উন্নয়ন অগ্রাধিকারের দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়েছে। একই সময় বিশ্বে করোনায় মোট মারা গেছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৭তম। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে করোনার ভয়াবহতা বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় সাদামাটা মনে হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিগত কারণে রাষ্ট্র, সমাজ, গোষ্ঠী, পরিবার, ব্যক্তি অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে এর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ভয়ংকর। এই গ্রহের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে এর আঘাত বা আতঙ্কে মানুষের স্বাভাবিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েনি। একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষে মানব জাতি যখন সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভাবতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই করোনা আঘাত হেনে মানব সভ্যতার জীবন জাগিয়ে রাখার বুদ্ধিমত্তার অহংকারকে নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনটি ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক চলার পথকে নতুন দিশার সন্ধান দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কার। দ্বিতীয়, ইলেকট্রিসিটি আবিস্কার এবং তৃতীয়, যে আবিস্কার এই সমগ্র গোলার্ধকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সেটা হচ্ছে ইন্টারনেট আবিস্কার। যার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার উত্তরোত্তর পরিবর্তন তৈরি হয়েছিল আত্মবিধ্বংসী অহংকার। কিন্তু কভিড-১৯ এসে আমাদের চলমান সব আবিস্কার, সব শক্তিমত্তা, সব আত্মবিশ্বাস, সব আস্থা, সব হিসাবনিকাশ এলোমেলো করে দিয়েছে বিশ্ব সভ্যতার মৌলিক গতিপথকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই পৃথিবীর মানুষ এত বড় সংকটের আর সম্মুখীন হয়নি। তাই অনেকেই মনে করেন, করোনা হয়তো এক সময় নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা প্রাকৃতিক কারণেই হোক কিংবা বিজ্ঞানের কল্যাণেই হোক। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের বিশ্ব যে রকম মানুষের স্বাভাবিক গতিপথকে আলাদা করে দিয়েছিল, একইভাবে করোনা আমাদের চেনাজানা ২০২০-পূর্ববর্তী বিশ্বকে আমূল পাল্টে দিতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী অভিজ্ঞতার চাইতেও নতুন মাত্রায়।

গভীর হতাশা ও আতংকের বিষয় হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্র করোনা নিয়ন্ত্রণে যেরকম সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এই মহামারি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত কর্মকৌশল গ্রহণে; তেমনি করোনা থেকে মুক্তি পেতে টিকা পরিকল্পনা ও করোনাপরবর্তী নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে যে আগাম কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীতা রয়েছে, সেটা অনুধাবন করতেও অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক কভিড-১৯ ভাইরাসের উপস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাসীকে অবহিত করার পর থেকে আজ দীর্ঘ প্রায় ৩০০ দিন অতিবাহিত হতে চলেছে। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের পরিকল্পনা ও কাজে কখনোই মনে হয়নি মানব জাতির ইতিহাসের ভয়াবহ এই দুর্যোগ সম্পর্কে দেশের মানুষের চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা বিন্দুমাত্র সংবেদনশীল। উপরন্তু তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ এই সংকট সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ভুল বার্তা দিয়েছে।

করোনাকালে সমগ্র বিশ্ব যখন এই সংকট মোকাবিলায় হয়েছে মানবিক, গড়ে তুলেছে একে অপরের মাঝে ঐক্যের বন্ধন সেখানে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার ও দুর্বৃত্তায়নের সূতিকাগার আওয়ামী লীগ লিপ্ত হয়েছে জনগণের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে। করোনার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়কালেও মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে পিছপা হচ্ছে না।

করোনাভাইরাস উন্নয়ন অগ্রাধিকারের দুর্বলতা চরমভাবে উন্মোচিত করেছে। স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা উন্নয়ন পরিকল্পনার মৌলিকত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে প্রকটভাবে। জনস্বার্থমূলক, বাস্তবধর্মী, টেকসই উন্নয়ন বলতে কী বোঝায় তা উপলব্ধি করতে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তির প্রাক্কালেও ব্যর্থ হয়েছি। এর কিছুটা দায় আমাদেরও আছে, যা আমরা এড়িয়ে যেতে চাই না। মূলত সে কারণেই ২০১৬ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০-এর মাধ্যমে বিএনপি এদেশের মানুষের সার্বিক জীবনযাপনের একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনে সরকারের দায়িত্বভার পেলে জনগণের কল্যাণে কার্যকরী পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করতে পারব বলে বিশ্বাস করি। এই গ্রহের সব মানুষের মতো আমরাও প্রত্যাশা করি, একদিন করোনার ভয়াল থাবা আমরা থামিয়ে দিতে পারব। আবার নতুন করে জেগে উঠবে প্রত্যাশিত মানুষের স্বাভাবিক জীবন। তবে এ জন্য গত এক দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারে একাকার হয়ে যাওয়া একটি গোষ্ঠী যে নতুন বিতর্কের অবতারণা করেছে; অর্থাৎ গণতন্ত্র উন্নয়ন তার একটি সুষ্ঠু সমাধান জরুরি। অবধারিতভাবে এ বিতর্কের সহজ সমাধান হচ্ছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনস্বার্থমূলক জবাবদিহিমূলক উন্নয়ন। এর ব্যত্যয় ঘটার নূ্যনতম সুযোগ নেই।

শেষ করব ইতিহাসবিদ ইয়োভাল নোয়া হারারির বক্তব্য দিয়ে। করোনাপরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে, তা নিয়ে তার চিন্তা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বাধিক আলোচিত। সম্প্রতি বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক লেখায় যা বলেছেন তার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এ রকম- এই মহামারির সময় যেসব স্বল্প মেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পরে পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সেই পথ ধরে উত্থান ঘটতে পারে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার, যেখানে চলবে গণনজরদারি। আমাদের দুশ্চিন্তার জায়গাটা এখানেই। করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থাপনাগত নানা ত্রুটি ও ব্যর্থতায় বর্তমান সরকার নিমজ্জিত থাকলেও জনগণের মতামত প্রকাশ, অধিকার, মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতকরণে সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহারসহ লাগাতারভাবে জনগণের অধিকার হরণে একের পর এক আইন তৈরিতে প্রতিনিয়ত ব্যতিব্যস্ত। যা মূলত ইতিহাসবিদ ইয়োভাল নোয়া হারারির করোনাপরবর্তী বিশ্বে উদ্ভূত 'স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, যেখানে চলবে গণনজরদারি' তারই প্রতিচিত্র মাত্র।

সমকাল পত্রিকার ১৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আমরা আনন্দিত। বিএনপির পক্ষ থেকে সমকালের আগামীর পথচলায় সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার করছি। শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন সমকাল পরিবার- সব সাংবাদিক, কলাকুশলী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে। বিশেষভাবে শুভকামনা সমকাল পত্রিকার সব পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের। সৃজনশীল চিন্তার ধারক ও বাহক, স্বাধীন মতপ্রকাশে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ সমকাল-এর উত্তরোত্তর সফলতা এবং সবার জন্য সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ ও মুক্ত জীবনের প্রত্যাশা রইল।

লেখক, সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী