'তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন/ সূর্যের মতন।/ রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।/ উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে/ চিরনূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ'- এভাবে চিরনূতনের মধ্যে নিজের আবির্ভাবক্ষণকে অনুভব করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চেয়েছেন সূর্যের দীপ্তি দিয়ে ভুবনকে আলোকিত করতে, নিজেকে উন্মোচন করতে।

আমৃত্যু কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ধাবমান রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন হাজার বছরের পথিকৃৎ বাঙালি। তার কাব্যছন্দ, সুরের ডালা আর সরল লেখনীর মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে প্রত্যেক বাঙালির। মুক্ত স্বদেশে এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ভাষণেই মনে করেছিলেন তাকে; অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছিলেন, 'কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে...।'

আজ রোববার পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জয়ন্তী আজ। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যকে অতিক্রম করে তিনি তার জীবনব্যাপ্ত কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পৌঁছেন শান্তিনিকেতনে। মা সারদাসুন্দরী দেবী এবং বাবা বিখ্যাত জমিদার ও ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোল আলো করে পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসেন ১২৬৮ বঙ্গাব্দে। সারাজীবনই যার কামনা ছিল, 'যা পেয়েছি প্রথম দিনে তাই যেন পাই শেষে/দু হাত দিয়ে বিশ্বরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে।'

পঁচিশে বৈশাখের আয়োজনে নৃত্যশিল্পী অনিন্দিতা রায় সেজেছেন রাবীন্দ্রিক সাজে। ছবি-সমকাল

তার বাণীর ঐশ্বর্যে, ভাষার নৈপুণ্যে ও মানবিক মাঙ্গলিকতার বোধে এখনও আমাদের শিশুর মতোই ছুঁয়ে যান তিনি, মোহিত করেন, আনন্দিত করেন, উদ্বুদ্ধ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে দিয়েছেন বিকাশের চূড়ান্ত সোপানে। 'গীতাঞ্জলি' রচনা করে ১৯১৩ সালে তিনি নিয়ে আসেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। উর্বর করেছেন তিনি চিত্রকলাকে আধুনিকতার ধারণা দিয়ে।

নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি এ দেশে শাহজাদপুরের দরিদ্র কৃষকদের ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন তিনি।

পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের 'নাইটহুড' উপাধি ত্যাগ করেন। এভাবে বারবার সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতার ঘোষণা দিয়েছেন সমাজসচেতন রবীন্দ্রনাথ। তিনি একমাত্র গীতিকবি, যার রচিত ভিন্ন ভিন্ন সংগীত ভিন্ন দুটি দেশে জাতীয় সংগীত হিসেবে গীত হয়। তার রচিত 'আমার সোনার বাংলা' ও 'জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে' গান দুটি যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত।

দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি

রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণ ডিহি-পিঠাভোগে উদযাপিত হচ্ছে সরকারি আয়োজনে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানীতেও সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করবে। দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। সরকারি-বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

রবীন্দ্রজয়ন্তীর সরকারি মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে। দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি। স্বাগত বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর।

স্মারক বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় নৃত্যনাট্যসহ ৩০ মিনিটের সাংস্কৃতিক পর্ব থাকবে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে শিল্পকলা একাডেমি তিন দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনী এবং কবির ওপর নির্মিত ডকুমেন্টারির মাসব্যাপী প্রচারের ব্যবস্থা করছে।

এবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'মানবতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ'। এ ছাড়া বাংলা একাডেমিসহ সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থা এ উপলক্ষে বিশেষ আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। এ ছাড়া কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে ঢাকার রবীন্দ্রসরোবরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

ঢাকাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, রচনা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হবে। এ ছাড়া কবির স্মৃতিবিজড়িত জেলাগুলোসহ সব জেলায় বিশ্বকবির ছবি, কবিতা, পরিচিতি ও চিত্রকর্ম প্রদর্শন এবং বিভিন্ন সড়কদ্বীপে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ও ডিজিটাল ডিসপ্লে স্থাপন এবং আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে এবার জাতীয়ভাবে তিন দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। করোনার কারণে গত দুই বছর এই অনুষ্ঠান না হওয়ায় এবারের আয়োজনকে ঘিরে রবীন্দ্রপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, 'এবারে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে শিলাইদহে। এ জন্য সব ধরনের আয়োজন শেষ করা হয়েছে। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলবে। দেশি শিল্পীরা ছাড়া ভারতীয় শিল্পীরাও এবার শিলাইদয়ের এ আয়োজনে যোগ দেবেন।'

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, জেলা প্রশাসন শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। 'হে নূতন, দেখা দিক আরবার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ'- কবিগুরুর এই গান ও আলোক প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে আজ সকাল ১০টায় রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি মিলনায়তনে উদ্বোধন করা হবে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, আত্রাই উপজেলার পতিসর কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে সাত দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে রবীন্দ্রমেলার।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান জানান, কাছারিবাড়ি চত্বরে অবস্থিত দেবেন্দ্র মঞ্চে আজ সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে স্মারক আলোচনা সভা। এতে উপস্থিত থাকবেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি। আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে বিকেল আড়াইটা থেকে শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, কুমিল্লা কচি-কাঁচার মেলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি নিয়েছে।

কুমিল্লা কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ জানান, জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে আজ সকাল ৯টায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে এবং দিবসটি উপলক্ষে সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বিষয় : পঁচিশে বৈশাখ

মন্তব্য করুন