আত্মসূত্র

বাংলার লোকজীবনে পাকিস্তানের দুষ্ট হাওয়া

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

যতীন সরকার রচিত 'পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন' বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসের একটি অনন্য দলিল। 'আত্মসূত্র' শিরোনামে ওই গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ পত্রস্থ হলো...

পারুলতলার মাইল দেড়েক উত্তরে এক গ্রাম- হাতিল। সে গ্রামের একজন মানুষের খুব নামডাক। পেশায় তিনি আইনজীবী, কিন্তু তাঁর খ্যাতি ব্যায়ামবিদ হিসেবে। 'ব্যায়ামে বাঙালি' নামে একটা বইয়ে তাঁর জীবনী ছাপা হয়েছিল। সাধারণ্যে তিনি পরিচিত 'দিগিন্দ্র মাল' নামে। তাঁর আসল নাম দিগিন্দ্রচন্দ্র দেব।

এই মালের বাড়ি আমার মাসিমার শ্বশুরবাড়ি। দিগিন্দ্র মালের বড় ভাই দীনবন্ধু দেব আমার মাসিমার শ্বশুর, আর দিগিন্দ্র মাল কাকা শ্বশুর।

বড় ভাই দীনবন্ধু দেবই দিগিকে মানুষ করেছেন। কলকাতায় রেখে কলেজে পড়িয়ে তাঁকে বিএ ও বিএল পাস করিয়েছেন। সল্ফ্ভ্রান্ত ঘরের উচ্চশিক্ষিতা মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেবেলায় এসব কথা মামার বাড়িতেই আমি শুনেছি।

কিন্তু একপর্যায়ে এই দিগিন্দ্র দেবের সঙ্গে বড় ভাই দীনবন্ধু দেবের সম্পত্তি-ঘটিত বিবাদ চরম আকার ধারণ করে। দীনবন্ধু দেবকে হাজতবাসও করতে হয়। গ্রামের লোকেরা দুই দলে ভাগ হয়ে একদল বড় ভাই ও আরেক দল ছোট ভাইকে মদদ জোগাতে থাকে। দুই ভাইয়ের কে কতখানি দোষী ছিলেন, তা জানি না। তবে এক সময় যে হাতিল ও তার আশপাশে গ্রামগুলোতে দিগিন্দ্র দেব ও দীনবন্ধু দেব এই দুই ভাইয়ের ঝগড়া-বিবাদ খুবই মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে পড়েছিল, তা জানি।

সে যাই হোক, পাকিস্তানের জন্ম সময়ে কিন্তু এসব ঝগড়া-বিবাদের কথা চাপা পড়ে গিয়েছিল। দিগিন্দ্র দেব সে সময় ময়মনসিংহ শহরে ওকালতি করেন। গাঁয়ের হিন্দুরা তখন তাঁর সান্নিধ্য কামনা করছিল মনেপ্রাণে। গাঁয়ে যদি হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরুই হয়ে যায়, তবে হিন্দুদের জন্য দিগিন্দ্র মালই হতে পারেন সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল। কয়েক বছর আগে নাকি গুণ্ডারা সদলবলে ময়মনসিংহের কালীবাড়ি আক্রমণ করতে গিয়েছিল। তখন দিগিন্দ্র মাল একাই তাদের হটিয়ে দেন।

দিগিন্দ্র মাল হাত দিয়ে চলতি মোটরগাড়ি আটকে দিতে পারেন, বুকের ওপর হাতি তুলতে পারেন, খালি হাতে হয়তো বাঘও মেরে ফেলতে পারেন- তাঁর শক্তি সম্বন্ধে এ রকম নানা কথা লোকের মুখে মুখে পল্লবিত হয়ে ফিরত।

তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি রেণু দেব। বিএ ও বিটি পাস। ময়মনসিংহ সরকারি বিদ্যাময়ী গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষয়িত্রী। ফরিদপুর জেলার কোনো এক জমিদার বাড়ির মেয়ে। ঢাকার জগন্নাথ কলেজের এক কালের ডাকসাঁইটে প্রিন্সিপাল রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্র ভদ্রের দৌহিত্রী। এ রকম একটি সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিতা কন্যাটি হাতিলের মতো গণ্ড গ্রামেরই এক বাড়ির বউ হয়ে এসেছে, সেজন্যে গ্রামবাসীর গর্বের অন্ত ছিল না। পাকিস্তানের জন্ম সময়ে হাতিলের হিন্দুরা তাদের মাঝে দিগিন্দ্র মালের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রেণু দেবের উপস্থিতিও মনেপ্রাণে কামনা করছিল। উকিল দিগিন্দ্র দেবের মতো তাঁর শিক্ষয়িত্রী স্ত্রীর কাছেও তারা বল-ভরসা পেতে চাইছিল। কিন্তু সে-রকম বল ভরসা দেবার জন্য তাঁরা কেউই সেদিন শহর ছেড়ে গ্রামে আসেননি।

আসলে বল-ভরসা দেবার ক্ষমতা তখন কারুরই ছিল না। দিগিন্দ্র মালের শারীরিক বল কিংবা তাঁর শিক্ষিতা স্ত্রী রেণু দেবের বুদ্ধিজাত ভরসা, অন্যের জন্য দূরে থাক, নিজেদের জন্যই অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। এ দেশের হিন্দুমাত্রই তখন বল-ভরসাহীন।

অবশ্যি যে-কোনো মুহূর্তেই এখানকার হিন্দুরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়বে, প্রতিপক্ষরা তাদের কচুকাটা করে ফেলবে, তাদের বৌ-ঝিদের ঘর থেকে টেনে বার করে নিয়ে যাবে- হিন্দুদের এমন বহুপ্রচারিত আশঙ্কা পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক জন্মলাভের পরও সত্য হয়ে ওঠেনি। তার কারণ বাংলার কৃষককুলের মধ্যে দৃঢ়মূল যে লোকায়ত সংস্কৃতি, তার গভীর প্রভাবের দরুনই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে অতি সহজে কেউ তাদের প্ররোচিত করতে পারে না।