তারুণ্যের চোখে বঙ্গবন্ধু

পৃথিবীকে দিয়েছেন নতুন মানচিত্র

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নাঈম মোসাদ্দেক মৃদুল

রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। মুক্ত-স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের চোখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি...

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বাংলার বুকে জন্ম নিল এক শিশু, যে শিশুর অন্তরে লুকিয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সৃষ্টিকর্তা যাকে নির্বাচিত করেছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আস্থা ও ভরসার প্রতীক হিসেবে।

সংগ্রামী, স্পষ্টভাষী, বাংলার আপামর জনগণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু যখনই তার লেখা পড়েছি কিংবা কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তার বজ্রকণ্ঠে ৭ই মার্চের ভাষণের ধ্বনি, মনে হয়েছে তিনি যেন আমার সঙ্গেই কথা বলছেন। তার আপসহীন অবয়ব ফুটে উঠেছে আমার চোখে। এভাবেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি সময়ের বাধা পেরিয়ে পৌঁছে গেছেন? আজকের তরুণদের মাঝে।

তিনি ছাত্রসমাজকে সম্বোধন করে বলতেন, 'ছাত্র ভাইয়েরা শোন' কিংবা 'আমার ছাত্র ভাইয়েরা'। কত সহজেই না তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন! ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্বগুণ স্পষ্ট ছিল বঙ্গবন্ধুর মধ্যে। জনতাকে চালনার শক্তি নিয়েই তিনি যেন জন্মেছিলেন। গোপালগঞ্জের সতীনাথ একাডেমিক স্কুল টিমের দুর্ধর্ষ সেন্টার ফরোয়ার্ড নিজ স্কুলকে জিতিয়ে যেদিন জয়ের আনন্দে প্রধান শিক্ষককে এসে বললেন- 'স্যার, আমরা জিতেছি'। প্রধান শিক্ষক তার প্রিয় ছাত্রের ভেতর সেদিন যেন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তার চোখে দেখেছিলেন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। তাই তিনি কিশোর মুজিবুরকে বলেছিলেন সেদিন- 'আমি খুব খুশি হয়েছি তোমাদের জয়লাভে কিন্তু এর চেয়েও বেশি খুশি হবো জীবনে চলার পথে কোনো কঠিন সংগ্রামে যদি জয়ী হতে পারো।' জয়ী তিনি হয়েছিলেন, সেসঙ্গে জয়ী করেছিলেন এ দেশের জনগণকে, এ দেশের জনগণের আজন্ম লালিত স্বপ্নকে।

ক্ষমতার লোভ তার কখনও ছিল না। তিনি মানুষকে তাই ক্ষমতার লোভ দেখাননি। বাংলার অসহায় দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'মজদুর, কৃষকদের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদেরও সেই অধিকার থাকবে। এর বেশি অধিকার তারা পেতে পারে না।' তিনি আরও বলেছিলেন, 'আজ যে কাজ করবে, লোকে তাকে কত ভালোবাসে তার ওপর নির্ভর করবে তার প্রমোশন। প্রমোশনের ব্যাপারে গরিব, অল্প বেতনভোগী কর্মচারীদের অধিকার থাকবে।' অতি সাধারণ জীবনযাপন এবং শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষকে কাছে টেনে নেওয়া ও ভালোবাসার শিক্ষাটা আমরা ধারণ করতে পারি জাতির পিতার জীবনী থেকে, যা একুশ শতকে দুর্লভ। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে এই সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন- 'এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই। যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের, সেই আঘাত করতে চাই এই ঘুণেধরা সমাজব্যবস্থাকে।' পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার সুখ আস্বাদন করানোর পাশাপাশি তিনি যেন বাঙালি জাতির উন্নতির মূলমন্ত্রগুলো বলে দিয়েছেন আমাদের। তিনি চেয়েছিলেন বন্ধুত্ব, চেয়েছিলেন শান্তি।

দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় এবং প্রান্তিক জনগণের জন্য নূ্যনতম স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সেই সময়ে গৃহীত ১০ শয্যার থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বিশ্বে আজও সমাদৃত একটি মডেল। তিনি প্রতি জেলায় একটি করে জেলা হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তৎকালীন সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না। নবীন চিকিৎসকদের জন্য এমবিবিএস পাসের পরপরই তিনি সর্বপ্রথম ইনসার্ভিস ট্রেনিং বা ইন্টার্নশিপ নামক বৈতনিক প্রশিক্ষণ চালু করেন। তাদের প্রশিক্ষণকালীন সময়কে নিয়মিত চাকরির অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এক বছর প্রশিক্ষণ শেষেই সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থায়ী চাকরি হিসেবে পদায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু ইঈচঝ (BCPS (Bangladesh College of Physicians and Surgeons)-কে আইনগত কাঠামো করে সাংগঠনিক রূপদান করেন। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের এমবিবিএস পরবর্তী উচ্চশিক্ষার তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বঙ্গবন্ধু দেশে উচ্চ প্রশিক্ষিত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তৎকালীন 'শাহবাগ হোটেল'কেই 'IPGMR (Institute of Post Graduate Medical and Research)'-এ রূপান্তরিত করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে পূর্ণাঙ্গ এবং দেশের সর্বপ্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি আমাদের বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম ও নিষ্ঠাকে অন্তরে লালন করে তার দেখানো পথে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারবে ইনশাআল্লাহ। কারণ এর সূচনা হয়েছিল এমন একজন মানুষের হাত ধরে যিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, যার বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হতো সমুদ্রের গর্জন, যার চোখে ভষ্ফ্ম হতো অশুভ শক্তি, সেই অশুভ শক্তির শৃঙ্খল ভেঙে প্রত্যাশিত রঙিন ভোরে যিনি হৃদয়ের মণিকোঠায় এঁকেছিলেন এক চিত্র সোনার বাংলার, পৃথিবীকে দিয়েছিলেন এক নতুন সীমারেখার মানচিত্র আর আকাশে উড়িয়েছিলেন লাল-সবুজের নতুন পতাকা।

লেখক, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল ও বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ৩০ ও ৩৫তম