধিক ছবি ও ভাস্কর্য নিয়ে রাজধানীর গ্যালারি চিত্রকে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টায় শুরু হচ্ছে ৪৩তম একক শিল্প প্রদর্শনী- 'সৃষ্টির অন্বেষণে'।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম। অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত থাকবেন বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী এবং স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ।
প্রায় এক সপ্তাহ সময় নিয়ে প্রদর্শনীর জন্য শিল্পকর্মগুলো স্থাপন করেছেন শিল্পী নিজে। সমকালও ওই সময় একাধিকবার সেখানে গিয়েছে। শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছে। গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই অন্য এক প্রশান্তিতে আচ্ছন্ন হতে হয়। দেয়ালে ঝুলছে একের পর এক মুখাবয়ব, ল্যান্ডস্কেপ কিংবা কম্পোজিশন- কোথাও একঘেয়েমি নেই। সময়ের যন্ত্রণা আছে; আছে বিষাদ-বেদনা। তাপ-চাপে পাণ্ডুর হয়ে আসা মুখের, ঠিক পরেই পানির মধ্য থেকে পাখা ঝাপটে উড়ে ওঠা পানকৌড়ি দর্শককে স্পেস তৈরি করে দেবে। ১৪ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট প্রস্থের বিশাল ক্যানভাসে শিল্পী মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছেন মুষল বৃষ্টিঝরা রাতে। যেখানে চিৎ হয়ে পড়ে আছে শহীদের লাশ। হামিদুজ্জামানের ছবিতে কালো বা ধূসর রঙের আপাত বিষাদের মধ্যে হঠাৎ ঝলকে ওঠা লাল বা হলুদ রঙের ছটা দর্শককে আনন্দের উৎসমুখ দেখায়।
জলরং, অ্যাক্রিলিক এবং কালি-কলমে আঁকা প্রায় ১০০টি চিত্রকর্ম রয়েছে এ প্রদর্শনীতে। যেখানে শিল্পী এক ধরনের গবেষণার মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করিয়েছেন। প্রদর্শনীতে এক বসায় আঁকা ছবি যেমন রয়েছে, আবার দুই-তিন বছর নিয়ে এঁকেছেন এমন ছবির সংখ্যাও কম নয়। কালি-কলমে কাগজের ছোট ক্যানভাসের পাশাপাশি ২০ ফুট বা ১৪ ফুট দীর্ঘ ক্যানভাসেও মূর্ত হয়েছে তার বিমূর্ত ভাষা। সেখানে ফর্ম, টেক্সচার, লাইন, স্পেস আর রঙের মেলবন্ধন অদ্ভুত সুরেলা সিম্ম্ফনি তৈরি করে। এটিই কি তবে হামিদুজ্জামানের সৃষ্টির অন্বেষণ, যেখানে শিল্পীর ভাস্কর্য ও পেইন্টিং এক সুতোয় গাঁথা!
দেশে ও দেশের বাইরে হামিদুজ্জামান খানের প্রধান পরিচয় একজন আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তার ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছে। তবে শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নানা নিরীক্ষা, গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছেন। সেটা ভাস্কর্য হোক বা কালি-কলমে ড্রইং, প্রিন্ট অথবা পেইন্টিং। আর জলরঙের প্রতি রয়েছে তার ভিন্ন রকম দরদ।
প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ব্রশিয়রে প্রয়াত শিল্পবোদ্ধা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের একটি লেখা স্থান পেয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, 'পেইন্টার হামিদুজ্জামান ও ভাস্কর হামিদুজ্জামানের কোথাও একটা মিল আছে। দুই ক্ষেত্রে, পেইন্টিং ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে, একটা গতি জড়ানো, একটা গতির বিস্ম্ফোরণ পেইন্টিং ও ভাস্কর্যকে উন্মীলিত করে রেখেছে। যদি বলি, একজন সভ্য মানুষ ছুড়ে ফেলেছে নিজেকে ঢেকে রাখার বর্ম, তাহলে হয়তো ভুল বলা হবে না। নিজেকে উন্মোচিত করার, নিজেকে উন্মীলিত করার, নিজেকে মেলে ধরার দ্বৈত মাধ্যম হামিদুজ্জামান খুঁজে পেয়েছেন। প্রকৃতি কিংবা নিসর্গ কিংবা সত্যের দিকে অগ্রসর হয়েছেন। এই অগ্রসর হওয়াটাই তার কাজের অন্তঃসার। নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা। তার কাজ, তার পেইন্টিং ও ভাস্কর্যকে বিভিন্ন মোটিফ দিয়েছেন। তিনি চিৎকার করে বলেছেন, দেখো দেখো, এখানেই আমার কাজের স্পষ্টতা ও নিষ্ঠুরতা। এখানেই তিনি যুক্ত করে দিয়েছেন আলোক, রং ও বাতাসের শব্দ। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, চন্দ্র উঠেছে, বাতাস চঞ্চল করে, আর আমি হামিদুজ্জামানের অনুভূতিতে অনিঃশেষ বাতাসের চিৎকার শুনেছি- এই হচ্ছে আমার ভাস্কর্য। বাতাস জড়িয়ে ধরেছে বৃক্ষ, বৃক্ষ জড়িয়ে ধরেছে পাখি, পাখি জড়িয়ে ধরেছে জনস্রোত, জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে শিল্পীর চোখ। এই শিল্পী আমি, হামিদুজ্জামান, আর কেউ নয়। ইউরোপের তুষার ও ঢাকার বৃষ্টির মধ্যে আমি হামিদুজ্জামানকে এভাবেই ভিন্নভাবে বুঝতে শিখেছি।'
শিল্পী হামিদুজ্জামান খান তার এই 'সৃষ্টির অন্বেষণে' সম্পর্কে বলেন, 'আমি জলরং করার জন্য ব্রাশটা যখন হাতে নিই, তখন ফর্মটা দ্রুত আসে। আমি মনে করি, পেইন্টিংয়ে অনেক দূর যাওয়া যায়। সবার ওপরে পেইন্টিং, তারপর ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের উপাদানগত একটা বিষয় থাকে, সেই উপাদানকে বুঝতে হয়। পেইন্টিং ও ভাস্কর্য দুটি বিষয়ই কিন্তু কঠিন। তবে পেইন্টিং অনেকভাবে করা যায়। সেই জায়গা থেকেই আমি শেষ বয়সে এসে একটা এক্সপেরিমেন্টাল পেইন্টিং করার চেষ্টা করেছি। পেইন্টিংয়ে কতদূর যাওয়া যায়, কতভাবে যাওয়া যায়, সেটার একটা চেষ্টা করেছি। এটা একটা গবেষণার মতো। এ কাজটি করছি তিন-চার বছর ধরে। কোনো কোনো কাজ আমি তিন বছর ধরে লেয়ারের পর লেয়ার দিয়েছি। একটা ছোট্ট কাজ, কিন্তু বারবার করেছি। সেটা থেকে আমার এই ডেভেলপমেন্ট। এভাবেই পেইন্টিংয়ে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। এই প্রদর্শনীতে সেটার একটা প্রকাশ থাকবে।'
আজ শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।