১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলার মানুষের আর্থ-সামাজিক মুক্তি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের যেসব অঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মধ্যে একটি সিলেটের ভাটি অঞ্চল শাল্লা। এই শাল্লার অধিবাসীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের চাহিদা থেকেই স্যার ফজলে হাসান আবেদ, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন মহান মানুষের উদ্যোগে ১৯৭২ সালে ব্র্যাকের জন্ম। লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই জন্মলগ্ন বা বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বর্তমান অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দী অব্দি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, জনসাধারণের অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে ব্র্যাকের অবদানের সুস্পষ্ট চিত্র নিয়ে অসাধারণ একটি গ্রন্থ “আমার ব্র্যাক জীবন : একজন উন্নয়ন কর্মীর বেড়ে ওঠা”।  

ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী রচিত এই আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। বইটিতে ব্র্যাকের সাথে লেখকের কর্মজীবনের ৪২ বছরের স্মৃতির নানা দিক উঠে এসেছে।  

মূলত ১৯৭৭ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ের পাশাপাশি কিছু আগেকার সময়ের যেমন ১৯৬৪ ও ১৯৭১ সালের কথাও এসেছে। তবে বিশেষ করে ব্র্যাকে যোগদানের পরের কথাগুলোই লেখক তার সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন।

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠার ঠিক পাঁচ বছর পর ১৯৭৭ সালে লেখক একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ব্র্যাকের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেরর ওপর গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। এর পরের বছরগুলোতে দেশের মানুষের উন্নয়নে ব্র্যাকের নেয়া উদ্যোগের পরিধি যেমন বাড়তে থাকে তার সাথে লেখকের কর্মপরিধিও বেড়েছে। একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে ব্র্যাকে যোগদান করে পরবর্তীতে গবেষণা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এবং সবশেষে ভাইস চেয়ারপার্সন হিসেবে কাজ করেছেন লেখক। অর্থাৎ তাঁর জীবনের সিংহভাগ ব্র্যাকের বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথেই কেটেছে। আর তারই বিশদ বর্ণনায় এই ২৮৫ পাতার বইটি লেখা। সেই অর্থে বইটির নামকে যথার্থই বলা যায়।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশকে আর্থসামাজিকভাবে সমৃদ্ধ করতে ব্র্যাক তার নানারকম কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলো। সে সকল কর্মকাণ্ডের বিচিত্র অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে লেখকের জবানিতে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলার জন্য ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে নানারকম তথ্য ও স্মৃতি আছে। এরপর আশির দশকের প্রথম দিকে কৃষি ক্ষেত্রে কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক। যার মধ্যে ছিল মাঠকৃষি, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং মৎস্য চাষ। কৃষকদের বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের ফসলের বীজ দেওয়া হতো। ব্র্যাক নারীদের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে সাহায্য করেছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ যে আজ তৃতীয়  স্থান দখল করেছে তাতে ব্র্যাকের অবদান লক্ষণীয়। ব্র্যাক শুধু নারীকর্মী বা শুধু পুরুষকর্মী নিয়ে কাজ করেনি, নারী ও পুরুষ উভয়কে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে তাদেরকে নিয়ে কাজ করেছে। এই সব উদ্যোগই ব্র্যাককে বিশ্বের সেরা এনজিওতে পরিণত করে। সত্তর দশকের প্রথম দিকে বছরে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি ডায়রিয়া সংক্রান্ত পানিশূন্যতায় মারা যেত, যার সিংহভাগই ছিল শিশু । ওরস্যালাইন এর ব্যবহার ব্যয়বহুল হওয়ায় 'ওটেপ' বা 'ওরাল'  থেরাপি প্রোগ্রামের মাধ্যমে গ্রামের প্রতিটি মাকে লবণ-গুড় স্যালাইন তৈরি নিখুঁত ভাবে শেখানোটা ছিল ব্র্যাকের এক যুগান্তকারী কর্মসূচি, যেখানে অনেক বড় অবদান রেখেছেন আহমদ মোশতাক  রাজা চৌধুরী। তার পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয়ই ছিল এই 'ওটেপ'।  

'ঊষালগ্নের সাড়ে পাঁচশ দিন'-এ লেখক তাঁর জীবনের প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি ব্র্যাকের উন্নয়ন কর্মকাোণ্ডর ওপর গবেষণা শুরু করেন। প্রথম গবেষণা কর্মী হিসেবে সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করতে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে সেগুলো থেকে উত্তরণের জন্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তার কোন বিশদ আলোচনা এখানে নেই । লেখক যদি তার অর্জনের পাশাপাশি প্রতিকূলতার কথাগুলোও তুলে ধরতেন তা থেকেও আমরা ঋদ্ধ হতে পারতাম ।  

লেখক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী যখন কাজ শুরু করেন তখনকার দিনে ব্র্যাক কী তা ব্যাখ্যা করে সবাইকে বোঝাতে হতো । আজ আর তার দরকার হয়না। এক্ষেত্রে একটা বড় অবদান আছে ব্র্যাক-এর বিভিন্ন কাজের ওপর লেখকের গবেষণা এবং সেগুলো নানাভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার মধ্যে।

সপ্তম অধ্যায়ে ১৯৯৭ সালের রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থানুকূল্যে চালিত গবেষণা প্রকল্পের এক ঐতিহাসিক সভা এবং এ সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবে পাঠক। ২০০৪ সালে সিএফআর এর নিউইয়র্ক অফিসে স্বাস্থ্যক্ষত্রে উদ্যোক্তাদের নিয়ে সভায় ব্র্যাক সম্পর্কে বক্তৃতা করেন  লেখক। বক্তৃতায় কীভাবে ব্র্যাক বাংলাদেশের দারিদ্র নির্মূল করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে ল্যানসেটে লেখকের একটি লেখা প্রকাশ হয়, যেখানে উল্লেখ আছে খাবার স্যালাইন কীভাবে আমাদের সংস্কৃতিতে একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়ে গেছে। এভাবে লেখক যে তার গবেষণা এবং লেখার মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ব্র্যাককে ও নিজের মাতৃভূমিকে তুলে ধরেছেন সে বিষয়টিও বইটির মধ্যে উঠে এসেছে।

২০১৫ সালে যে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ পান স্যার ফজলে হাসান আবেদ, এটা ছিল ব্র্যাকের কৃষি ও খাদ্যক্ষেত্রে অবদানে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। এখানে লেখকের অবদান ছিল অসামান্য। পেশাজীবনে লেখক নিজেও অসংখ্য স্বীকৃতি লাভ করেছেন তার কাজের মাধ্যমে।

বইটি পড়ে আমাদের মনে হয়েছে যে এ বইটি থেকে লেখকের দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজেদের জীবনে কাজে লাগানো যায় এরকম বিভিন্ন ধরণের বিষয় রয়েছে । যেমন, তিনি কখনো কোন কাজকে ছোট মনে করেননি । তিনি প্রথমত ব্র্যাকের গবেষণা কর্মী হিসাবে কাজ করেন। এবং জীবনের এক পর্যায়ে এমনকি একজন ওয়েটার হিসাবেও কাজ করেছেন। বিদেশে থাকার প্রস্তাব পেলেও প্রত্যাখান করেন, শুধুমাত্র দেশের কথা ভেবে এবং ব্র্যাকের কথা ভেবে।  তিনি যখন বিদেশে পড়ালেখা করার জন্য গিয়েছিলেন, তখন পড়ালেখা শেষ হয়ে গেলে তাকে বিদেশেই থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি উত্তরে বলেছিলেন যে, 'এই দেশে নিশ্চিন্তে থাকা যায় সত্য, কিন্ত এখানে তো আমি থার্ড ক্লাস সিটিজেন। আর বাংলাদেশ আমার দেশ, খাওয়া-থাকার সমস্যা থাকলেও সেখানে আমি ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেন'।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের স্বল্প শিক্ষিত নারীদের স্বাস্থ্যসেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষিত করার কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক। এরই রেশ ধরে ২০১২ সালে মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি 'ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি' কোর্সটি চালু হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আজ আমরা এই কোর্সেরই ছাত্রী। কিন্তু এ বইতে এই প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা নেই । বইটিতে যদি এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হত তবে ভবিষ্যৎ মিডওয়াইফ হিসেবে আমাদের জানার জায়গাটা আরো পরিস্কার হতো।

লেখক : মেহেরুন নেসা, তানিয়া আক্তার, আশা খাতুন, শামিমা রাফিন, রানী আক্তার ও মানসুরা আক্তার। এরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের 'ডেভেলপিং মিডওয়াইভস প্রজেক্ট'-এর ঢাকা একাডেমিক সাইটের ছয় জন শিক্ষার্থী।