আত্মসূত্র

এক ইঁচড়ে পাকা দার্শনিক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শনের কথা বলতে গিয়ে আমার নিজের কথা, আমার বাপ-ঠাকুরদার কথা, আমার পরিবার-পরিজন-বন্ধুবান্ধবের কথা এবং যে যে স্থান থেকে পাকিস্তানের জন্মগ্রহণ, মৃত্যুবরণ ও তার ভূত হওয়াকে দেখেছি, সে-সবের কথা আমাকে বলতেই হবে। কারণ এটি তো কোনো নৈর্ব্যক্তিক দর্শন নয়, এর দার্শনিক ব্যক্তিটি আমি নিজে। সেই 'আমি'টিকে আড়াল করে রাখার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আবার, সেই অকৃতি অভাজন একান্ত অকিঞ্চিৎকর 'আমি'টির অকারণ আত্মবিজ্ঞাপন প্রচারই যাতে মুখ্য না হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে বৈকি! কারণ এই 'আমি' তো নিষ্ফ্ক্রিয় দার্শনিক মাত্র, সক্রিয় নির্মাতা নই কোনোমতেই।

বলেছি, পাকিস্তানের জন্মসময়ে আমি এক এগারো বছর বয়সী গ্রাম্য বালক মাত্র। বিজ্ঞজনরা প্রশ্ন করতে পারেন : এমন একটি পুঁচকে ছোঁড়া চোখের সামনে একটি মানুষের জন্ম হতে দেখলেও তার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝবে কি? বিশেষ করে যে ছোঁড়াটি আসলে ছিল একটি গেয়ো ভূত? তাই 'ফিলসফি' অর্থে তো দূরের কথা, সাধারণ 'দেখা' অর্থেও একটি রাষ্ট্রের জন্মের দার্শনিক হওয়ার স্পর্ধা সে পায় কোথায়?

খুবই সংগত প্রশ্ন। তবে তখনকার গেঁয়ো ভূত পুঁচকে ছোঁড়াটির সমর্থনে কিছু বক্তব্য আছে। এখনকার এই জেলা শহরবাসী বুড়ো হাবড়া কথকটির। আশা করি, বিজ্ঞজন একান্ত বিজ্ঞতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে ওর বক্তব্যের সারবত্তা বিচার করে দেখবেন।

প্রথমেই বলে রাখি, ছেলেবেলাতেই আমি ছিলাম ইঁচড়ে পাকা। এ-রকম হওয়ার পুরো দায়িত্বটা কিন্তু আমার একলার নয়। আমার অভিভাবকবৃন্দই আমাকে ইঁচড়ে পাকা হতে সাহায্য করেছেন, তাঁরাই আমার সমবয়সীদের চেয়ে অন্যরকম ভাবনা ভাবতে আমাকে শিখিয়েছেন, আমার মুখে অনেক পাকা পাকা কথা যুগিয়ে দিয়েছেন। আমার সমবয়সীদের বাপ-চাচারা তাঁদের ছেলে-ভাইপোদের হাতে ইস্কুলের পাঠ্যবই ছাড়া অন্য কোনো 'অপাঠ্য' বই দেখলে তা শুধু কেড়েই নিতেন না, তাদের পিঠে দু'চার ঘা বসিয়েও দিতেন। অথচ, আমার প্রতি আমার বাপ-ঠাকুরদার ব্যবহার ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলা অক্ষরগুলোর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর পরই তাঁরা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন অজস্র 'অপাঠ্য' পুস্তক। এমন কি সে বয়সের জন্য নিষিদ্ধ সব পুস্তকও। এ সবকে বলা হতো 'আউট বই'। ছাত্রজীবনে 'আউট বই' পড়লে চরিত্র নষ্ট হয়- এমন কথা গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষিত অভিভাবকের মুখেও শুনেছি। কথাটা বোধ হয় মিথ্যে নয়। আমার তো জীবনের প্রায় শুরু থেকেই চরিত্র নষ্ট হওয়ার সূচনা ঘটে। গুড বয়ের সুনাম আমি এক দিনের জন্যও অর্জন করতে পারিনি। নানা অপাঠ্য ও নিষিদ্ধ পুস্তক আমাকে এমনই নেশা ধরিয়ে দেয় যে, পাঠ্যপুস্তক দেখলেই আমার বমি আসতো। বিশেষ করে অঙ্ক বইটা তো ছিল আমার দু'চোখের বিষ। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কী করে যে অঙ্কে তেত্রিশ নম্বর পেয়েছিলাম, তার রহস্য আজও আমি উদ্ঘাটন করতে পারিনি। তখন ত্রিশ ছিল অঙ্কে পাস মার্ক। পাস মার্কের চেয়ে যে তিন নম্বর বেশি পেয়েছি, এটাই ছিল আমার গর্ব।

তার মানে অঙ্ক ছাড়া আর সব সাবজেক্টে আমি খুব আহামরি নম্বর পেয়েছি, তা-ও কিন্তু নয়। ম্যালেরিয়া রোগীর কুইনিন গেলার মতো করে পরীক্ষার পড়া গলাধঃকরণ করেছি। এভাবেই, পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পরীক্ষাতেই, কেবল কোনো রকমে টেনেটুনে পার পেয়ে গিয়েছি মাত্র। ছাত্র হিসেবে আমি এক্কেবারে রদ্দি মার্কা না হলেও 'মিডিওকার' এর সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারিনি। ভালো ছাত্র হওয়ার মতো মেধা ও প্রতিভা যেমন আমার ছিল না, তেমনি ছিল না পরিশ্রম ও সাধনাও।

তবুও, একান্ত মেধাহীন হয়েও মুখ থেকে মায়ের দুধের গন্ধ শুকোবার আগেই যে আমি চারপাশের সামাজিক-রাজনৈতিক আলোড়ন-আন্দোলন ও ঘটনা-দুর্ঘটনা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলাম, তার মূলে ছিল আমার বাবা ও ঠাকুরদার অতি আগ্রহ।