দুঃস্বপ্নের করোনা

যেন ছুটি পেল প্রকৃতি

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

প্রকৃতির কোলে আমাদের মানবসভ্যতা টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু আমরা মানুষেরা নিজেদের স্বার্থে প্রকৃতির আশীর্বাদ ভুলে সেই প্রকৃতিকে ধ্বংসের খেলায় মেতে থাকি প্রতিনিয়ত। করোনার প্রকোপে বিশ্বজুড়ে ঘরবন্দি ও নতুন স্বাভাবিকতার জীবনে মানুষের যখন দম যখন আটকে যাচ্ছে, তখনই যেন নতুন করে স্বমহিমায় ফিরছে প্রকৃতি। করোনা মানুষের জন্য বিপর্যয় নিয়ে হাজির হলেও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদই নিয়ে এসেছে বলা যায়।

করোনাভাইরাস প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ, সেটা কেমন? একটি তথ্য দিলেই তা পরিস্কার হয়ে যাবে। বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর আকাশে ওজোন স্তরে ১০ লাখ বর্গকিলোমিটারের একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছিল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওজোন স্তরে এমন গর্ত সৃষ্টি হওয়ার ফলাফল নিয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা করেছিলেন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। বছরের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী চলা লকডাউনে ওজোন স্তরের সেই গর্তটি নিজে থেকেই আবার সারিয়ে তুলেছে পৃথিবী।

দীর্ঘ লকডাউনে পুরো পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়ে। বন্ধ ছিল বড় বড় কারখানা। যার ফলে বিশ্বজুড়ে কমে এসেছে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা। এ বছরের এপ্রিলের শুরুতে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তা গত বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ কমপক্ষে ৭ শতাংশ কম হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, এমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ঘটবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক জলবায়ুবিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফ বলছে, দীর্ঘ লকডাউনে চীনে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমেছে ২৫ শতাংশ। একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই। লকডাউনের সময়জুড়ে আমাদের ঢাকার আকাশে বায়ুদূষণের পরিমাণও কমে গিয়েছিল। ঢাকার আকাশে বায়ুদূষণের মাত্রা স্বাভাবিক সময়ে ২৫০-৩০০ পর্যন্ত থাকে। লকডাউনের সময় এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ১৯৫ ও ১৫৭, যা নেমে এসেছিল ৯৩-তে।

করোনার লকডাউনে মানব বিচরণ শূন্যের কোঠায় থাকায় প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীরা যেন ছুটি পেয়েছিল। আমাদের দেশের কথাই যদি বলি, পর্যটকশূন্য সেন্ট মার্টিনের বালুচরে বসেছিল কচ্ছপ ছানার মেলা। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে বহু বছর পর গোলাপি ডলফিনের একটি দলের দেখা মেলে। পর্যটকবিহীন কুয়াকাটা সৈকতে দেখা গেছে লাল কাঁকড়ার নয়নাভিরাম মিছিল। সুন্দরবনে মুক্তির আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। এশিয়ার অন্যতম প্রধান মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর দূষণ কমে এসেছিল এই লকডাউনে। আশা করা হচ্ছে, এবার হালদায় ডিমের উৎপাদন বাড়বে।

শুধু বাংলাদেশ কেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ও বিভিন্ন দূষণ কমার পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে এই লকডাউন। ভারতে কয়েক যুগ পর কচ্ছপ সাগর থেকে উঠে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। ৬০ বছর পর ইতালির ভেনিস নদীতে বুনো রাজহাঁস ফিরে এসেছে, এসেছে ডলফিনও কয়েক দশক পরে। চীনে সাগর থেকে ডলফিন নদীতে প্রবেশ করেছে ৪০ বছর পর। ইউরোপের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল চিতা, জাগুয়ার, বনগরু, হরিণ, নেকড়েসহ অসংখ্য প্রাণী। করোনাকালে আমাজন বন উজাড় কমেছে আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ।

এশিয়ার সমুদ্রসৈকতের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ওসান এশিয়া গত পাঁচ মাসে এশিয়ার বিভিন্ন সৈকতে বিপুল পরিমাণ সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিইর সন্ধান পেয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এই সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাস ও পিপিই হতে পারে পরিবেশের ক্ষতির কারণ। এগুলো তৈরি হয় ফেব্রিক্স ও প্লাস্টিক দিয়ে দিয়ে, যা বায়োগ্রিডেবল নয়; ফলে মাটি দূষণের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।