নারী, রাজনীতি ও অধস্তনতা

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাদেকা হালিম

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য নারীর অবস্থান উন্নয়নের লক্ষণ বলে একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে (UN Women, October 5, 2020)। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বর্তমানে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব খুবই নগণ্য পর্যায়ে রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে কেবল ২৪ দশমিক ৩ ও ২০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী রয়েছে (Inter-Parliamentary Union, October 3, 2020), মাত্র ১১ জন নারী রাজ্য ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং ১২ জন সরকারপ্রধান (জুন ২০১৯ পর্যন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন (UN Women, October 5, 2020)। নারীর এমন প্রতিনিধিত্বের অভাব তাদের অধস্তনতা আরও বৃদ্ধি করেছে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত, সংসদীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল (এক কক্ষ, নিম্ন ও উচ্চসভা একত্রে) নর্ডিক দেশগুলোতে ৪৪ শতাংশ, আমেরিকার অঞ্চলগুলোতে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, নর্ডিক দেশসহ ইউরোপে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ, নর্ডিক দেশ ছাড়া ইউরোপে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ, সাব-সাহারা আফ্রিকায় ২৪ শতাংশ, এশিয়ায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ (Inter-Parliamentary Union, October 3, 2020))। এ আটটি অঞ্চলের মধ্যে এশিয়া ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান আরও নিচে।

বাংলাদেশে নারী ও রাজনীতি

বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠে নারীরা ঐতিহাসিকভাবে নীরব নয়। পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক কাঠামো ও ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে নারীরা কর্মী হিসেবে সরব থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য। অবিভক্ত বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ড. প্রভাবতী দাশগুপ্ত, সন্তোষকুমারী দেবী, সুধা রায়, সুলতানা মোয়াজ্জেদা প্রমুখ মহীয়সী নারী। ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক চটকল আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন দখমৎ বিবি, যিনি সাধারণ শ্রমিক থেকে হয়ে উঠেছিলেন অবিসংবাদিত শ্রমিক নেত্রী। বাংলায় কৃষক আন্দোলনে নারীদের লড়াকু ভূমিকা ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। টঙ্ক ও তেভাগা আন্দোলনে আদিবাসী নারীরা ব্যাপকভাবে অংশ নেন। টঙ্ক আন্দোলনে রাশমনি হাজংসহ অনেকেই শহীদ হন। কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোলে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত করেন। নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব এসব আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। দেশভাগের পরও নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

'পূর্ব পকিস্তান' আমলে বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ভাষার অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার, স্বাধিকারের আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফল স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৪ জন নারী আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। এরপর নারীর অধিকার নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন নারী আন্দোলনের একটি মাইলস্টোন। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে শামসুন্নাহার মাহমুদ নির্বাচকমণ্ডলীর বিলের সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কবি সুফিয়া কামালের অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মৌলবাদী শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের পুনরুত্থান ঘটলে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এ অপশক্তিকে নির্মূল করতে সারাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৯৫২ থেকে শুরু করে দেশের সকল প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভা থেকে ছাত্রীরা প্রথম ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাস্তায় বের হন। এতে অনেক নারী আহত এবং গ্রেপ্তার হন। ১৯৬০-এর স্বাধিকার আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে কমিউনিস্ট ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্রীরা ব্যাপকভাবে যুক্ত হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ শুরু করেন। মতিয়া চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬০-এর দশকজুড়ে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ছাত্রীরা সারাদেশে বিভিন্ন আন্দোলনে সংক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এক পর্যায়ে '৬৯ ও '৭০ সালে স্বাধীনতাকামী ছাত্রলীগের ছাত্রী ব্রিগেড গঠিত হয়। এখানে ছাত্রীরা সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ও অনেক ছাত্রী প্রত্যক্ষভাবে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে মাহফুজা খানম ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রীরা ও বিভিন্ন পেশার নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮০-এর দশকে শিরীন আখতার জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রীদের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। ১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও সূর্যাস্ত আইনবিরোধী আন্দোলনে নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে দুটি বৃহৎ দলের উদ্যোগে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সামাজিক আন্দোলন করতে দেখা যায় না। কেবল বামপন্থি দলগুলোকে সামাজিক ইস্যুতে আন্দোলনমুখর হতে দেখা যায়। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংগঠন নির্বাচন হয়নি প্রায় তিন দশক। ২৮ বছর পর ১৯৭৩ আদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। অধিকাংশ তরুণের কাছে রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সামাজিক বিষয়গুলোতে বিতর্ক কেবল ফেসবুকে সীমাবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক সমাজ, নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার মূল্যবোধ কি এখন কাজ করছে? কাজ করলেও তা সীমিত পরিসরে।

রাজনীতির বৃহৎ পরিসরে নারীর সীমিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়। বর্তমানে একাদশ সংসদে ১৯ জন নারী সরাসরি সংসদ সদস্য ও ৫০ জন সংরক্ষিত সদস্য রয়েছেন। ১৯৭৩ সালে নারীর জন্য ১৫টি সংরক্ষিত আসন ছিল জাতীয় সংসদে। ১৯৯১ সালে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বেড়ে হয় ৩০টি, ২০০৪-এ ৪৫টি এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৫০টি। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের মূলধারার রাজনীতি এবং ভোটারদের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কোনো যোগাযোগ নেই। সংসদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের নির্বাচিত করে। রওনক জাহান (১৯৯৫) উল্লেখ করেন, কদাচিৎ সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা নারীর সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কঠিন প্রশ্নের অবতারণা করেন। সংরক্ষিত আসনের নারীরা কেবলই Status quo বজায় রাখেন। সীমিত অংশগ্রহণের সুযোগ সত্ত্বেও কিছু নারী সদস্যকে বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সরব দেখা যায়। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারীরা সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ পাননি। পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক সরকার কর্মক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করে এবং সংসদে ৫ থেকে ১০ শতাংশ সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়। উন্নয়নে নারী দৃষ্টিভঙ্গির (Women in Development) আলোকে নারীর কোটা নির্ধারণ করা হয়। তৎকালীন সামরিক সরকার তাদের ভিত্তিকে মজবুত করার উদ্দেশ্যে দাতাদের সহযোগিতায় নারীকে উন্নয়নে সম্পৃক্ত করে। সামরিক সরকার দাতাসংস্থাগুলোর সাহায্য বাড়ানোর জন্য তাদের প্রিয় বিষয় নারী উন্নয়নে সম্পৃক্ততা সহজেই গ্রহণ করে নেয় (জাহান :১৯৯৫)। বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী নারী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী- এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। এই তিন নারীর অবস্থান নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারীকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুকূলে নয়। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা ছিল ২৯০০। ২০১৪ সালের ৪৫৮টি উপজেলা নির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫০৭ জনে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে উপজেলা নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে ৪৮ শতাংশ। ১৯৯৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথম সরাসরি ১৩ হাজার ৫০০ পদে এক লাখ ৮০ হাজার নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৩ সালের নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় এক লাখ ২৪ হাজার জনে। সর্বশেষ ২০১১ সালের নির্বাচনে তা আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ৯০ হাজার জনে। মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ৫০ শতাংশ কমে গেছে। নারীবাদী বিশ্নেষকদের মতে, এই নিম্নহারের অংশগ্রহণ হতে পারে ধর্ম কর্তৃক লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা নির্ণয় (ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম), রাজনীতি কেবল পুরুষের কাজ, এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তাকে যে স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা দেবে সেটি পুরুষপ্রধান সমাজে কাম্য নয় (সাদেকা হালিম ২০১৬)।

রাজনীতিতে নারীর যত বাধা

দক্ষিণ এশিয়ায় পিতৃতান্ত্রিকতা নারীর বিভিন্ন দিকে পিছিয়ে পড়ার মূলে। এই পিতৃতান্ত্রিকতার দুটি অবয়ব আছে, একটি (Public) প্রকাশ্য ও অন্যটি (Private) গোপনীয় (Sylvia, 1996)। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে প্রকাশ্য বাধাগুলো হলো- মাস্তান সংস্কৃতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, কালো টাকা ও যৌন নিপীড়নের ভয়। গোপনীয় বাধাগুলো হচ্ছে- নারীর নিজের আয়কৃত অর্থের নিয়ন্ত্রণের অভাব, পারিবারিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বামী ও তার পরিবারের সক্রিয় সহায়তার অভাব। নারীর বৈবাহিক অবস্থা ও বয়স কখনও কখনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় (Chowdhury, 2013)।

রওনক জাহান (১৯৮৭)-এর মতে- অর্থ, সময়, অভিজ্ঞতা, পৃষ্ঠপোষকতা, যোগাযোগ ও তথ্যের অভাব দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে অন্যতম অন্তরায়। রওনক জাহান উল্লেখ করেছেন, পেশিশক্তি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম উপাদান, যা নারীর ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ফলে, এক্ষেত্রে নারীরা তাদের পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। এছাড়াও, অন্য অন্তরায়গুলোর মধ্যে আছে- অর্থাভাব, নারী বিদ্বেষ (Agarwaland Ravishankar, August 17, 2020), দলের অভ্যন্তরীণ অগণতন্ত্র, জেন্ডার কুসংস্কার ও সংস্কৃতি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সম্পদের অভাব (True et al., 2012)।

নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের পেশিশক্তির ব্যবহার বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। যেমন- হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক ক্ষতি বা জবরদস্তি, হুমকি ও আর্থিক চাপ। এটি লক্ষণীয় যে, রাজনীতিতে পুরুষও সহিংসতার মুখোমুখি হয়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রভাব, উদ্দেশ্য ও মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে, যা বৈষম্যের একটি স্পষ্ট কারণ। এটি সমাজে নারীকে অধস্তন অবস্থানে রাখতে ব্যবহূত হয় এবং জনসাধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্বকে প্রভাবিত করে। নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অনেক নিচে, কারণ এটি অনেকাংশেই পুরুষের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। নারীরা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো দ্বারা অপমান, চরিত্রের ওপর হামলা, পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়েও হয়রানি ও অসংখ্য সমস্যার মুখোমুখি হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে সীমিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বস্তরে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অন্যতম অন্তরায়। দক্ষিণ এশিয়ায় মূলত নারীরা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এই অঞ্চলে প্রধান দলের নেতৃত্ব একই পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মকে দেওয়া হয় (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ)। সাধারণ পরিবারের নারীকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীবান্ধব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু করতে হবে। যতক্ষণ দলগুলো পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নারীর জন্য কোটাও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারবে না।

সমাজবিজ্ঞানী Gail Omvedt (2005)-এর মতে, নারীর রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার একটি অন্যতম অন্তরায় হলো পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা নারী ছাড়া সাধারণ নারীকে জনজীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকায় নিরুৎসাহিত করা হয়। সাংস্কৃতিক, প্রথাগত এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিকতার জন্য একথা প্রায়ই ব্যবহূত হয় যে নারীর ন্যায়সংগত স্থান রাজনীতিতে নেই।

রাজনীতিতে নারীর অগ্রায়ণ

পুরুষতান্ত্রিক পক্ষপাতদুষ্টতা রোধ করার জন্য, স্কুলে শিশুদের পাঠ্যক্রমের বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে লিঙ্গ সংবেদনশীলতা শেখাতে হবে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে বাধা দেয় এমন সংস্কৃতি বাতিল এবং লিঙ্গ-প্রতিক্রিয়াশীল বাজেটিং ও লিঙ্গ সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মোকাবিলা করা যেতে পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাম্প্রতিককালে নারীর প্রতি ধর্ষণ বৃদ্ধিতে অন্যতম কারণ চিহ্নিত হয়েছে। ধর্ষণের শিকার অনেকেই নির্যাতনের পর পুনরায় মানহানি ও হয়রানির ভয়ে এগোতে চায় না। আবার বিচার পায় মাত্র ৩ শতাংশ। আইনে কোনো নারী ধর্ষিত হলে তাকে প্রমাণ করতে হয় তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে (২০২০)। জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করায় রাষ্ট্রকে অভিনন্দন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সমতা প্রকাশের জায়গা থেকে ধর্ষণ নারীকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বানিয়ে রাখার অস্ত্র। ডিএনএ পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ প্রমাণের বোঝা এখনও নারীর ওপর। এখনও ধর্ষণের ঘটনায় সমঝোতা হয় গ্রাম্য সালিশে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ঘরোয়া সহিংসতা মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন পেনাল কোড এবং নারী সুরক্ষা আইন রয়েছে, কিন্তু রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া নারীরা যে ব্যাপক হারে সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে তা স্বীকার করা এবং এটি মোকাবিলা করার জন্য আইন তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি স্বীকৃতি না পায়, তবে এই নির্দিষ্ট সহিংসতা সাম্যের বিরোধী হয়ে উঠবে এবং তা ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক রূপ নিতে পারে (Agarwaland Ravishankar, August 17, 2020)|)।

নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ। যতক্ষণ তারা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের এই অবহেলিত অবস্থা চলতে থাকবে। তাই ইউনিয়ন পরিষদসহ জাতীয় সংসদে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি, যা এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক নয়। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা ও র‌্যালিতে নারীকে ব্যবহার করা হয়। তাই আরেকটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো নীতিগত হস্তক্ষেপ করা, যাতে করে নারী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। নীতিগত হস্তক্ষেপ বলতে নীতিনির্ধারণকারীর পরিবর্তন, আইন সংশোধন বিশেষ করে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন, হিন্দু আইন প্রভৃতি বোঝায়। তাই সম্পত্তিতে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে (সাদেকা হালিম, ২০১৬)। হাজারো প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নারী যখন রাজনীতিতে এগিয়ে যায়, তথা সে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে পরিণত হয়। তাকে নানাভাবে অধস্তন করে রাখার ও দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে নারীকে দমিয়ে রাখতে তাদের হত্যা ও হত্যাচেষ্টাও করা হয়েছে। যেমন- ইন্দিরা গান্ধী (১৯৮৪ সালে ভারতে) ও বেনজির ভুট্টো (১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে) হত্যাকাণ্ড এবং চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা (শ্রীলঙ্কায়) ও শেখ হাসিনা (বাংলাদেশে) প্রায় ২১ বার হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন। নারীর রাজনৈতিক অভিযাত্রার বাধাগুলো অপসারণ করতে হবে। তবেই নারী হবে অপ্রতিরোধ্য, অদম্য।

লেখক, ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক তথ্য কমিশনার