বিপ্লবী মানবতাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রাম

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বিশ্ববাসীর ওপর ঘাতক করোনা হামলে পড়েছে। অজানা-অচেনা-অদৃশ্য-ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই হানাদার ঘাতক ভাইরাসটি আজ সব দেশের সব মানুষের ওপর একসঙ্গে আঘাত হেনেছে। এটিকে একটি বৈশ্বিক প্যানডেমিক অর্থাৎ মহাদুর্যোগ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ আজ মরণভয়ে ভীত, জীবন-জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা। এ ধরনের ভয়াবহ ও সর্বত্র ব্যাপ্ত মহামারি স্মরণকালে আর দেখা যায়নি।

করোনার অতর্কিত হামলায় মানবসমাজ আজ অরক্ষিত ও অসহায়। করোনাভাইরাস মানবসমাজকে তথা মানব অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিশ্ব ও বিশ্ববাসী আজ ইতিহাসের ভয়াবহতম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। করোনার ছোবলে মানুষের মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে তো বাড়ছেই। দেশে-দেশে ঝাঁকে-ঝাঁকে মানুষ মরছে। এ মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। মৃতের সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। কয়েক মাস ধরে দাবানলের মতো বিভীষিকা চালিয়ে সম্প্রতি সংক্রমণের মাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করায় মানুষ সামান্য আশার আলো দেখছিল। ঠিক তখনই আরও প্রচণ্ডতা নিয়ে করোনার তাণ্ডবের 'দ্বিতীয় তরঙ্গ' বিশ্বব্যাপী আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। অবস্থা আগের চেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

করোনাভাইরাসের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সবকিছু এখনও মানুষের জানা সম্ভব হয়নি। কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর বলে প্রমাণিত প্রতিষেধক অথবা তার কোনো পরীক্ষিত ওষুধ এখনও উদ্ভাবিত হয়নি। এ রোগের প্রতিষেধক ও ওষুধ উদ্ভাবনে গবেষণা চলছে। সেসব প্রতিষেধক ও ওষুধ আবিস্কার হতে এবং ট্রায়াল দিয়ে তা ব্যবহারের উপযুক্ত প্রমাণিত হতে আরও অনেক সময় লাগবে। কতদিন লাগবে, সে কথাও কেউ বলতে পারেন না। করোনা প্যানডেমিকের কাছে মানুষ তাই এখনও অসহায়।

এ ধরনের মহাবিপর্যয় রোধ করা বিশ্ববাসীর পাশাপাশি আমাদের দেশ ও জাতির সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। কিন্তু বিশ্বের ও এ দেশের 'কর্তৃত্ববান'রা মানবিক কর্তব্যের কথা ভুলে 'ক্ষমতা ও লুটপাট' নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে।

সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা সীমিত রাখার চেষ্টা করাই মানুষের সামনে এখন একমাত্র কর্তব্য হয়ে রয়েছে। রোগটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাই এখন প্রধান কাজ। তাতে যে সংক্রমণের বিস্তার কিছুটা কমিয়ে রাখা সম্ভব- তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যথাসম্ভব সব উপায়ে রোগটির বিস্তার রোধের চেষ্টা করা তাই এ ক্ষেত্রে এখন অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

কভিড-১৯ মোকাবিলায় তার বিস্তার রোধে মানুষকে পরস্পর দৈহিক দূরত্ব' (Physical Distancing) রেখে চলতে হবে। এটিকে ভুলভাবে 'সামাজিক দূরত্ব' (Social Distancing) বজায় রাখার নির্দেশনা বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এ শব্দচয়নটি যথাযথ নয়। কারণ তা করোনাকালে মানুষের করণীয় সম্পর্কে এক ধরনের গুরুতর ভুল ও উল্টো রকম ধারণা দেয়। কারণ করোনা মোকাবিলায় 'সামাজিক দায়িত্ব' ও 'সামাজিক বন্ধন' আরও বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি ও অপরিহার্য কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে 'দৈহিক দূরত্ব'র কর্তব্যকে 'সামাজিক দূরত্ব' হিসেবে আখ্যায়িত করা মারাত্মক ভুল, ক্ষতিকর ও আত্মঘাতী।


এ কথা আজ পরিস্কার, কভিড-১৯ মহামারি থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হতে পারে শুধু 'সমষ্টিগতভাবে'। বিচ্ছিন্ন ও এককভাবে কোনো ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর পক্ষে এ মহামারির আক্রমণ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই বর্তমানে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন 'সামাজিক সহযোগিতা-সংহতি বাড়ানো' (Enhancement of Social Integration)।

বাঁচার জন্য মানুষকে সমাজের সব শক্তি-সামর্থ্য সমবেত করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে একা একা চলে কোনো মানুষই বিপদমুক্ত থাকতে পারবে না। পারস্পরিক যৌথতার ভিত্তিতে পরিচালিত কর্মপন্থার ওপর সবাইকে নির্ভর করতে হবে। গত কয়েক মাসে মানুষ যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা থেকে সে আজ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, একা একা কেউ বাঁচতে পারবে না। বাঁচতে হলে সবাই মিলে একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। বিশ্ববাসীর মাঝে আজ সে উপলব্ধি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।

করোনা থেকে বাঁচার চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আজ মানুষের মধ্যে নতুন এক উপলব্ধির জন্ম হচ্ছে। অভিজ্ঞতাই তাকে আজ জানিয়ে দিচ্ছে, মানব অস্তিত্বের সুরক্ষার জন্য আগামী দিনের বিশ্বকে 'স্বার্থকেন্দ্রিক' ও 'মুনাফা তাড়িত' পুঁজিবাদের পথ পরিত্যাগ করে 'সামষ্টিক স্বার্থতাড়িত' ও 'সমতাভিত্তিক' ভিন্নতর পথ খুঁজে নিতে হবে।

লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, কোটি কোটি রোগাক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা, বিশ্বব্যপী অগণিত অসহায় মানুষের দুর্ভোগ ও হাহাকারের মাঝেও আশার কথা হলো, মানুষ সাহসের সঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছে। মানুষের মাঝে মৈত্রী, সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব, সাম্য ইত্যাদি মহৎ অনুভূতি ও চিন্তার বিস্তার ঘটছে। ফলে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে আজ তারা সাহস ও শক্তি পাচ্ছে।

সমবেত শক্তিতে করোনার মহাবিপর্যয় প্রতিরোধ করা মানব জাতির সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। একজন মানুষ হিসেবে এটিই সবার প্রাথমিক ও মৌলিক মানবিক দায়িত্ব হওয়ার কথা। অথচ কিছুসংখ্যক 'নরপিশাচ' সে পথ গ্রহণের বদলে এই মহাদুর্যোগের সময়ে দায়িত্ব পালনের বদলে মানুষের দুর্যোগকালীন অসহায়ত্বের সুযোগে 'লুটপাট'-এর মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের 'আখের গোছাতে' ব্যস্ত।

একাত্তরে বাংলাদেশে আমরা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। সে সময় কিছু লোক 'রাজাকারি' করেছিল। সে সময়ের মতো আজও মানবসমাজের ওপর হামলে পড়া 'নব্য-হানাদার' করোনার বিরুদ্ধে মহারণের এই কঠিন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির 'নব্য-রাজাকার' এ রূপ 'অমানবিক' তৎপরতায় লিপ্ত। আমাদের দেশে ও সারাবিশ্বে তারা তাদের বর্বর লুটপাট অভিযান জোরদার করে চলেছে। স্বল্পসংখ্যক এই অপশক্তি আজ হিংস্র হায়েনার লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাদের শ্রেণিগত শোষণ-লুণ্ঠনের মাত্রা বাড়ানোর আয়োজন করছে। মহাদুর্যোগের এই ভয়াবহতার মধ্যেও তারা তাদের 'শ্রেণি-শোষণ'-এর লালসা বিন্দুমাত্র শিথিল করেনি। বরং তা আরও বাড়িয়েছে। করোনা-মহামারি সর্বত্র ব্যাপ্ত জীবনঘাতী ভয়াল পরিস্থিতির মাঝেও এভাবে চলছে 'মানবীয়' ও 'দানবীয়' শক্তির মধ্যে শ্রেণিসংগ্রামের ফল্কগ্দুধারা।

করোনা মহামারির কারণে যে অবস্থা আজ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা হিসাব করে দেখেছেন, গ্রামাঞ্চলের ৮০ লাখ মানুষ এবং শহরাঞ্চলের ১ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হবে (সূত্র :বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন)।

একটি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের ফলে এমন ঘটাই স্বাভাবিক। এতে অবাক হওয়ার বিশেষ কারণ নেই। তবে অবাক হওয়া ও পরিতাপের বিষয়, কিছু মানুষ এ বিষয়টি দেখেও না দেখা, বুঝেও না বোঝার ভান করছে।

শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কখনোই শ্রেণিসংগ্রাম বিরত থাকে না। করোনা মহাদুর্যোগকালেও না। একই রূপ নিয়ে না হলেও, বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপে তার প্রকাশ ঘটে। তার অস্তিত্ব সব সময় সবার নজরে আসে না। তবে একটু ভালো করে নজর দিলে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে কোনো না কোনো শ্রেণিসংগ্রামের অস্তিত্বের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।

দেশের সম্পটদ ক্রমাগতভাবে 'যার কম আছে' তার হাত থেকে পুনর্বণ্টিত হয়ে 'যার বেশি আছে' তার কাছে হস্তান্তরিত হয়ে চলেছে। চলতি মহাদুর্যোগকালে এই প্রক্রিয়াকে তারা আরও তীব্র ও বিস্তৃত করেছে। সম্পদের পুনর্বণ্টনের গতিমুখ ও তার মাত্রা কী হবে তা নিয়ে করোনাকালেও দেশের ১ শতাংশ লুটেরা শ্রেণির সঙ্গে ৯৯ শতাংশ শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর-মধ্যবিত্তসহ শোষিত-বঞ্চিত মানুষের শ্রেণিদ্বন্দ্ব চলছে।

বিভিন্ন দুর্যোগকালে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য আরও এক ধাপ বেশি মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতিবার ঘটে। তা হতে দেওয়া যায় না। যার কম আছে তার হাত থেকে যার বেশি আছে তার কাছে সম্পদ হস্তান্তর তথা লুটেরা শ্রেণির অনুকূলে বর্ধিত মাত্রায় পুনর্বণ্টনের চেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না। এটি মানবিকতার চরমতম লাঞ্ছনা! দানবের হাতে মানবের পরাজয় ঘটতে দেওয়া যেতে পারে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ব্যক্তিগত মুনাফার প্রণোদনাকে ভিত্তি করে পরিচালিত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা বহাল রেখে তা করা যে সম্ভব নয়- এ সত্যটি আজ চূড়ান্তভাবে খোলাসা হয়ে গেছে। তাই দেখা যাচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, নেপাল, ভারতের কেরালা রাজ্য প্রভৃতি যেসব জায়গায় কমিউনিস্ট সরকার আছে, সেসব জায়গায় যেভাবে ও যতটা দক্ষতার সঙ্গে করোনা দুর্যোগ মহামারি মোকাবিলা করা গেছে; পুঁজিবাদী বিশ্বের দেশগুলোতে তা করা সম্ভব হয়নি। মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক মতবাদ, মেহনতি মানুষের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি, কমিউনিস্টদের বিপ্লবী মানবতাবাদ ইত্যাদি কারণে যা তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়েছে; পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত দেশগুলোর পক্ষে তা করা সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদের ব্যক্তিভিত্তিক ও মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও কুফল আজ কভিড-১৯ মহামারীকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। এ কথা আজ স্পষ্ট, এমন দুর্গতি থেকে রক্ষা পেতে হলে বিশ্বকে আগামীতে পুঁজিবাদের চেনা পথের বাইরে হাঁটতে হবে। করোনা মহামারির বিরুদ্ধে সংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের মধ্যে সামাজিক বোধ ও চেতনা এবং সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উপলব্ধি জোরদার হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধের সংগ্রাম আজ তাই বিশ্ববাসীর 'বিপ্লবী সংগ্রাম'-এরই অংশ হয়ে উঠেছে।

লেখক, সভাপতি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)