আত্মসূত্র

মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও পাকিস্তানের জজবা

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও পাকিস্তানের জজবা গোপূজা ও গোহত্যা- এই দুই বিপরীত ধর্মী আচরণ হিন্দু ও মুসলমানকে দুই ভিন্ন জাতি বলে প্রতিপন্ন করার সবচেয়ে বড় সুযোগ সৃষ্টি করলেও এই গোমূর্খতা দূর করার চেষ্টাও কেউ কেউ করেছেন বৈকি। তবে হিন্দু মৌলবাদীদের গোহত্যা-নিবারণী আন্দোলনের কুফল সম্পর্কে হিন্দু সমাজের উদারচেতা মনীষীবৃন্দও যে যথাযথ সচেতনতা দেখাতে পারেননি, এ হচ্ছে এক বেদনাদায়ক সত্য। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যে গোহত্যা-নিবারণ আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে সমর্থনই জানিয়েছে, তাও আমরা দেখেছি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উদ্যোগে যে 'বেঙ্গল প্যাক্ট' হয় ১৯২৩ সালে, কেবল তারই একটি ধারায় বলা হয়েছিল : 'মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে মিছিল করা যাবে না। ধর্মের জন্য গোহত্যা-হতে পারবে।' এতেও গোহত্যাবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে তেমন কঠোর মনোভাবের প্রকাশ ঘটেনি। কিংবা এ আন্দোলনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যে কত প্রতিক্রিয়াশীল ও জাতীয় সংহতিবিরোধী, সে সম্পর্কে 'বেঙ্গল প্যাক্ট'-এর প্রণেতারাও যে খুব সচেতন ছিলেন, তা মনে হয় না। তাছাড়া চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর তো পুরো বেঙ্গল প্যাক্টেরই অপমৃত্যু ঘটে।

গোহত্যা নিয়ে যখন সমাজে একটা তোলপাড় দেখা দিয়েছিল, তখনই, সেই উনিশ শতকের শেষপাদেই, এ ব্যাপারে একটি উদারনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন সে শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন। তিনি চেয়েছিলেন :গোহত্যা নিবারণের নামে হিন্দু মূর্খতার বিপরীতে গোহত্যার পক্ষে মুসলমানি জেদ যেন উগ্র না হয়ে ওঠে, ওই তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে যেন হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে না যায়, গরু নিয়ে ঝগড়া করে মানুষকে যেন ছোট করে না ফেলা হয়। তাই তিনি মুসলমানদের কাছে গরু কোরবানি বন্ধ ও গোমাংস ভক্ষণ ত্যাগ করার আবেদন জানিয়েছিলেন। গোমাংস ভক্ষণে ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কথা অবশ্যই সত্য; কিন্তু গোহত্যা বন্ধ করলে বা গোমাংস ভক্ষণ না করলেও যে মুসলমানি নষ্ট হয়ে যাবে, তেমন কথাও তো ইসলামী কোনো ধর্মশাস্ত্রেই লেখা নেই নিশ্চয়। তাই, টাঙ্গাইলের 'আহমদী' পত্রিকায় ১২৯৫ সালে 'গো নির্মূল আশঙ্কা' প্রবন্ধে গোহত্যা বন্ধের প্রস্তাব দিয়ে মীর মশাররফ হোসেন লিখলেন, "এই বঙ্গরাজ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় জাতিই প্রধান। পরস্পর এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যে, ধর্মে ভিন্ন, কিন্তু মর্মে এবং কর্মে এক- সংসার কার্যে ভাই না বলিয়া আর থাকিতে পারি না। আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে, সম্পদে পরস্পরের সাহায্য ভিন্ন উদ্ধার নাই। সুখ নাই, শেষ নাই, রক্ষার উপায় নাই। এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যাহাদের সঙ্গে, এমন চিরসঙ্গী যাহারা, তাহাদের মনে ব্যথা দিয়া লাভ কি?"

'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা'র পর মীর সাহেব লিখেছিলেন এ-রকম আরো তিনটি প্রবন্ধ- 'গোধন কি সামান্য ধন', 'গোমাংস' এবং 'গোদুগ্ধ'। এই চারটি প্রবন্ধ একত্র করে তিনি প্রকাশ করেছিলেন 'গোজীবন' গ্রন্থটি।

কিন্তু মীর সাহেবের উদারনৈতিক প্রয়াসটি পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়ে যায়। 'আহমদী'র সম্পাদক আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ীর মতো হাতেগোনা দুয়েক জন মুসলমান মীর সাহেবকে সমর্থন জানালেও ধর্মান্ধ ও গোঁড়া মুসলমানরা তাঁকে 'কাফের' আখ্যা দেয়, এমনকি তাঁর স্ত্রী হারাম হয়ে গেছে বলেও ফতোয়া জারি করে। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়। শেষ পর্যন্ত মীর সাহেব আপস করতে বাধ্য হন ও 'গোজীবন' বইটি প্রত্যাহার করে নেন।

মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রয়াসে ব্যর্থ হলেও তিনি একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে যান নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁর সে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে উদারনৈতিক হিন্দুদের কেউই গোরক্ষার নামে বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেননি। শাস্ত্রে নিষিদ্ধ বলে হিন্দুরা গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ থেকে বিরত থাকুক, ক্ষতি নেই। কিন্তু যাদের শাস্ত্রে এ বিষয়ে কোনো নিষেধবিধি নেই, তাদের অধিকারে বাধা দেয়া যে মোটেই ন্যায়সঙ্গত নয়, এ কথা কি জাতীয়তাবাদী হিন্দুনেতা ও মুক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরা জোরের সঙ্গে বলতে পারতেন না? দুঃখ এই, তাঁরা তা বলেননি।

তবে আমার মনে আছে, তিরিশের দশকের শেষ কিংবা চল্লিশের গোড়ার দিকের কোনো এক সময়ের 'মাসিক সওগাত' পত্রিকার একটি পুরোনো সংখ্যা কী করে জানি আমার হাতে এসেছিল। এতে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণের সপক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন একজন হিন্দু লেখক। তাঁর নাম-মন্মথনাথ সরকার। প্রবন্ধটি আমি আমার দু-একজন গুরুজনকে পড়তে দিয়েছিলাম। তাঁরা তো এটি পড়ে আমার ওপরই মহাখাপ্পা হয়ে উঠেছিলেন। তীব্র ভর্ৎসনার সঙ্গে আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমি যেন এরকম গোখাদক ও কুলাঙ্গার হিন্দুনামধারী লেখকের লেখা কখনো না পড়ি।

আসলে হিন্দুদের গোহত্যাবিরোধী আন্দোলন কোনো যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, অন্ধ ধর্মীয় ভাবাবেগই এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল। দেশের গো-সম্পদ রক্ষার সাধু উদ্দেশ্যই যদি গোহত্যাবিরোধী আন্দোলনকারীদের থাকত, তবে তো তারা ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তি দিয়েই হিন্দু-মুসলমান সকলকে নিয়ে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারতো, ধর্মশাস্ত্রের দোহাই দিতো না। তাই এদের আন্দোলনের মধ্যে রক্ষণশীল মুসলিম নেতারা যে মুসলিমবিদ্বেষের গন্ধ পেয়েছিলেন, তাতে তাঁদের দোষ দেয়া যায় না। গো-রক্ষিণী সভা আইন করে গোহত্যা বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এরই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মীর মশাররফ হোসেনের প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ নইমুদ্দীন যা যা বলেছিলেন তার সবকিছুকেই পুরোপুরি অসত্য বলে বাতিল করে দিতে পারি না। ভারতে 'গোবধ' নামক একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, "হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ আইন দ্বারা গোবধ নিবারণ করতে গভর্নমেন্টকে উপদেশ দিতেছেন। সরল মনে বন্ধুভাবে এ কথা বলিলেও কতকটা ভাল শুনায়, আইন-কানুন ও জোর-জবরদস্তির কথা শুনিলে আমাদের মনে বিজাতীয় ঘৃণা ও রোষের সঞ্চার হয়। এরূপ কথা শুনিলে আমরা স্পষ্টই অনুভব করিব, ইহা মুসলমানদিগের সহিত বিবাদ বিসম্বাদের কারণই- আর কিছু নহে।"

এ-রকম প্রতিক্রিয়া, উনিশ শতকের শেষ থেকেই, নইমুদ্দীনরা গ্রাম-গঞ্জে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা এই প্রতিক্রিয়ার আগুনেই ক্রমাগত বাতাস দিয়ে চলছিলেন, গ্রামের অল্প শিক্ষিত মুন্সী মৌলবিদের তাঁরা নানানভাবে উস্কিয়ে দিচ্ছিলেন। ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী অথচ পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক, এ-রকম আলেম বা মওলানার সংখ্যা ছিল খুবই কম। বিশেষ করে দেওবন্দে শিক্ষিত মওলানারা তো ছিলেন নির্ভেজাল জাতীয়তাবাদী, মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের ঘোর বিরোধী। সে কারণেই, গাঁয়ে-গঞ্জে যারা 'কাঠমোল্লা' নামে পরিচিত, তাদেরই ওপর মুসলিম লীগারদের নির্ভর করতে হয়েছিল। ওরা সীমাহীন উৎসাহের সঙ্গে ধর্মীয় বিধানের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা হাজির করে সরলপ্রাণ গ্রামীণ মুসলমানদের মনে হিন্দু-বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সাফল্য অর্জন করে ফেলেছিল।

আমাদের পাশের গ্রামের একটি মুসলমান পরিবারের কেউই গরুর মাংস খেতো না। এক দিন রামপুর বাজারে একটি মুদি দোকানের আড্ডায় সেই পরিবারের একজন মধ্যবয়স্ক লোক এ কথাটা বলছিলেন। যারা গরুর মাংস খায় তারা নানা ধরনের চর্মরোগে ভোগে, তাই গরুর মাংস না খাওয়াই উত্তম- এ-রকম একটি মতও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। আর যায় কোথায়। আড্ডায় সকলে তাঁকে একেবারে ছেঁকে ধরলো। মুসলমান হয়ে গরুর মাংস যে খায় না, সে তো মুসলমানই নয়- বেশ কয়েকজন সমস্বরে এ কথা বলে সেই গোমাংসবিরোধী লোকটির ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কি! একজন মোল্লা কিসিমের লোক এবার 'ওয়াজনসিহত' করার একটি মওকা পেয়ে যান। ওই নালায়েক লোকটি যে মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েও হিন্দুদের মতো গরু খাওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলছে, এতেই বোঝা যায় ওর ওপর হিন্দুদের আছর কত গভীরভাবে পড়েছে। হিন্দুরা এভাবেই মুসলমানের মধ্যে ঢুকে তাদের ইমান নষ্ট করে চলছে। 'মুসলমান ভাই সব' মোল্লা সাহেব গলা উঁচু করে বলতে থাকেন, 'হিন্দুদের এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের হুঁশিয়ার থাকতে হবে। গরু হিন্দুর দেবতা হতে পারে, কিন্তু মুসলমানের তা হালাল খাদ্য। কোনো মুসলমান যদি গরু খাওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে বোঝা যাবে যে সে হালালকে হারাম বলছে। এর মানে তার ইমানের গোড়া আলগা হয়ে গেছে। আমাদের ইমান নষ্ট করছে নাছারা আর মালাউনরা। এদের থেকে তফাতে থাকতে হবে। ভাই মুসলমান, ইমান নিয়ে বাঁচতে হলে মুসলমানদের নিজেদের রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ সেই রাষ্ট্র পাকিস্তান কায়েমের জন্য আমাদের ডাক দিয়েছেন।'

গরু খাওয়া দিয়ে শুরু হয়ে কথা চলে যায় পাকিস্তানের প্রসঙ্গে। পাকিস্তানের কথা উঠতেই আসে হিন্দুর প্রসঙ্গ। মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অত্যাচারের প্রসঙ্গ। হিন্দুরা মুসলমানের ছোঁয়া খাবার তো খায়ই না, মুসলমানকে তারা মানুষ বলেই মনে করে না। সে-সবেরই নানা দৃষ্টান্ত আড্ডায় নানা জনে নানা ভাষায় ও ভঙ্গিতে তুলে ধরতে থাকে।